কলম

আফসানা বেগম


দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে মানুষের অতৃপ্ত আত্মা পুরোনো বইয়ের ঘিঞ্জি বাজারে ঘুরে বেড়ানোর কথা কেউ শুনেছে কখনো? বইয়ের পোকা যেমন থাকে, থাকে বইয়ের ভূতও।
বেশ আগের কথা। ঘটনা হয়েছিল যে তিনদিন ধরে আমার হাতে একটা কলম আটকে গেছে। লম্বা হাতার জামা পরে কোনোরকমে ঢেকে রাখছিলাম। কিন্তু ওভাবে কতক্ষণ চলা যায়? কতভাবে ঝাড়াঝাড়ি করলাম, কলম যেই আর সেই, ভাগ্যরেখা বরাবর আটকে ছিল। কোনো উপায় না দেখে যার কাছ থেকে একদিন ওই কলমটা কিনেছিলাম তার কাছেই গেলাম। ভাবলাম দেখি সেই দোকানদার কোনো উপায় বলতে পারে কি না।    
কলমটা কিনেছিলাম পুরোনো বইয়ের বাজারের ভেতরের একটা দোকান থেকে। অফিসের রাস্তায় পুরোনো বইয়ের ওই বাজারটা ছিল আমার আজন্মের নেশা। ওখানকার স্যাঁতসেতে গন্ধে আমার মাতাল মাতাল লাগত। নতুন বই তো কতই কেনা হতো অথচ ওটার সামনে দিয়ে যেতে গেলে মনে হতো কী যেন রতœ সব অনাদরে পড়ে আছে, একটু খুঁজে দেখলে হয়। যেন কালো কয়লায় আমাকে উঁকি দিয়ে ডাকছে কিছু জ্বলজ্বলে হীরে। সেই ডাক প্রায় দিনই অগ্রাহ্য করতে পারতাম না। সেদিনও তেমনি বাসায় ফেরার পথে রিকসা থেকে লাফিয়ে নামলাম। কোনো কিছু না ভেবেই হাঁটা ধরলাম একটা গলি ধরে। খানিকটা এগিয়ে পরিচিত এক দোকানে পুরোনো গন্ধওলা বইগুলো ঘাঁটতে শুরু করলাম। বই থেকে এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরতেই দেখি উলটোদিকে একটা কলমের দোকান। শো-কেসে সারি সারি কলম সাজিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে দোকানের লোকটি। দেখে মনে হলো না বিক্রির তেমন কোনো আগ্রহ আছে। লম্বা একটা খাতা কোলের ওপরে রেখে মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখে চলেছে। এক নজরেই সামনে সাজিয়ে রাখা কলমগুলো আমার কাছে কেমন যেন অন্যরকম মনে হলো। মানে রঙ, আকৃতি, সবসময় যেমন দেখি তার চেয়ে অনেক আলাদা। আর অদ্ভুত একটা ব্যাপার তখন হলো আমার শরীরে নাকি মনে, আমি ঠিক জানি না। মনে হলো ওই দোকানটা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার দিকে। ওখানে যেন চুম্বক আছে আর আমি একটা লোহার টুকরোমাত্র। যন্ত্রের মতো আমি হাত থেকে ভার্জিনিয়া উলফের শ্রেষ্ঠ বইটা নামিয়ে রাখলাম। কৌতূহলী হয়ে পরিচিত দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘শফিক ভাই, এইখানে কলমের দোকান ছিল নাকি আগে?’ তিনিও সেদিকে তাকালেন একবার। বললেন ‘না আপা, তা তো আছিল না। কই থেকে জানি এক লোক আজব সব কলম নিয়া বসছে। বিক্রিবাট্টা তো দেখি হইতেছে না তেমন, কিন্তু সে বইসাই আছে।’ আমি ঠোঁট উলটে বললাম, ‘এই পুরান বইয়ের বাজারে ওরকম বাহারি কলম কিনতে আসবে কে?’ আর তাছাড়া কলমগুলো দেখেও কেন যেন পুরোনো লাগল। দোকানে পড়ে থাকতে থাকতে জিনিস যেমন মলিন হয়ে যায়, তেমন। কিন্ত আমার ভেতরে ওই দোকানের দিকে যাওয়ার টান বিন্দুমাত্র কমল না। মনে মনে যুক্তি খুঁজছিলাম, এই মুহূর্তে বাসায় হাতের কাছে কোনো কলম নেই মনে হয়। কিংবা, কাজের সময়ে একটা কলমও খুঁজে পাওয়া যায় না। একসময় আমি ফাউন্টেন পেন দিয়ে লিখতাম। সেসব কালি ভরা, আবার ধুয়ে মুছে রাখা, বিরাট ঝামেলা। ঝামেলা অবশ্য মনেই হয়নি যতদিন না বাজারে বলপেন এসেছিল। গাদা গাদা বলপেন কেনা হলো তারপর থেকে। বাসার ভিতরে থাকতে থাকতে হারিয়ে গেলে মায়া লাগারও ব্যাপার নেই। দরকার হলো, তো, খাপ খোলা হতো নতুন আরেকটার। ভালো ব্যবস্থা। আর তখন মনে হলো কিনেই যাই একটা কলম লোকটার কাছ থেকে, বিক্রিও তো নেই তার আর আমারও যখন দরকার। 
লোকটার মনোযোগে এত একাগ্রতা ছিল যে সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও চোখ ওঠাল না। মনে হলো সত্যি সত্যিই সে বিক্রি করতে চায় না। খানিক বিরক্ত হয়ে তাকে ডাকলাম, ‘ভাই, কলম দেখতে চাই একটু।’
ধীরে ধীরে মাথা উঠিয়ে রিডিং চশমার ওপর দিয়ে সে আমার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি দেখে মনে হলো কলম কিনতে ক্রেতারও বিশেষ ধরনের যোগ্যতা থাকতে হয়। মনে হলো তার মনে প্রশ্ন আসা-যাওয়া করছে যে তার কলম সে আমার কাছে বিক্রি করবে কি না। বিরক্ত লাগল অথচ আমি সেখান থেকে সরতে পারলাম না। কিছু যেন আমাকে সেখানে আটকে রেখেছিল। আমাকে বেশ খানিকক্ষণ ভালো করে দেখে নিয়ে লোকটা বলল, ‘কী কাজে কলম কিনবেন?’
প্রশ্নটা বুঝতে না পেরে আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কলম কী কাজে কেনে লোকটা তাও জানে না অথচ কলমের দোকান দিয়ে বসেছে! এমনি কী আর ওর বিক্রি নেই? এর দোকানে দুদিনেই লালবাতি জ্বলবে। যাই হোক, আমি যেহেতু কিনব তাই তার কথায় বিরক্ত না হয়ে বললাম, ‘লিখব, তাই কলম দরকার।’ বলেও কেন যেন মনের ঝাল মিটল না। তাই জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা, লেখা ছাড়া কলম দিয়ে মানুষে আর কী করে বলতে পারেন?’ মনে মনে ভাবছিলাম লোকটা কি কাগজ ফুটো করা বা কাউকে খোঁচা দেয়ার মতো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারে? নাকের উপর থেকে চশমা নামিয়ে সে আমার দিকে মনোযোগ দিল তখন। এগিয়ে এসে কাচের ঢাকনা সরিয়ে কলমগুলোকে উন্মুক্ত করল।
‘আহা, লিখবেন তো বটেই, জানতে চাচ্ছিলাম কী লিখবেন?’
আজব কথা তো! লোকটা পাগল নাকি? একটা কলম দিয়ে যা খুশি তাই লেখা যেতে পারে। আমি বাজার খরচের লিস্ট লিখব নাকি মহাকাব্য লিখব তাতে তার কী? এক পলকে আমার মনে পড়ে গেল স্কুলে থাকতে ক্লাসের একজন আমার কালো কালির কলম চোখের সামনে দুলিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘তুই কালো কলম দিয়ে লাল লিখতে পারবি?’ আমি কিছুক্ষণ বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘না রে, তা কী করে লিখব?’ সে দুষ্টু হাসি হেসে আমার খাতায় এক টানে লিখে দিয়েছিল ‘লাল’। আমাকে অবাক হতে দেখে ভেঙেও বলেছিল, ‘বুঝলি না? ল-এ আকার লা লÑ লাল।’ তখন ভাবলাম ওই কলম বিক্রেতার কাছে কি আমার তেমন কোনো কৌশলী উত্তর দিতে হবে? আমাকে কোনো উত্তর দিতে না দেখে, সে আবার প্রশ্ন করল, ‘আপনি তো অনেক কিছুই লিখতে পারেন কলম দিয়ে, তাই না? সেটাই জানতে চাচ্ছিলাম, যেমন মনে করেন, কবিতা বা গান, বাজারের ফর্দ, চেকবুকে সিগনেচার...’
তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা মুশকিল তো! একই কলম দিয়ে কি এই সমস্তকিছু লেখা যাবে না?’
লোকটি যেন আমার বোকামিতে ভীষণ বিরক্ত। হতাশ হয়ে তার কলমের সজ্জায় চোখ বুলিয়ে নিল কিছুক্ষণ। তারপর একটা একটা করে হাতে উঠিয়ে বর্ণনা করতে লাগল। 
‘এই যে দেখেন এটা দেখতে একেবারে সাধারণ বলপেনের মতো। বাজারের ফর্দ, কেবল টিভির স্লিপে সিগনেচার এই ধরণের সাধারণ কাজের জন্য এটা ঠিক আছে। তারপর এই যে দেখেন এটা কিন্তু আরেকটু ভালো জাতের। এটা দিয়ে অফিসের কাজ করা যেতে পারে। তবে খুব দায়িত্বপূর্ণ কাজের জন্য ঠিক হবে না। বড়ো রিপোর্ট, প্রজেক্ট প্রোপোজাল লিখতে হইলে এটা না নিয়ে ওইটা নিলে ভালো। পড়াশোনার কাজের জন্য আলাদা ধরনের কলম আছে। ওই যে ওই দিকে ...’
আমার বিরক্তি চরমে উঠল। আচ্ছা পাগল তো! একেক কাজের জন্য একেক কলম? সে নিজেই এই সমস্ত ভেবে আলাদা করে সাজিয়ে রেখেছে আর এখন কাস্টমারকে ভোলাচ্ছে? এ যেন ঠিক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন। কোকড়া চুলের জন্য এক, ঝরঝরে চুলের আরেক, রঙ করা চুলের এক আবার তৈলাক্ত চুলের আরেক। এই সমস্ত ফালতু চমক দিয়ে আমাকে ভোলাতে পারবে না। আমি নিশ্চিত ছিলাম চড়া দাম ধরবে বলেই এত গল্প ফাঁদছে। আমার মনের কথা কি লোকটা বুঝে ফেলেছিল? কারণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা বন্ধ হয়ে গেল। একটা নামিয়ে রেখে আরেকটা কলম হাতে ওঠানো বন্ধ করল। নিস্পৃহ মুখে জানতে চাইল, ‘কলম লাগবে না বুঝি?’
‘না না, বলুন, শুনছি। আমার কলম লাগবে।’
শোকেসের যেখান থেকে তার হাতটা ফিরিয়ে এনেছিল সেদিকে আবার অগ্রসর হলো। 
‘যা বলছিলাম, এটা হলো লেখাপড়ার। স্টুডেন্টদের জন্য স্পেশাল ডিসকাউন্ট আছে। লাগবে?’
‘না, সে পাট চুকে গেছে। আমি চাকরি করি।’
‘ও, তাই বলুন। তা কী ধরনের চাকরি বলুন তো?’
‘সেটা বলার প্রয়োজন নেই। কারণ আমি অফিসের কাজের জন্য কলম কিনব না।’
‘আচ্ছা, তবে ঘরের এটাসেটা কাজে?’
হ্যাঁ বলতে যাব, ঠিক সেই সময়ে আমার চোখ পড়ল বামদিকের শোকেসের কয়েকটা কলমের উপরে। সেগুলো এত অন্যরকমের যে আমি আগে কখনো ওরকম কলম হাতেই নেইনি। বিচিত্র রঙ আর আকৃতি তাদের। তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। দেখে মনে হলো কলম হলে এমনই হওয়া উচিত। আমাকে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটির চোখ কুঁচকে গেল। চশমাটা আবার নাকের ওপরে বসিয়ে বলল, ‘ওগুলো সাধারণ কাজের জন্য নয়।’
আমি ভয় পেলাম, কে জানে ওই কলমের ব্যাপারে আবার সে কী না কী গল্প শোনাবে। যদি বলে ওগুলো আমার জন্য নয়? কিন্তু আমার মন বলল যে ওগুলোর মধ্যে থেকেই একটা আমার চাই। মরিয়া হয়ে জানতে চাইলাম, ‘তবে ওই কলমগুলো কী কাজের জন্য জানতে পারি?’
‘ওসব প্রাবন্ধিক, কবি বা লেখকদের জন্য। ওগুলো বাসার কাজকর্মে ব্যবহার করলে ঝামেলা হয়ে যাবে।’
‘কেন, কী অসুবিধা?’
‘অসুবিধা আছে। হয়ত কালিই বেরোল না। যে কলম যে কাজের, সেটা করলেই ভালো। তবে সে তরতর করে এগোবে।’
‘না, মানে তবু যদি আমি ঠিক ওই কলমটা কিনতে চাই? ওই যে ওই মেরুন রঙেরটা?’ আমতা আমতা করে বললাম আমি।
শোকেসের  উপরের লাইটে মেরুন স্টিলের কলমটা ঝিলিক দিচ্ছিল। আমার চোখ সেখানেই যে আটকে গেছে তা ওই লোকটাও বুঝেছিল। বলল, ‘ওটা তো গল্প লেখার কলম। আপনি কি সত্যিই নিতে চান ওটা? ওসব কলম নেয়া মানে কিন্তু নিজের ভিতরে অন্য ব্যক্তিত্বের ব্যাপার।’
‘অন্য ব্যক্তিত্ব মানে?’
‘মানে এই যে আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন, এখানে দেখা যাচ্ছে আপনার নিজের ব্যক্তিত্ব। আর যখন আপনি ওই কলম ব্যবহার করে একটা কাহিনি লিখবেন, সেই দুজন মানুষ তো এক নয়। আপনাকে কিছু চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতে হবে, তাদের মতো করে চলতে-ফিরতে হবে, তাদের হয়ে কথা বলতে হবে। তখন কি আপনি অন্য মানুষ হয়ে গেলেন না?’
ঠিক বুঝলাম না লোকটা বিক্রেতা হয়েও আমাকে কলমটা কেনার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে কি না। তবে আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কলমটা পাওয়ার যোগ্য কি আসলেই আমি নই? সে হয়ত আমার মনের কথা বুঝতে পারল, বলল, ‘নিয়ে যান, যদি ওটা দিয়ে আপনার কাজ চলে তো আপনি নিজেই টের পাবেন।’
মেরুন কলম প্যাকেট করে দিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যের হাসি হাসল। আমি দ্রুত বেরিয়ে এলাম ঘিঞ্জি বাজারটা থেকে। অফিসফেরত আমার বাড়ি যাবার তাড়া ছিল। কিন্তু বাইরের দিকে ডাল পুরির গন্ধ নাকে আসতেই মনে পড়ল বাজারে ঢোকার সময়ে দুটো পুরি কিনেছিলাম খাব বলে। কলমের দোকানে ফেলে এসেছি। ফিরে যেতেই  দোকানের লোকটা পুরির প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। আগের চেয়েও বেশি রহস্যময় হাসি তার ঠোঁটে; বলল, ‘আমি জানতাম আপনি ফিরে আসবেন।’
‘হ্যাঁ, কলম দেখতে দেখতে ডাল পুরির প্যাকেটটা ফেলে গিয়েছিলাম।’
‘ওই কলমটা যদি আপনার কাজে লাগে তবে আবারও আপনাকে আমার কাছে আসতে হবে।’ 
জনি না কেন লোকটার হাসিমুখটা আমার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াল তখন। চোখ সরাতে নীচের কলমগুলোর দিকে তাকালাম। আশ্চর্য! খানিক আগে কি শোকেসের কলমগুলো অতটা সাদামাটা ছিল? কেমন যেন খুবই সাধারণ মনে হলো তাদের। কিছুটা অবাক হয়েই জানতে চাইলাম, ‘একটু আগে এখানে কি এই কলমগুলোই সাজানো ছিল?’
 লোকটি হাসল। অবলীলায় বলল, ‘নিশ্চয়। পাঁচ মিনিটে কী আর বদলে যাবে আমার দোকানে?’
‘না, মানে আমার মনে হচ্ছে এসব তো একেবারেই সাধারণ। আপনার দোকানের কলমগুলো তখন মনে হয়েছিল অন্যরকম।’
‘সূর্যের আলো পড়ে গেল তো, তাই অন্যরকম দেখাচ্ছে। আর হ্যাঁ, গল্প লেখার যে কলম আপনি নিয়েছেন, ওটা যখন কারো হাতে যায়, তখন বাকি সব কলম খুব ম্লান লাগে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যাঁ, অল্প কথায় সাজানো কাহিনিতে জরুরি বক্তব্য তুলে ধরার সাথে তুলনা করলে বাজারের ফর্দ লেখা কি খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার নয়?’
‘তা বটে।’
‘আর হ্যাঁ, আপনার কলমে মনে হয় কাজ হবে। তা না হলে এত তাড়াতাড়ি বাকি সব কলম আপনার কাছে সাধারণ মনে হতো না। তার মানে দাঁড়াল গিয়ে, আপনাকে আবার আমার কাছে আসতে হবে।’
লোকটার শেষ কথাটা আর তার মুখে লেগে থাকা অবান্তর হাসি কেন যেন ভালো লাগল না আমার। একটা কলমই তো কিনেছি, কিছু বন্ধক তো রাখিনি যে আবার তার কাছে আমাকে আসতেই হবে? কথাটা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে দ্রুত পা চালালাম। তারপর থেকে মাসখানেক ধরে মাঝে মাঝে কলমটা খাপ থেকে বের করে দেখতাম। একদিন হঠাৎ মনে হলো, একে ব্যবহার করলে গল্প বলতে হবে, এই তো? তবে বলি না কেন? কী নিয়ে লিখব সেটা তখন হয়ে দাঁড়াল চিন্তার বিষয়। জীবনে দেখা কোনো কাহিনি লিখলেই কি হয় না প্রথমে? সেই ছেলেবেলায় দেখেছিলাম একটা ছোট্ট বাচ্চা কুকুরের কামড়ে ধুকে ধুকে মরেছিল চিকিৎসার অভাবে। মসজিদের ইমামসাহেব পানি পড়ে দিয়েছিলেন আর সেটা খাইয়ে তার বাবা-মা পরম নিশ্চিন্ত ছিলেন। হায় রে অন্ধ বিশ্বাস! ইজেকশন না দেয়াতে জলাতঙ্ক তার জীবন কেড়ে নিল। সেই কাহিনিটাই লিখে ফেলি না কেন! যেই ভাবা সেই কাজ। লিখে ফেললাম। কলমটা খুবই দ্রুত চলল। কলমের কাজে আমি মুগ্ধ। কিন্তু লেখা শেষ হতে না হতেই হলো কঠিন সমস্যা; চমকে তাকিয়ে দেখলাম কলমটা আমার হাতে আড়াআড়ি আটকে গেছে। আশেপাশে কোথাও সুপার গ্লু রেখেছিলাম বলে মনে পড়ল না। অনেক ঝাড়াঝাড়ি করলাম। শেষে পানি দিয়ে ধুয়ে দেখলাম আঠা জাতীয় কিছু লেগে আছে নাকি। কিছুতেই কিছু হলো না। হাতের তালু বরাবর কলম আটকে থাকল। কী করব বুঝতে পারলাম না। এরকম আজব সমস্যায় আমার আগে কেউ পড়েছে কিনা তাও জানা নেই। পরের দুদিন অফিস বন্ধ, বাসা থেকে বেরোনোর কোনো কারণ নেই। বাসার কাউকে বলতেও পারলাম না ভয়ে আর লজ্জায়। কেউ যদি জানতে চায়, কেনইবা ওরকম অদ্ভুত একটা কলম আমি কিনতে গিয়েছিলাম আর কেনইবা সেটা দিয়ে আমার গল্প লেখার শখ হয়েছিল, তখন কী উত্তর দেব? আমি যে ভিতরে ভিতরে নিজের একটা পৃথিবী লালন করি সেটা বেরিয়ে পড়বে ওসব কথা বলতে গেলে। সময় কাটতে লাগল আতঙ্কে। গরমকাল হওয়া সত্ত্বেও আমি ভারি চওড়া ওড়না, লম্বা হাতার জামা পরে ঘুরতে লাগলাম। হাতটার দিকে কারো চোখ না পড়লেই হয়! ওই কলম হাতে সাঁটানো অবস্থায়ই দৈনন্দিন সব কাজ করে যেতে হলো। ভীষন ঝামেলা হচ্ছিল। কারণ অবশ্য আটকে থাকা কলম না। কেন যেন মাথার ভিতরে অনেক না বলা কথা কাহিনি হয়ে কিলবিল করছিল। মনে হচ্ছিল স্থির হয়ে বসে লিখে ফেলা দরকার। বুঝতে পারলিলাম, মনের মধ্যে একটা আস্ত গল্প লুকিয়ে রাখার চেয়ে বড়ো যন্ত্রণা যেন আর নেই। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যখনই কাহিনিগুলো মাথা থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল তখনই আমার হাতের তালু যেখানে কলম আটকে ছিল, সে জায়গাটা খুব চুলকাচ্ছিল। কয়েক লাইন লিখলেই চুলকানো ভাবটা খানিক কমে, তারপর যেই আর সেই। সহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু কী করব, সংসারের সব দায়িত্ব ফেলে আমি নিশ্চয় ঘরের দরজা বন্ধ করে লিখতে বসে যেতে পারি না। শেষে চুলকানোর চোটে রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে লুকিয়ে লিখতে বসলাম। যত লিখি ততই আরাম হয়। বুঝলাম, এটা কোনো ডাক্তারের কাছে যাবার মতো ব্যাপার নয়। এভাবেই চিকিৎসাটা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কথা হলো এই কলমটা তো নামাতে হবে হাত থেকে, তার জন্য কী করব? সারাজীবন আমি নিশ্চয় হাতের মাঝ বরাবর একটা মেরুন কলম আটকে ঘুরতে পারি না। কাজকর্মে অসুবিধা হচ্ছিল, এমনকি হাতের বদলে চামচ দিয়ে খেতে হচ্ছিল, সে নিয়েও বাসার সবার ছিল নানান প্রশ্ন। নিজেরই মধ্যে দুটো ভিন্ন ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব নিয়েও যে ঝামেলা হচ্ছিল না, তা নয়। নিজেকে আর কত লুকোনো যায় আপন মানুষদের কাছ থেকে? আমার ভিতরে যে অন্য এক ‘আমি’ জেগে উঠেছে তা তাদের কী করে বোঝাব? তারা কি আমার সেই আমিটাকে চিনবে? মাঝখান থেকে হয়ত ভুল বুঝবে। মাথার মধ্যে কেবল একটি লাইন ঘুরত,‘না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণÑ।’ আশঙ্কায় দু’রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারলাম না। তখন রাগ হলো ভেবে যে দোকানের ওই লোকটা এসবকিছুর ব্যাপারে আগাম সতর্ক করেছিল আমাকে। আমি তার কথা অগ্রাহ্য করেই কলমটা কিনেছিলাম। উপায় বাতলে দেবার জন্য বাধ্য হয়ে কলমের দোকানে তার কাছেই ফেরত যাবার কথা ভাবলাম। কিন্তু সে যাই হোক, লোকটা আসলে একটা ভ-। সে জানতই আমার এই দুর্দশা হবে। তবু বিক্রির প্রয়োজনে কলমটা আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে। আমার বিপদের কথা আমলে নেয়নি। তবে জানত বলেই অত দৃঢ়ভাবে বলেছিল যে তার কাছে আমাকে আবার যেতে হবে।
সপ্তাহের প্রথম দিনে অফিস থেকে সোজা চলে গেলাম পুরোনো বইয়ের বাজারটায়। লোকটা একইভাবে লম্বা খাতায় কিছু হিসাবনিকাশ দেখছিল। দেখে আমার গা জ্বলে গেল। মোটে বিক্রি নেই, অথচ হিসেবে কী মনোযোগ! সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই যথারীতি নাকের ওপর থেকে চশমা নামিয়ে রাখল সে। আগের সেই নির্লিপ্ত ভাব নেই। বরং মনে হলো যে সে আমাকে চিনতে পেরেছে। তার মুখের বিস্তৃত হাসি দেখে বুঝলাম সে আমার অপেক্ষাতেই ছিল। 
‘কী, বিপদে পড়েছেন তো?’ বলে লোকটা আরো এক গাল হাসল। আমাকে দেখে বিপদগ্রস্থ মনে হওয়াতে লোকটার যেন আনন্দ আর ধরে না। তাকে দেখে রাগে-দুঃখে আমি কথা বলতে ভুলে গেলাম। লোকটাই বলে চলল, ‘আটকেছে, না? হা হা হা ... কিচ্ছু করার নেই। মানে এখন একমাত্র লিখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই, সেটাই বলছিলাম।’
আর চুপ থাকতে পারলাম না আমি। 
‘আপনি জানতেন, জানতেন যে আমার এই দশা হবে। ঠিক না? জেনেশুনে আপনি আমাকে বিপদে ফেলেছেন।’
‘বিপদ আবার কী! একটু চুলকাচ্ছে, এই তো? সে যত লিখবেন ততই কমবে, এর মধ্যে জানা হয়ে গেছে না?’
লোকটার মুখে প্রশান্তি। যেন ওটুকু জানা হয়ে গেলেই হলো। আমি পড়েছি বিপদে আর তার খুশি ধরে না। মনে হলো হাত থেকে ছুটিয়ে ছুঁড়ে দেই তার কলম তার দিকে। কিন্তু কী করব, হাত থেকে ছোটাতে পারলে তো!
‘আপনি জেনেশুনে ওরকম বাজে একটা কলম আমাকে গছিয়ে দিলেন? আমার বিপদের কথা একবারও ভাবলেন না?’ 
‘দেখুন, আমি কিন্তু আপনাকে সতর্ক করেছিলাম। বলেছিলাম যে ওই কলম সাধারণ কাজের নয়। বলিনি?’ লোকটার কণ্ঠস্বর গম্ভীর শোনাল।
‘তা বলেছেন কিন্তু এই হাতে আটকে যাবার ব্যাপারটা যদি বলতেন তবেই না হতো।’
‘সে তো আমি আগে থেকে বলতে পারি না। কারো হাতে আটকায় আবার কারো হাতে তো নাও আটকাতে পারে। আগে থেকে বললে মানুষের ইচ্ছের উপরে কর্ত্তৃত্ব¡ করা হয় যে!’
লোকটার গলা অনেকটাই নরম শোনাল। কিন্তু আমি কিছুতেই ভাবতে পারছিলাম না যে হাতে কলম আটকে যাবার মতো ব্যাপারটাকে সে এত সহজভাবে নিচ্ছে কী করে! তার নিজের হাতে আটকালে তখন বুঝত। যাই হোক, ওর সঙ্গে এত কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, ভাবলাম উপায় যদি জানা থাকে তার তবেই হলো।
‘আচ্ছা, এই কলমটা হাত থেকে নামানোর কি আর কোনোই উপায় নেই? মানে এখন না হলেও পরে কখনো?’
‘সত্যি কথা বলতে কী, উপায় নেই। হাতের মৃত্যুর সাথে সাথে কলমের মৃত্যু হবে। কারণ কাহিনির সৃষ্টি যে একটা চলমান ব্যাপার। আপনার মাথার ভেতরে চলতেই থাকবে আর আপনার হাত চুলকাতেই থাকবে। তবে হ্যাঁ, আছে অন্য একটা উপায়।’
আমি চমকে তার দিকে তাকালাম। 
‘আছে? আছে উপায়? বলুন, আমি মুক্তি চাই এটা থেকে। তিন দিনেই আমার অবস্থা কাহিল।’
লোকটি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। কোনো কারণ ছাড়াই আবার গম্ভীর হয়ে গেল। যেদিন আপনার কলম থেকে এমন কিছু সৃষ্টি হবে যার মধ্যে লুকিয়ে থাকবে বীজ, সেদিন আপনার আটকে থাকা কলমের ভার কমবে।’
‘মানে? গল্পের মধ্যে বীজ! গল্প কি ফল নাকি?’
‘হ্যাঁ। গল্পের মতো গল্প হলে একটি গল্প থেকে সৃষ্টি হতে পারে হাজার গল্প। মানে আপনার কলম দিয়ে লেখা একটি লাইন কারো মনে জন্ম দেবে অসংখ্য লাইনের। তখন মনে হবে যে আপনার কলমটা তার হাতে আটকে গেছে। এমন হলে ভালো হয় না? ব্যাপারটা হলো গিয়ে যে সৃষ্টি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে না, সেই সৃষ্টির দরকার কী?’
আমি চুপ করে শুনছিলাম। লোকটা বড়ো নিশ্বাস ফেলল। তারপর আবার বলা শুরু করল, ‘সুতরাং এমন সৃষ্টি যখন হবে যাকে ভাঙিয়ে হতে পারে অসংখ্য সৃষ্টি, একমাত্র তখন আপনি মুক্তি পাবেন।’
‘কী করে বুঝব সেটা?’
‘আপনাকে বুঝতে হবে না। যে পড়বে সে জানবে।’ লোকটি গম্ভীর হয়ে গেল। যেন বহু কথা বলা হয়ে গেছে। আর বলার কিছু নেই। চশমাটা নাকে উঠিয়ে আবার হিসাবের খাতাটা হাতে নিল সে। ভাবটা এমন আমি সেখান থেকে চলে গেলেই সে বাঁচে। আমারও আর দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। একে তো সে আমাকে একটা বিপদে ফেলেছে তার ওপর কী সব আবোলতাবোল গল্প বানিয়ে বলছে। চলে আসার জন্য পা বাড়াতে গিয়ে তাকে দেখে মনে হলো তার হঠাৎ কিছু মনে পড়ল। চোখ উঠিয়ে বলল, ‘যেদিন আপনার কলম অন্য কাউকে প্রভাবিত করবে, আপনি হয়ত বুঝবেন। হয়ত দেখবেন তার হাতের শিরাগুলো সবুজ হয়ে যাচ্ছে। প্রাণশক্তিতে ভরে যাচ্ছে সে। আর আপনার কলমের ভার চলে যাচ্ছে তার হাতে। একের থেকে অনেক হয়ে কলম ছড়িয়ে পড়ছে আরো অনেক সবুজ হাতে।’
বলতে বলতে সে যেন অন্য কোনো জগতে চলে গেল। দরাজ গলায় চর্চিত আবৃত্তির মতো শোনাল তার উচ্চারণ। তখন তাকে দেখতে জাদুকরের মতো লাগল আমার। যেন আমার চারদিকে একটা মায়ার জাল রচনা করার চেষ্টা করছে। তার পাগলামি থেকে বাঁচার জন্য সরে পড়াই ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে হলো। চট করে ঘুরে দাঁড়ালাম। উলটো দিকে পরিচিত বইয়ের দোকান। মনে পড়ল, কলমের নেশায় সেদিন নেব নেব করেও হাতে নিয়ে খানিক ঘাঁটা বইটা নেয়া হয়নি। এগিয়ে গেলাম সেদিকে। 
‘শফিক ভাই, সেদিন যে এ রুম ফর ওয়ানস ওউন বইটা দেখছিলাম, বিক্রি হয়ে গেছে নাকি?’
শফিক ভাই হাসলেন। 
‘না, আপা। আপনার জন্য উঠায়ে রাখছিলাম। আপনি তো বইটা নিবেন বইলা হুট কইরা কলমের দোকানের দিকে দৌড় দিলেন। এই যে নেন।’
বইটা তার হাত থেকে নিয়ে যেই টাকা দিতে যাব, শফিক ভাই আঁতকে উঠলেন। 
‘এ কী, আপা! আপনার হাতেÑ’
আমি আর তাকে কথা বলার কোনো সুযোগ দিলাম না। আমাকে অন্যমনস্ক হতে দেখে শফিক ভাই উলটোদিকের কলমের দোকানের লোকটির দিকে কটমট করে তাকালেন। সেখানে একই দৃশ্য। লোকটি নিশ্চিন্ত মনে তার হিসাবের খাতায় মনোযোগী।

আমার লেখা চলতে লাগল। হাতে যখন কলম আটকেই থাকত তখন অবসর হলেই শুরু করে দেই। গাদা গাদা পা-ুলিপি জমা হতে লাগল। ভাবলাম জমিয়ে রেখে কী করব, আমি তো জীবনানন্দ দাশ নই, আমার কাছে ট্রাঙ্কও নেই যে তাতে ভরে রেখে নিশ্চিন্তে মরে যাব। তাই ছাপতে দিলাম। ছাপা হতে লাগল। কলমের দোকানদার বলেছিল, কেউ পড়ে যদি প্রভাবিত হয়, সেখান থেকে আরো কাহিনি তৈরি হয়ে যায়, তবেই আমার হাতের আটকে থাকা কলমের ভার কমবে। সেজন্যে ছাপা ছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু গল্প ছাপার পরে আমার ইচ্ছে করে কোনো পাঠককে আড়াল থেকে দেখি। আমার কাহিনি কি তাকে ভাবাচ্ছে? তার মনে নতুন কোনো সৃষ্টিশীল ভাবনা কি জেগে উঠছে? দেখি যে তার হাতের শিরাগুলো সবুজাভ হয়ে উঠছে নাকি! দেখা হয় না। জানা হয় না। ভয়ে ছাপার কথা কাউকে বলিও না। বাসার লোকেরা একদিন দেখে চমকে উঠল, এসব কী লিখেছ? এ কার কাহিনি? এমন কাউকে তুমি চেন নাকি? নাকি এটাই তুমি? এসব কথা আমাদের আগে বলোনি কেন? এত এত প্রশ্নের কোনো জুতসই উত্তরই ছিল না আমার কাছে; থাকত না। তাই ছাপার ব্যাপারটা চেপেই যেতে হতো। আর এদিকে কলমও হাত থেকে নামে না আর লেখাও থামে না। ধীরে ধীরে লক্ষ্য করলাম কেবল আমি নই, কত কত মানুষের হাতে কলম আটকে আছে! কেউ কেউ বেশ বুক ফুলিয়েই দেখাচ্ছে, আমার মতো লুকিয়ে রাখতে হয় না কারে কারো। কত মানুষে কত কী লিখে চলেছে, আমি দেখতাম। বহুবার আমার নিজের হাতের শিরাগুলোও দগদগে সবুজ হয়ে উঠতে দেখলাম আমি। তখন হাতের কলম যেমন  লুকোতে হতো, তেমনি সবুজ হয়ে যাওয়া শিরাগুলোও লুকিয়ে রাখতে হতো। যারা আমাকে নির্বাক, পুতুল হিসেবে ভাবত, যারা ভাবত আমার নিজস্ব কোনো চিন্তাভাবনা বা মতামত থাকতে পারে না, তারা দেখতে পেলে ঝামেলা হয়ে যাবেÑ আমি জানতাম। সেই আশঙ্কায় সবুজ শিরাগুলো লুকিয়ে রাখতাম বরাবর। তারপর দেখলাম নিজে যত সৃষ্টি করতে পারছি ততই শিরাগুলো শরীরের রঙের সঙ্গে মিশে যেতে শুরু করেছে। সে এক অদ্ভুত আনন্দ। কারো কাছে ভেঙে বলার নয়। 
পুরোনো বইয়ের বাজারে যাওয়া ছাড়িনি অবশ্য। সেই কলমের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম মাঝেমধ্যে। ক্রেতা বেড়েছে। হঠাৎ কোনোদিন কেউ এসে যখন বামদিকের কোণের শোকেস থেকে ওই আলাদারকম কলমগুলো নেড়েচেড়ে দেখত, শেষে একটা কিনেও ফেলত, দেখলে আমার মন ভরে যেত। তার মুখের দিকে আমি অদ্ভুত আকাক্সক্ষা নিয়ে তাকাতাম। মনে মনে বলতাম, আবার এসো। আমাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে দোকানদার লোকটি মিটিমিটি হাসছিল একদিন, ‘আপা, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখেন?’ আমি তার কথার উত্তর না দিয়ে উলটো বললাম, ‘আজকাল এত মানুষের হাতে কলম আটকে যাচ্ছে, ভাই। দূর দূরান্তের মানুষরাও বাদ পড়ছে না। আপনার নেটওয়ার্ক তো দেখি খুব শক্তিশালী।’
‘সেটা আপা ঠিকই বলেছেন। তবে আমি একা নাকি? এই লাইনে আরো বহু মানুষ আছে।’
বলতে বলতে মৃদু হাসল সে। শোকেসের ভেতরে পড়ে থাকা ভীষণ মলিন একটা কলম বের করে নরম কাপড় দিয়ে মুছতে থাকল। মনে মনে ভাবলাম, এত পুরোনো হয়ে যাওয়া একটা কলম ধুয়েমুছে রাখাই সার; বিক্রির আশা নেই। সে আমার দিকে তাকিয়ে আবার হাসল; কলম দেখিয়ে বলল, ‘এই কলমটা জং ধরে গেল। বিক্রি আর হবে বলে মনে হয় না।’
‘কেন?’
‘প্রেমপত্র লেখার কলম। আজকাল কারো লাগে না তো তাই কেনে না।’
‘সে কী! হানাহনির চোটে প্রেম কি উধাও হয়ে গেল মানুষের মন থেকে?’
‘না, ঠিক তা না। সব ডিজিটাল হয়ে গেল যে। ছবিওলা নীল খামের আর দরকার পড়ে না।’
আমি চোখ বন্ধ করে তেমন একটা খামের কথা ভাবতে লাগলাম। ভিতরে সুগন্ধী গোলাপি চিঠি। দোকানদারের অনরকম কণ্ঠস্বরে ঘোর কাটল। মনে হলো বেশ কাছে এসে বলছে সে, ‘আপা, জানেন, এই মার্কেটে একটা চাপাতির দোকান হয়েছে? ওই যে শেষ মাথায়।’
‘চাপাতি মানে?’
‘অস্ত্র। মানুষকে কোপ দিয়ে মেরে ফেলে। মানুষের কথা থামিয়ে দেয়।’
‘কেন? বইয়ের বাজারে চাপাতি কে কিনবে?’
‘কেনে, আপা। যার যেটা দরকার সে সেইটাই কেনে।’ 
শেষ কথাটা লোকটা আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল। কেন যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। বললাম, ‘আজ যাই।’     
বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, কারো কারো লেখা নিয়ে তোলপাড় হয়ে গেছে শুনেছি বটে। একজনের লেখায় আরেকজনের বিশ্বাসে আঘাত লাগে। লাগতেই পারে। কিন্তু আমি ভাবি মানুষ কেন যার যার বিশ্বাস নিয়ে থাকে না? অবিশ্বাসী একজন বিশ্বাসীকে খুন করেছে, এমনটা কখনো শোনা গেছে? অথচ বিশ্বাসী অবলীলায় অবিশ্বাসীকে কোপ দিতে পারে। পরপর কিছুদিনের মধ্যেই অবিশ্বাসের ধুয়ো তুলে পরপর কয়েকজনকে কুপিয়ে ফেলা হলো। কলমের দোকানদারকে একদিন বলছিলাম, ‘খুনের কী দরকার পড়ল? যে বই তাদের বিশ্বাসে আঘাত দিয়েছে তার উলটো একটা বই লিখলেই তো হতো। যাকে বলে যুক্তিখ-ন?’ সেই প্রথম লোকটাকে দেখলাম হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আমার রাগ হলো। আমি কী এমন হাসির কথা বলেছি! হাসি থামলে সে বলল, ‘কোন দুনিয়ায় যে থাকেন, আপা, যুক্তিখ-নের চেয়ে কোপ দিয়ে খুন করে ফেলা সহজ না?’ আমি কেনো উত্তর দিলাম না। ভাবলাম অপেক্ষায় থাকি, ওই চাপাতিওলাদের হাতে কি কখনো একটা কলম আটকে যেতে পারে না? দোকানদারকে সে কথা বললাম না অবশ্য। কে জানে আমার কথাকে সে আমারই অবচেতন অসহায়ত্ব ভেবে বসে নাকি। তবে সেসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি নিজেও কেন যেন অন্য সব সামাজিক কথাবার্তা আর আন্তঃসম্পর্কের প্যানপ্যানানি রেখে ওই বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে লেখা শুরু করে দিলাম। আমার কাছে মনে হলো সাধারণ কথাই লিখেছি অথচ সেসব গল্প নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলো। এক পক্ষ খুশি হলো; বলল, এরকম সময়ের জন্য একেবারে উপযুক্ত উচ্চারণ। কেউ আশঙ্কা জানাল, বলল, বিপদে পড়ব আমি। কেউ আবার ভয়ানক রেগে গেল, পারলে তখনই আমাকে মৃত্যুদ- দিয়ে দেয়। বিষয়টা নিয়ে এত বেশি কথা হলো যে আমার বাড়ি পর্যন্ত তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল। বাড়িতে আমাকে লেখালেখি বন্ধের জন্য আলটিমেটাম দিয়ে দেয়া হলো। সবাই একরকম বয়কট করল আমাকে। নিশুতি রাতে ঘর অন্ধকার করে আমি বিছানায় বসে থাকলাম। কখনো কোনো সঙ্গীর দরকার মনে করলে ভার্জিনিয়া উলফের সেই এ রুম অফ ওয়ানস ওউন বইটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে কাঁদতে থাকতাম। মনে মনে তার কথা ভাবতাম। কেন সে সহ্য করতে না পেরে পানিতে লাফ দিয়েছিল? কেন আর লেখেনি? তার কলমের ভর কি তখন এতই হালকা হয়ে গিয়েছিল যে সে নিজেই মুক্তির পথ বেছে নিল?
কোনোদিন আবার পুরোনো বইয়ের বাজারে সেই কলমের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কেউ যখন বামদিকের শোকেস থেকে কলম কিনত তাকে দেখতে আমার কাছে দেবশিশুর মতো লাগত। মনে হতো কলম হাতে নেয়ার সাথে সাথেই তার মুখে একটা হলদে আভা চলে এল। নাকি সূর্যের আলো বদলে যেত, যে কারণে তখন তার মুখটা উজ্জ্বল আর সামনের অন্য কলমগুলো স্লান মনে হতো, আমি বুঝতে চেষ্টা করতাম। বাড়ি ফিরে আমি আবার লিখতে বসতাম। আরো লিখতাম। 
তারপরেও চারপাশের পরিস্থিতি সবসময় চাইলেই এড়ানো যেত না। রাস্তাঘাটে ভয় লাগত। কিন্তু ভাবতাম, লিখলে বিপদ হবেÑ এই আশঙ্কায় কেউ যদি লেখা বন্ধ রাখে তবে যারা থামাতে চাইছে তারা তো এমনিতেই জিতে গেল। আর তাছাড়া হাতের তালুর সঙ্গে কলম ঝুলে আছে না? তার কী হবে? না চাইলেও যে লিখতে হবে। 
একদিন মন খারাপ করে অফিস থেকে ফেরার পথে কলমের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটু পরে দোকানের লোকটি কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘আপা, মনে আছে গলির শেষের দিকের চাপাতির দোকানের কথা বলেছিলাম?’
‘হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?’
‘একজনের হাতে না ওই দোকানের একটা চাপাতি আটকে গেছে। এখন আপা তার আর কোনো উপায় নাই যাকে বলা হবে তাকে কোপ দেয়া ছাড়া।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যাঁ। আপনি বাড়ি যান। কিছুদিন এই রাস্তায় আর আসবেন না।’
আমি বললাম, ‘তা কেন? আমি কি কাউকে ভয় পাই? আমার যেখানে খুশি আমি যাব। আমার যা বলতে ইচ্ছে করবে আমি তাই লিখব।’
‘ব্যাপারটা হয়েছে কি আপা, তাদেরও যাকে খুশি তাকেই কোপ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
‘আপনি কী করে জানলেন?’
‘আমার কাছে সব খবর থাকে। তারা আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমার দোকানও নাকি ভাঙবে। আমার জীবনেরও নিশ্চয়তা নেই, আপা।’
‘বলেন কী!’
আমার বিস্ময় মিলিয়ে যাবার সময় পেল না, তার আগেই দেখি কলমের দোকানের দিকে দুজন লোক ছুটে আসছে আমাকে লক্ষ্য করে। আর সত্যি সাত্যি তাদের একজনের হাতে একটা চাপাতি আটকে আছে। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠল সেটা। আমার শরীর অসার হয়ে এল। আমি যেমন লেখায় বাধ্য, সেও কি খুনে? কলমের দোকানের লোকটির চিৎকারে যেন আমার জ্ঞান ফিরে এল, ‘আপা ওইদিকে পালানÑ’ ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানগুলোর ফাঁক ফোকড় দিয়ে একটা গলির দিকে সে আঙুল তাক করে দেখাল। আমি দৌড় শুরু করতে না করতেই লোকদুটো প্রায় পৌঁছে গেল কলমের দোকানের কাছে। দোকানের লোকটির উঠে থাকা হাতের ওপরে প্রথম কোপটা পড়ল। রক্ত বেরোলো কি না দেখার আগেই আমি গলির মুখে অদৃশ্য হতে চেষ্টা করছিলাম। ব্যাগ, ওড়না সব কোথায় যেন ছিটকে গেল। চারদিকে মনে হলো হাজার মানুষ তামাশা দেখছে। অথচ আমি আমার আর হাতে চাপাতি আটকে যাওয়া ওই লোকটা ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব টের পেলাম না। যেন ধু ধু মাঠ, কোথাও কেউ নেই। শিকার আমি সামনে দৌড়াচ্ছি আর পেছনে দৌড়াচ্ছে আমার শিকারি। তারপর হঠাৎ আমার ভুল ভাঙল। দেখলাম এক অল্প বয়সি ছেলে ঠিক আমার পাশে পাশে দৌড় লাগিয়েছে। সে ওই চাপাতিওলাদের দলের কেউ, নাকি আমাকে বাঁচাতে চায়, এক নজরে ঠিক ধরতে পারলাম না। খানিক পরে দেখলাম সে আমাকে প্রায় ধরে ফেলেছে। তীব্র দৌড়ের বেগেই আলতো করে কলম আটকে যাওয়া আমার হাতটা ছুঁয়ে দিল সে। সাথে সাথেই অদ্ভুত এক ব্যাপার হলো। সেই তুমুল উত্তেজনার ভেতরেও আমি টের পেলাম যে আমার কলমের ভার হালকা হয়ে যাচ্ছে। পাশে এক পলক তাকিয়ে দেখলাম ছেলেটির হাতের শিরাগুলো ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে। আমার মন বলল, আমি যেটুকু পর্যন্ত করেছি, সে তার পর থেকে শুরু করবে। এভাবেই চলতে থাকবে। ছেলেবেলায় স্কুলের স্পোর্টসে রিলে রেস নামে যে খেলাটা হতো, তার কথা মনে পড়ল আমার। আমরা সবাই যেন রিলে রেসের খেলোয়াড়। জীবন এত বড়ো নয় যে সবাই লক্ষ্যে পৌঁছবে; সবার পৌঁছানো জরুরিও নয়। লক্ষ্যে পৌঁছানোই যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে একের সম্পদ নিয়ে আরেকজন পৌঁছে গেলে ক্ষতি কী! জানি না আমার ভাবনার মধ্যে ছেলেটি প্যাঁচানো গলিগুলোর কোন একটাতে চট করে ঢুকে পড়ল আর মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। তাকে অনুসরণের চেষ্টা করতে পারলাম না। মনে পড়ল পেছনে উদ্যত চাপাতি। আমি কি তাদের ছাড়িয়ে এসেছি? নাকি তারাই ধরে ফেলেছে আমাকে? ফিরে তাকিয়ে দেখব কি না ভাবতেই প্রথম কোপটা পড়ল কলম আটকে থাকা আমার হাতটায়। আমি ফিরে আততায়ীর মুখটা দেখলাম। কত সৌম্য হতে পারত সে মুখ যা তখন ঘৃণা দিয়ে লেপা! কিন্তু ঘৃণার উৎপাদন ছাড়া তার হয়ত কিছু করারও ছিল না। তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে যা দিয়েছে সে সেটাই নিয়েছে। আমারইবা কী করার ছিল, একটা কাজ অবশ্য করতে পারতাম, তাদের বিশ্বাসে অন্ধের মতো সুর মেলাতাম। তবে আমার জন্য সে-ও কি মৃত্যুর চেয়ে কম কিছু হতো? অতটুকু সময়ের মধ্যে এত ছবি সামনে আসছিল, এত কথা মনে হুড়োহুড়ি করছিল যে কী বলব। আমার সারাটা জীবনের গল্প, যারা আমাকে ভালোবেসেছে তাদের মুখ, যারা আমাকে অপছন্দ করেছে তাদের বিরক্তি সমস্ত কিছু আমার সামনে একেকটা ¯্রােতের মতো চলে গেল। 
দ্রুত চলে যাওয়া দৃশ্যের আনাগোনা বেশিক্ষণ চলেনি অবশ্য। দ্বিতীয় কোপটা ঠিক আমার ঘাড়েই পড়েছিল। সেই থেকে কলমের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। 
........................................................   
                                      
           
  
   
 
           
   
                 
       
 

   
                  

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা