ঝরা বকুলের গল্প

অাশানুর রহমান খোকন

তাঁর সাথে অামার পরিচয় হয়েছিল সেই ১৯৮৯ সালে। এসএসসি পাশ করে যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হয়েছি। অামার বন্ধু 'তোরাব' এসএসসি পরীক্ষায় অংকে ফেল করে। তখনও ডেফার্ড পদ্ধতি চালু হয়নি। তোরাবের পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল যশোরের 'সম্মিলন স্কুল'। তোরাবের অনুরোধে তার অংক পরীক্ষার দিন সম্মিলন স্কুলের মাঠে বসেছিলাম তার বড় ভায়ের সাথে। সেই দিনই তাঁর সাথে অামার পরিচয়। তিনি ও তোরাবের বড় ভাই একই 'মেসে' থাকতেন। মাঝারি উচ্চতার ভীষণ রকমের রোগা, মাথা ভর্তি চুল কিন্তু পুরোটাই সাদা, মুখ ভর্তি পান, হাতে চুন, হাটু পর্যন্ত লম্বা শার্ট, পায়ে 'টায়ারে'র তৈরী স্যান্ডেল সব মিলিয়ে মানুষটিকে দেখতে অদ্ভুত লাগছিল। খুবই সাধারণ ও সাদা-মাটা মানুষটির চোখ দুটি ছিল সব থেকে বুদ্ধিদীপ্ত ও উজ্জ্বল। পরিচয় দিলেন তিনি বাম রাজনীতি করেন। যে দলের নাম তিনি বললেন, অামি কোনদিন তার নাম শুনিনি। রাজনীতি নিয়ে সে সময় যেহেতু অামার কোন অাগ্রহও ছিল না, তাই লোকটির প্রতি বিশেষ কোন অাগ্রহও বোধ করছিলাম এমন নয়। কিন্তু ক্রমশ অালাপ হতে হতে সেই সাদামাটা মানুষটি অামার মনের মধ্যে কোথায় যেন একটি ছাপ ফেলে দিলো।

সেই পরিচয়ের সূত্রধরেই পুরাতন হোষ্টেলের ২৫ নং কক্ষে তিনি মাঝে সাঝে অাসতেন। অামার অন্য দু'জন রুমমেট, যাদের বাড়ী ছিল যশোরের নড়াইলে, ধর্ম পরিচয়ে হিন্দু এবং তারা একটি প্রভাবশালী বাম ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন যেহেতু তাদের রুমে থাকি, তাদের সংগঠনটিই হয়তো করবো। ফলে তারা সেই মানুষটির অামার রুমে অাসাটা পছন্দ করতেন না। অামি তখনও জানতাম না, তারা সবাই বাম সংগঠন করলেও এক সংগঠনের লোকজন অারেক সংগঠনের লোকজন সম্পর্কে বিরুপ মনোভাব কেন পোষণ করে। তাঁর সাথে ঐ রুমে বসে বিশেষ কোন রাজনৈতিক কথা হতো এমন নয়, হয়তো রুমের পরিবেশটিও সেটা জন্য সহায়কও ছিল না। তিনি অামার পড়াশুনা, একাডেমিক বইয়ের বাইরে অামার অাগ্রহ, সেগুলো নিয়েই কথা বলতেন। অামাকে পড়ার জন্য কিছু বইপত্রও দিতেন। এভাবেই শুরু। তাঁকে ভাল লাগতে শুরু করে। একদিন তিনি তাঁদের একটি পাঠচক্রে যাবার অামন্ত্রণ জানালে, সেখানে অারো কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হয়। যাদের ব্যবহারের অান্তরিকতায় অামি মুগ্ধ হই। যাদের অনেকের জানাশুনার পরিধি তাদের সম্পর্কে অামাকে অাগ্রহী করে তোলে। একটু যেন জড়িয়ে পড়ি।

তবে তখনও পাঠচক্র পর্যন্তই, কারণ রাজনীতি করার কোন অাগ্রহ অামার ছিল না। একদিন তাঁদের দলের 'প্রধান' বিশেষ সভায় যোগ দিতে যশোর অাসবেন। সেই সভায় থাকার জন্য তাঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে হাজির হয়েছিলাম। সেখানে হাজির হলে একজন বিপ্লবীর জীবন কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে সেই নেতা বারবার তাঁর নামটিই বলছিলেন। তার অাগ পযর্ন্ত, অামি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না, জানার বিশেষ প্রয়োজনও বোধ করিনি। সেই সভাতেই তাঁর সম্পর্কে যা জানি তা সংক্ষেপে এরকম যে তিনি গরীব হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েও অনেক কষ্ট করে ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে সরকারী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি নেন। পরের দলের পরামর্শে তিনি চাকুরি ছেড়ে দলের সার্বক্ষণিক কর্মি হন। তাঁর বাবা সেই ঘটনায় অনেক দুঃখ পান। তিনি ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর মা তাঁকে চিঠি লেখেন একবার বাড়ী যাবার জন্য। উত্তরে তিনি মাকে লিখে পাঠান-" অামি তো ডাক্তার নই, এই অবস্থায় বাড়ী গিয়ে অামি কী করবো? তুমি বরং বাবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও!"

সেই ঘটনার পর তাঁর বাবা কিছুটা সুস্থ হয়ে তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। বাবা তাঁকে লেখেন-" অামি যদি একটি গাভীও পুষতাম, অামার এই দুর্দিনে অামি অন্তত কিছুটা দুধ পেতাম। তোকে মানুষ করে অামি কী পেলাম বলতে পারিস?"

সেই চিঠিগুলি তিনি পার্টির নেতাদের দেখিয়েছিলেন। ঐ ঘটনা বর্ণনা করে নেতাটি যখন একজন বিপ্লবীর জীবনে দলের গুরুত্ব বর্ণনা করছিলেন, তখন উপস্থিত কর্মীদের চোখে মুখে শুধু বিস্ময় অার প্রশংসার ছাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। অবশ্য অমার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মিশ্র। অামার মনে হয়েছিল ঐ মূহুর্তে তাঁর ঐ ভূমিকা কি যথার্থ ছিল? গরীব, অসুস্থ বাবার দায়িত্বটি কি তাঁর প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল না? বিপ্লব কি বাবা-মায়ের থেকেও বড়? অামি তো তাহলে কখনও বিপ্লবী হতে পারবো না। একই সাথে তাঁকে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও দায়িত্বহীন মনে হচ্ছিল। অাবার এও মনে হচ্ছিল দেশ, বিপ্লবের স্বার্থে ব্যক্তিগত দুঃখ, কষ্ট, ত্যাগের মহিমায় এই মানুষটি তো অামাদের মতো অাটপৌরে নয়। সেই সাদামাটা মানুষটির মধ্যে এতটা দৃঢ়তা, ঋজুতা অাছে দেখে তো কখনও মনে হয়নি। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা শার্ট পরা, পান খাওয়া মানুষটির এমন ত্যাগ, চরিত্রের এমন দিক সেটা তো বাইরে থেকে দেখে বুঝা যায় না। অামি তাঁর প্রতি প্রবল অাগ্রহ বোধ করতে থাকি অার একই সাথে সিদ্ধান্ত নেই, এই মানুষটি থেকে যেভাবেই হোক অামাকে দূরে থাকতে হবে।

সে দিনের সেই সভার পর থেকে অামি তাঁকে এড়িয়ে চলি। বলা যায় একভাবে পালিয়ে থাকি। যে সব পথ দিয়ে চলাচল করলে তাঁর সাথে দেখা হবার সম্ভাবনা বেশী সেই সব পথ এড়িয়ে চলি। ছোট্ট একটি শহর, তাছাড়া অামার একটি ঠিকানা অাছে। কতদিনই বা এভাবে এড়িয়ে চলা যায়। একদিন বিকালে তিনি অামার হোস্টেলে এসে হাজির হলে তাঁকে এড়াতে ব্যর্থ হয়ে, তাঁর সাথে হাঁটতে হাঁটতে কলেজ ছাড়িয়ে, রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকি। সেদিন কথা বলি সমাজ নিয়ে, মানুষ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, 'তারপর অাপনার বাবা-মায়ের কি হয়েছিল?' প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। অনেক পীড়াপীড়ীতে বললেন, " সেই ঘটনার পর তাঁরা ইন্ডিয়ায় তাঁর কাকাদের কাছে চলে যায়'। জিজ্ঞাসা করি, 'অাপনার সাথে দেখা হয়েছিল?' তিনি বললেন, ' না। মা দেখা করতে বলেছিলেন। বাবা চাননি। দলের কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অামিও বাড়ী যেতে পারিনি'।

জানতে চাইলাম, 'অাপনার খারাপ লাগে না?' তখন সন্ধা হয়ে অাসছে। খুলনা থেকে কুষ্টিয়াগামী একটি ট্রেন দ্রুত অাসছিল, অামরা ট্রেন লাইন থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ালাম। তিনি কিছু একটা বলতে গেলেন। ট্রেনের শব্দে অার দমকা হাওয়ায় তাঁর কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেলো। কিছুই শুনতে পেলাম না।

ট্রেনটি চলে যাবার পর অামরা দু'জনেই চুপ করে থাকলাম। অনেকক্ষণ পার হবার পরও কেউ যেন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল অামরা যেন কেউ কাউকে চিনি না। অামাদের অাগে কোনদিন দেখাও হয়নি। তিনি ঘন হয়ে অাসা অন্ধকারের দিকে চেয়ে ছিলেন। অামি ভাবছিলাম বিপ্লবী এই মানুষটার মনটা এখনও বোধ হয় মরে যায়নি। ভারতে চলে যাওয়া বাবা-মায়ের কথা ভেবে তিনি কি একটু অানমনা হয়ে গেলেন? অথবা অজান্তেই প্রশ্নগুলো করে তাঁকে কি অামি দুঃখ দিলাম? হালকা শীত করছিল। গরম কোন পোষাকও নেয়া হয়নি। তিনি বললেন, 'চলো, ফেরা যাক!'

সেই একই পথ ধরে হোস্টেলে ফিরলাম। বেশ কিছুটা রাত হয়ে গিয়েছিল। পথে তাঁর সাথে খুব বেশী একটা কথা হলো না। অামি তারপরও তাঁকে এড়িয়ে চলতেই থাকি। এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তাঁর সাথে অার কোন যোগাযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে একটি এনজিতে যোগ দেই। বিভিন্ন এনজিও ঘুরে অামি তখন একটি এনজিও'র মাঝারি গোছের কর্মকর্তা। সেই এনজিওটির ফিল্ড পর্যায়ের কাজ সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য অামাকে খুলনার মংলায় যেতে হয়েছিল। অফিস থেকেই মংলায় কারিতাস নামক এক এনজিও'র গেষ্ট হাউজে অামার থাকার বন্দোবস্ত করা হয়। ঢাকা থেকে সোহাগ পরিবহনের বাসে খুলনা হয়ে যখন মংলার পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু হেঁটে পশুর নদী পা হলাম নৌকায়। কারিতাসের গেষ্ট হাউজে যখন পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় ৮টা। গোসল করে খাওয়া-দাওয়া শেষে সিগারেট খেতে বাইরে এসে দেখি অধিকাংশ দোকান-পাঠই প্রায় বন্ধ। দূরে একটি চায়ের দোকান তখনও খোলা। বিদ্যুৎ নেই। হারিকেনের অালোয় অালো-অন্ধারের খেলা চলছে। দোকানে একজনই মাত্র খরিদ্দার। তার জন্য তিনি চা বানাচ্ছিলেন বোধহয়। অামি গিয়ে এক প্যাকেট বেনসন চাইলাম। দোকানি বললো, 'স্যার কি এখানে নতুন, ঢাকা থেকে এসেছেন?' বুঝলাম নতুন লোক পেয়ে দোকানি অালাপ করতে চায়। বললাম, 'হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলুন তো?'

উত্তরে দোকানি বললো, ' স্যার, নতুন লোক ছাড়া এখানে বেনসন সিগারেটের অাস্ত প্যাকেট কেউ কেনে না। বেনসন তেমন বিক্রিও হয় না। এলাকার মানুষের এত পয়সা কোথায় বলেন? তবু দু/একজনের জন্য রাখতে হয়। দোকান তো। তবে পুরো প্যাকেট হবে না। ভাঙা প্যাকেটে যে ক'টা অাছে নিয়ে যান'।

সিগারেট নিয়ে পয়সা মিটাতে গিয়েই চোখ পড়লো দোকানের অন্য খরিদ্দারটির দিকে। লোকটি ততক্ষণে চা খেতে শুরু করেছে। লোকটির চুলের দিকে তাকাতেই যেন বিদ্যুতের শক খেলাম। প্রায় ১৮/১৯ বছর পর তাঁকে দেখলাম। তবু সেই চুল, সেই চোখ, অামি কিভাবে ভুলি? অামি প্রায় ছুঁটে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, 'দাদা, অাপনি? এখানে? অাপনাকে এখানে দেখবো কল্পনাও করিনি'। তিনি মৃদু হাসলেন। বললেন, 'বসো। চা খাও। মকবুল ভাই, অারেক কাপ চা দেন'।

অামার মাথায় তখন হাজারো প্রশ্ন। তিনি অামার কথায় জিজ্ঞাসা করছিলেন। অামি ছটফট করছিলাম তাঁর কথা শুনার জন্য। চা শেষ করে তিনি বললেন, ' এখনও কি হাঁটতে পারো, পারলে চলো ঐ যে চিংড়ির ঘের দেখতে পাচ্ছো তার ডান দিকে মোড় নিলে নদী বরাবর একটি রাস্তা অাছে। ঐ দিকটি হেঁটে অাসি। তোমার ভাল লাগতে পারে'। রাত তখন প্রায় দশটা। রাস্তা প্রায় অন্ধকার। পরের দিন অনেক কাজ, তবু সেই পুরোনো অাকর্ষণে তাঁর সাথে হাঁটতে শুরু করলাম। জানতে চাইলাম, ' এখানে অাপনি কি করেন? রাজনীতি?' তিনি যেন মলিন হাসলেন। অন্ধকারে কিছু দেখতে পেলাম না।

তিনি বলেলেন, ' না, দলীয় কোন রাজনীতি এখন অার করি না। এখানে কতকগুলো ছেলে পড়ায়। ঐ যে চিংড়ির ঘেরটি দেখছো তার পাশের একটি বাড়ীতে মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়া ও খাওয়া বাবদ অারো ১০০০ টাকার টাকার বন্দোবস্তে থাকি।' অামার তখন বিস্ময়ের মাত্রা এতটাই যে অামি দাঁড়িয়ে পড়লাম। অামার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তিনি রাজনীতি করেন না। অামার বিশ্বাস হচ্ছিল না, তাঁর মতো একজন বিপ্লবী মংলার মতো একটি জায়গায় ছাত্র পড়িয়ে মাসিক ১৫০০ টাকার বন্দোবস্তে জীবন-যাপন করছেন। অামি বললাম, 'অামি তো ভাবতেই পারছি না। অাপনি বিপ্লব ছেড়ে, রাজনীতি ছেড়ে, এরকম একটি জীবন-যাপন করছেন?'

তিনি হাসলেন। হাসিটা কান্নার মতো শোনালো। বললেন, ' তুমি একে জীবন-যাপন বলো? বরং বলতে পারো জীবন-ধারণ করে অাছি'।

--'রাজনীতি কেন ছাড়লেন?' --'রাজনীতি কি ছেড়েছি? না মনে হয়। তবে হ্যাঁ, অামি স্বেচ্ছায় দল ছাড়িনি'। --'তাহলে?' -- 'সে অনেক কথা। রাতও অনেক। তোমার হয়তো কাল জরুরী কাজ অাছে। অার কিইবা হবে এসব শুনে?' অামার তখন মনে হচ্ছিল সেই রাতে দাদার গল্প শোনা ছাড়া অামার অন্য কোন কাজ নেই। মনে হচ্ছিল অামরা যেন ১৮/১৯ বছর অাগে যশোর রেল লাইন ধরে হাঁটছি।

বললাম-- --'অামার কাজ কোনভাবেই অাপনার জীবনের গল্পের থেকে বড় হতে পারে না। অাপনি বলুন।' সেই প্রায় অন্ধকার রাতে পশুর নদীর তীর ঘেঁষে ঘেঁষে অামরা হাঁটতে থাকি অার দাদা বলতে থাকেন--- "যশোরে অামি ছাত্র সংগঠন, কৃষক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন একাধারে সব কিছুই দেখতাম। অামাদের সংগঠন ছোট। দলের পরিচিতিও বেশী না। তাছাড়া যশোরে এত এত বামপন্থী দলের শক্তিশালী অবস্থান, সেখানে অামাদের দলের একটি অবস্থান তৈরী করা, অন্য দলের সাথে অামাদের পার্থক্য জনগণকে বোঝানো তো সহজ ছিল না। তবু অামরা একটু একটু করে শক্তি সঞ্চয় করছিলাম।"

একটু দম নিয়ে তিনি বলতে থাকলেন----- "কিন্তু অামাদের দলের চরিত্র ক্রমশ হয়ে উঠছিল মধ্যবিত্তসূলভ সুবিধাবাদী। দলের অাদর্শের সাথে নেতৃত্বের অসংগতিপূর্ণ ও অনৈতিক জীবন-যাপন, সুবিধিবাদী ও ভোগবাদী চর্চা এসব নিয়ে দলের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছিলাম। প্রশ্ন তুলেছিলাম দলের কতকগুলো মৌলিক অবৈজ্ঞানিক চিন্তা ও তার চর্চার ফল স্বরুপ নেতৃত্বের চরম নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে। অামি কিন্তু প্রশ্নগুলো করেছিলাম দলের অভ্যন্তরে এবং নির্দিষ্ট ফোরামে। অামার প্রশ্নের কোন সঠিক জবাব না দিয়েই কতকগুলো মিথ্যা অভিযোগ এনে, মিথ্যা সাক্ষী জড়ো করে অামাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। হাস্যকর ব্যপার কি জানো, সেটা করা হয় কেন্দ্রীয় সব নেতার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে। অথচ অারো পরে সেই সব নেতারাই একজন অারেকজনের বিরুদ্ধে চরম সব অভিযোগ জনসমক্ষে তুলে এনে মূল সমস্যাকে অাড়াল করতে অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্ক তুলে দল ভাগ করেছেন। এখন তারা নিজেরাই নিজেদের পুরীষ গায়ে মাখছেন। অামার মতো অনেকেই যারা সবটুকু দিয়ে সমাজটি পাল্টে দিতে চেয়ে নিজেদেরকেও ক্রমাগত পাল্টাচ্ছিল, তাদের দুর্বলতাগুলোকে ক্ষমাহীনভাবে বিচার করা সেই সব নেতারা অবশ্য এখন প্রমাণ করেছেন যে, সেই সব শত শত সৎ কর্মির নেতা হবার কোন নৈতিক মানই তাদের ছিল না"।

তিনি তখনও বলে চললেন-- "অামাকে যখন দল থেকে বহিস্কার হয় তখন অমার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। অন্য কোন দলে যোগ দিতে পারিনি মৌলিক মত-পার্থক্যের জায়গা থেকে। তবু জীবনের যে উদ্দেশ্য ঠিক করে একদিন সমাজ পাল্টাতে চেয়েছিলাম, তার থেকে বিচ্যুত হইনি। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে হাওয়া ও ভবিষ্যৎ বিন্ন্যাস হতে পারে বলে অামার ধারণা এবং অাগামী দিনের অান্দোলনের যে গতিমুখ তার জমিন প্রস্তুত করার কাজে যতটুকু পারি নিজেকে যুক্ত রাখতে চেয়েছি। অার তাই গত কয়েক বছর অামি এখানে অাছি। জীবন ধারণের জন্য ছাত্র পড়াই, তবে সেটাই অামার উদ্দেশ্য নই। সুন্দরবন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে অাগামীতে যে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ হবে তার জন্য অাগামী প্রজন্মকে তৈরী করাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করি। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সুন্দরবন রক্ষার অান্দোলন তো সফল হবে না"।

হাঁটতে হাঁটতে অামরা তখন সুন্দরবনের কোল ঘেষা চিলা নামক একটি বাজারে চলে এসেছি। রাত কতটা খেয়াল করিনি। দাদা বললেন, ' চলো ফেরা যাক'। দাদার কথায় যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। মনে হলো ১৮/১৯ বছর অাগে যশোর রেল লাইনে তিনি একই কথা বলেছিলেন। অামার গেষ্ট হাউজটির কাছাকাছি এলে দাদা বলে উঠলেন---- " গাছের যে পাতাগুলো ঝরে যায়, তা দুর্বল বলেই যে সবসময় ঝরে পড়ে তা কিন্ত নয়। কখনও কখনও গাছ নিজের স্বার্থেই তাদের ঝরিয়ে দেয়। অার ইতিহাস ঝরা পাতাদের মনে রাখে না"। কথাটা বলেই ফিরে চললেন তাঁর ডেরার দিকে। সেদিনের সেই গভীর রাতে, অন্ধকার পথ ধরে তাঁর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে, বারবার কানে তাঁর একটি কথায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল 'ইতিহাস ঝরা পাতাদের মনে রাখে না'।

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা