মকছেদ অালীর লাল ঘোড়া

অাশানুর রহমান খোকন

অামি তখন খুব ছোট, ছোট মানে এই ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ি অার কি। বাজারের সাথে স্কুলের পুরাতন বিল্ডিং এর পাশে মকছেদ অালীর একটি চায়ের দোকান ছিল। তাঁকে যে ঠিক চায়ের দোকানদার মনে হতো তা  নয়। গ্রামের মানুষজন সাধারণ ফর্সা হয় না কিন্তু তিনি ছিলেন বেশ ফর্সা। তিনি সাদা লুঙ্গি পড়তেন, গায়ে দিতেন ফতুয়া। তাঁর ঘাড়ে হালকা রঙিন একটি গামছা থাকতো। তাঁর মুখে যতদূর মনে পড়ে একমুঠ দাঁড়িও ছিল। তিনি প্রায় দোকান খুলতেন দেরী করে। তাঁর দোকানে সব ধরণের খরিদ্দাররা অাবার যেতো না। কেন যেতো না সেটা তখন জানতামও না। তবে বিকাল থেকে  অনেক রাত অবধি তাঁর চায়ের দোকানটি খোলা থাকতো। অার সেই দোকানে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অাসতো দূর-দূরান্ত থেকে। বিশেষ করে হাটবারে। সোমবার ও বিষ্যুদবার ছিল হাটের দিন। সেই দিনগুলোতে বিকাল থেকে তাঁর দোকান হয়ে উঠতো সরগরম। অনেক রাত অবধি খোলা থাকতো। তার খরিদ্দারদের কারো কারো ছিল বিচিত্র বেশবাস। কারো কারো চুল ছিল লম্বা, কারো কারো চুল বেণী করা। কেউ কেউ জটাধারী। তাদের মধ্যে অনেকের সাথে থাকতো একতারা বা দোতারা, কারো কারো কাছে বাঁশী। তারা যত না চা খেতো, তার থেকে গল্প করতো বেশী। তর্ক করতো, যত বেলা পড়ে অাসতো তাদের অাড্ডাটা হয়ে উঠতো জমজমাট। বাজারের দিনগুলোতে সেই দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় কখনও কখনও কিছু কিছু শব্দ কানে অাসতো। সে সব শব্দ তখনও অামার কাছে নতুন এবং তার অর্থ বোঝার তো কোন প্রশ্নই অাসে না। সেই সব শব্দের মধ্যে দুটি শব্দ প্রায় শুনতাম। একটি শব্দ 'শরিয়তি' অন্যটি 'মারফতি'। কিছুটা অাগ্রহ, কিছুটা ভীতি কারণ বড়দের অাড্ডা অার কিছুটা মকছেদ অালী সম্পর্কে পূর্বধারণার কারণে অামি যখন তার দোকানটির পাশ দিয়ে হেঁটে স্কুল মাঠের কাছাকাছি মাছের বাজারের দিকে যেতে থাকতাম, কানটাকে খাড়া করে রাখতাম কিছু একটা শোনার অাশায়।

কোন কোন মাসে বাজারের দিন রাতে মকছেদ অালীর বাড়ীতে অাসর বসতো। অনেকে বলতো মকছেদ অালীর খানকাহ্। সেখানে অনেক রাত অবধি গান ও অালোচনা হতো। অারেকটু বড় হয়ে শুনতাম সেসব অালোচনাকে তত্বকথা বলে। শরিয়তি, মারফতি নিয়ে তত্বকথা। সন্ধার পর পর সেই সব অাসরের গান ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ অামাদের কানে অাসতো। হারিকেনের অালোয় স্কুলের হোমওয়ার্ক করতে করতে সেই সব গানের শব্দ ও সুর অামরা শুনতে পেতাম। মাঝে মাঝে মনোযোগ নষ্ট যে হতো না এমন নয়। একটু বেশী রাত হলে অাসরের শব্দগুলো অারো জোরে শুনা যেত। অামরা ততক্ষণে বিছানায়, ঘুমানোর চেষ্টা করতাম। সেই সব কোন কোন রাতে  মা-বাবার কিছু অালোচনা অাধোঘুম অাধোজাগরণ অবস্থায় অামরা শুনতে পেতাম। কোন একদিন যেমন বাবা বলছিলেন, 'এরা যে এত রাত অবধি হৈ হুল্লোড় করে সেটা নিয়ে গত জুম্মার দিন কেউ কেউ অাপত্তি করেছে'। মা তখন বলতেন, 'রাতের বেলা ওরা যদি একটু-অাধটু গান-বাজনা করেই তাতে অন্যদের এত মাথা ব্যাথা কেনো?' বাবা হয়তো বলতেন, 'সবাই তো তোমার মতো করে বোঝে না। ওরা নাকি গাঁজা খায়, অাফিম খায় অারো সব কত কি। তাছাড়া ওরা ঠিকমতো নামাজও পড়ে না। ওরা বলে অাল্লাহ নাকি নামাজ পড়তে বলেন নি, কায়েম করতে বলেছেন। ওরা কিভাবে নামাজ কায়েম করতে হবে তার বিচিত্র সব ব্যাখ্যা দেয়। অনেকে সেসব পছন্দ করে না'। অামার ঘুমে তখন চোখ জড়িয়ে অাসতো। বাবা-মা হয়তো অারো অনেক কথা বলতেন, কিন্তু সেসব অামার শুনা হতো না।

মকছেদ অালীর অাবার একটি ঘোড়া ছিল। লাল রঙের একটি ঘোড়া। সেই ঘোড়া দিয়ে মাঝে মাঝে ভাড়া গাড়ীর কাজ করানো হতো। মকছেদ অালীর সংসারে যে অভাব ছিল সেটা বোঝা যেত। ভাড়ায় চালানো ঘোড়ার গাড়ীটি তাঁর প্রধান অায়ের উৎস। চায়ের দোকান নয়। অামার মনে অাছে ছোটবেলায় অামরা কখনও নুরো খাঁর ঘোড়ার গাড়ী, কখনও বা মকছেদ অালীর ঘোড়ার গাড়ীতে করে নানা বাড়ী যেতাম। অামাদের স্কুলের মাঠে ঘোড়াটিকে কখনও কখনও ঘাস খেতে দেখতাম। মাঝে মাঝে তাঁর ছেলে খাজাকে দেখতাম ঘোড়া দাবড়িয়ে বাজারের ভিতর দিয়ে সোজা দক্ষিণ দিক বরাবর যে দিকটায় ভারতের বর্ডার সেই দিকটায় চলে যেত। অামার খুব ঈর্ষা হতো। খাজার ভাগ্যকে ঈর্ষা করতাম। নিজেকে খাজার জায়গায় ভেবে পুলকিত হতাম। খাজার ঘোড়ায় চড়া দেখে মনে মনে ইচ্ছে হতো, ইস্, অামাদের যদি একটা ঘোড়া থাকতো। বলেছিলামও একদিন বাবাকে। বাবা হেসে বললেন, 'ঘোড়া চালাতে ইচ্ছে করে? অাচ্ছা মকছেদকে বলে দেবো'। 

কয়েকদিন বাদে মকছেদ অালীর ঘোড়ার বাড়ীতে করে কয়েক মাইল দূরে নানার বাড়ীতে যাবার অাগে, বাবা মকছেদ অালীকে বলে দিলেন, অামাকে যেন ঘোড়ায় চড়ানো হয়। নানা বাড়ীতে পৌঁছানোর পর প্রথমে তাঁর পিছনে বসে, ভয়ে জাপটে ধরে চোখ বন্ধ করে ঘোড়ার পিঠে বসে ছিলাম। ঘোড়া ছুটতে শুরু করলে অাস্তে অাস্তে ভয় কেটে যেতে থাকে। অনেকটা সময় ধরে অামরা ঘোড়া চালনা শেষে নানা বাড়ীতে ফিরে এসে অামি খুশীতে ঘোড়াটার গালে একটি চুমু দিয়েছিলাম। অবশ্য পরে একটু লজ্জাও পেয়েছিলাম। অামি খাজাকে ঐভাবে ঘোড়াটিকে চুমু দিতে দেখেছিলাম।

সেদিন সন্ধার পর নানা বাড়ী থেকে ফেরার সময়, জোসনার অালোয় ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটতে থাকা সেই সাদা লুঙ্গি, ফতুয়ার উপর রঙিন গামছা পরা মকছেদ অালীকে দেখে অলৌকিক কিছু মনে হচ্ছিল। লাল ঘোড়াটাকে দেখে মক্তবের হুজুরের কাছে শোনা দুলদুল ঘোড়ার কথা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অামরা যেন দুলদুল ঘোড়ায় চড়ে বাড়ীতে নয়, মকছেদ অালী অামাদের অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন।

স্কুলের পাশাপাশি সেই সময়ে খুব সকালে অামরা মক্তবে যেতাম। অামাদের বৈঠকখানায় সেই মক্তব বসতো। অামরা সেখানে অারবী ও ধর্ম পড়তাম। অামাদের নামাজ পড়ানো শেখানো হতো। গ্রামের রমজান হুজুর অামাদের মক্তবের শিক্ষক ছিলেন। এমন ভাল মানুষ অামি অার দেখিনি। একদিন জুম্মার নামাজের দিন শুনতে পেলাম অামাদের মক্তবের জন্য নতুন হুজুর অাসবে। কেউ কেউ প্রশ্ন করলো রমজান হুজুরের কি হবে। অামরা জানলাম রমজান হুজুর শুধু জুম্মার নামাজ পড়াবেন। নতুন হুজুর এলেন যশোর থেকে। লম্বা পান্জাবী পরা, পাজামা পরিহিত এবং গলায় একধরণের উড়নার মতো পেছানো, মাথায় কেনা টুপি পড়া অল্প বয়স্ক একজন মানুষ। কেন জানিনা নতুন হুজুরকে অামার খুব বেশী পছন্দ হলো না। এমনও হতে পারে রমজান হুজুরকে বাদ দেয়াটাকে অামি হয়তো মানতে পারছিলাম না।

নতুন হুজুর অাসার পর অাস্তে অাস্তে কিছু জিনিষ পাল্টাতে থাকলো। তিনি এসেই ঘোষণা দিলেন এখন থেকে মক্তব্যের সকল ছাত্রকে পান্জাবী পরে অাসতে হবে। শার্ট বা গেন্জি পরা চলবে না। তিনি পান্জাবীর মাপও বলে দিলেন। অামার মনে অাছে ইছাহাক চাচার দোকান থেকে অামি হাঁটুর নীচ পর্যন্ত লম্বা একটি পান্জাবী বানিয়েছিলাম। তিনি একটুু বয়স্ক মেয়েদের বোরকা পরে বা মাথা ও মুখমন্ডল ভাল করে ঢেকে মক্তবে অাসতে বললেন। অামার মনে অাছে অামার বন্ধু অালিম মক্তবে অাসা ছেড়ে দিল, তার বাবা পান্জাবী বানিয়ে দিতে পারেনি বলে। কয়েকমাস পরে জুম্মার নামাজে গেলে শুনতে পেলাম রমজান হুজুরের নামাজ পড়ানো ছহীহ্ নন, তিনি খুৎবা পাঠও নাকি যথাযথ করেন না, তাই নতুন হুজুর এখন থেকে জুম্মার নামাজও পড়াবেন। এভাবেই রমজান হুজুরকে মক্তব ও মসজিদের দায়িত্ব খেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। অামরা অবশ্য ছহীহ্, যথাযথ খুৎবা পাঠ এসব বিষয় বুঝতাম না।

এভাবেই কিছু কিছু জিনিষ অাস্তে অাস্তে পাল্টে যাচ্ছিল। অামাদের মাদ্রাসায় একদিন হুজুর বললেন, 'মকছেদ অালীর খানকাহ্ একটা বেদাত জিনিষ। ইসলাম ধর্মে এসব নিষেধ'। একদিন এভাবেই জুম্মার দিন মসজিদে হুজুর এবিষয়ে অালোচনা তুলল। হুজুরের সাথে অনেকে একমত হয়ে মকছেদ অালীর খানকাহ্ বন্ধের দাবী তুললো। অনেকেই দ্বিমত করলেও সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো মকছেদ অালীকে খানকাহ্ বন্ধের জন্য বলা হবে। সেদিন সন্ধায় মকছেদ অালী অামাদের বাড়ীতে এসে হাজির হলো। বাবার কাছে অনুরোধ করে বললো তাঁর খানকাহ্ যেন বন্ধ করা না হয়। বাবা বললো, 'এটা তো মসজিদে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অামি এককভাবে কোন কথা দিতে পারি না। তবে তোমরা যদি অাফিম-গাঁজা এসব খাওয়া বন্ধ করো তবে তোমার খানকাহ্ রাখার ব্যপারটা অামি দেখবো'। মকছেদ অালী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ও পেয়ে ফিরে গেলেন। 

কয়েকদিন বাদে একদিন খুব সকালে মকছেদ অালী কাঁদতে কাঁদতে অামাদের বাড়ীতে এলো। অাব্বার সামনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে যা বললো সেটা শুনে অামি অসাড় হয়ে গেলাম। গতরাতে কে যেন ঘোড়ার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে। সকালে দেখে মুখে গেজলা তুলে ঘোড়াটা মরে অাছে। মকছেদ অালীর কান্না দেখে, না ঘোড়াটার মৃত্যু সংবাদ শুনে জানিনা অামার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে। অামি ছুটে মকছেদ অালীর বাড়ীতে যাই। দেখলাম ঘোড়াটা তার অাস্তাবলে চিৎপাটাৎ হয়ে শুয়ে অাছে। সারা মুখে ফেনা। একটি মাছি ঘোড়ার মুখে বসে অাছে। একটু দূরে খাজা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে।

অামি একটু একটু করে ঘোড়াটার কাছে গিয়ে তার মুখটা কাছাকাছি গিয়ে বসলাম। নানাবাড়ীতে ঘোড়াটার মুখের যে অংশে চুমু দিয়েছিলাম, মাছিটি সেখানেই এসে বসলো। অামি হাত দিয়ে অাস্তে করে মাছিটিকে সরিয়ে দিয়ে, সেইখানে হাত বুলাতে থাকলাম।

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা