চেনা মানুষকে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে

মাদল হাসান


ফয়সাল রায়হান পুরুষতান্ত্রিকতার ঘোর বিরোধী।  নারীমুক্তি,  নারী-অধিকার,  নারী-পুরুষের সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন এ-সবই তাঁর সারা-জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। সারাজীবন যেন তবু নয়। কেননা, কতই-বা বয়স তাঁর। সবে তো মধ্যবয়সী।  বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, তারুণ্যেও শুরুতেই সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠতি ছাত্রনেতাদের সংস্পর্শে এসেছিল। ঠিক তেমন-তেমন সময়ে সুজলা শারমীনও ঐ সময়ের নারী নেত্রীদের সংস্পর্শে আসে। সুজলা শারমীন উদ্বুদ্ধ হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা রেহনুমা আহমেদের দ্বারা। তখনই তাঁর যাতায়াত শুরু হয় ‘দৃক-গ্যালারি’-তে। ঢাকার রিকশাঅলা-নামে একটা সলো একজিভিশনও হয় তাঁর। আর সেই একজিভিশনেই তরুণ ছাত্রনেতা ফয়সাল রায়হানের সঙ্গে সুজলার সাক্ষাত, পরিচয়, সখ্য এবং অবশেষে প্রেম ও পরিণয়।

রবীন্দ্রনাথ যেমন নারীকে সম্পত্তি নয়, সম্পদ বলতে চেয়েছেন, তেমনি সেসময়ের নারীরা সম্পদ বলারও ঘোর বিরোধী। সমযাত্রী, সমতীর্থক, সমব্যথী ইত্যাদিই যেন প্রাধান্য পেতে থাকে তাদের চিন্তায়। ফয়সাল রায়হানও তেমন-তেমন বিশ্বাস ও চর্চায় নিজেকে গড়ে নিতে থাকে এবং সুজলা ও অন্যান্যদের আস্থাও অর্জন করে। তারই ধারবাহিকতায় তাঁরা একটি বামপন্থি রাজনৈতিক দলে যোগদান করে। মাঠে-ময়দানে, আড্ডায়-সেমিনারে, মিছিলে-সমাবেশে, ক্যাফেতে-লাইব্রেরিতে এমনকি নিজের বাড়িতেও ফয়সাল কখনো নিজেকে সুজলার মালিক দাবি করে নি।মালিক তো নয়ই; বরং সম্পত্তি বা সম্পদও নয়; এমনকি স্বামীত্বের দাবিও যেন নেই। যেনবা দু’জন মানব-মানবী কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমমেট। সৌজন্যের সহস্র মিছিলে ভেসে-আসা দুই মানব-মানবী। ঘরে-বাইরে চলতে গিয়ে, বিশেষত বাইরের পৃথিবীতে চলতে গিয়ে সবসময় যে এক রিকশাতেই চড়তে হবে তেমনটা নয়। হয়তো মুনার রিকশায় উঠে গেল ফয়সাল, তো সুজলাও বিন্দুমাত্র বিলম্ব না-করে উঠে পড়লো ফারহানের রিকশায়। আড্ডায় কোনো জটিল সিদ্ধান্তে সুজলা হয়তো ফয়সালের সামনেই ফাহিমকে বললো,‘ ফাহিম, এ-ব্যাপারে কী করা যায়?’ ফাহিম হয়তো ব্যাপারটা আরো ভালোভাবে বুঝে বললো, ‘এ-ব্যাপারে ফয়সাল ভালো জানে’। ফয়সাল তখন আরো ভালো বুঝে বললো, ‘আসলে আমি আর ফাহিম যা বলবো, তা-সহ বিস্তারিত বলতে পারবে ফারহান। আপনি বরং ফারহানকেই বলতে বলেন’। এই যে, সৌজন্যসহ হঠাৎ হঠাৎ কালেভদ্রে আপনি সম্বোধন, এটিও সেই সম্পর্কের নতুন অভিঘাত যেন। যেন একজন ব্যক্তি-মানুষ আরেকজন ব্যক্তি-মানুষকে বাইরের পৃথিবীতে, উন্মুক্ত জল-হাওয়ায়, উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থায় উদারভাবে খুঁজে পেতে চাইছে। এই যেমন এখন ফয়সাল বলছে, ‘আজ আর.সি মজুমদার মিলনায়তনে একটা সেমিনার আছে। গাইবান্ধায় সাঁওতাল উচ্ছেদ: প্রস্তাবনা ও প্রতিকার। আপনি কি যাবেন?’ ঠিক সঙ্গে সঙ্গে সুজলার উত্তর, ‘তাঁরা তো আমাকে দাওয়াত করে নি। আমি কেন যাবো? আপনি অহনাকে নিয়ে যান। দেখি কী করা যায়।’ ফয়সাল মুচকি হেসে বললো,‘ আমাদের একটু দেইখেন’।

সেমিনার চলছে। এরমধ্যেই পিছনের দরজা দিয়ে কয়েকজন ফটোগ্রাফারের সঙ্গে সুজলাও ঢুকলো। তখন ফয়সালই বক্তৃতা করছিল।কিন্তু অন্যান্যরা ক্লিক করলেও সুজলা তাঁকে ফ্রেমে ধরলো না। বরং পিছনের ব্যাকগ্রাউন্ডসহ বসে-থাকা বয়স্ক বক্তাদের ফ্রেমবন্দি করলো। ফয়সাল এই অবহেলাকে ব্যাখ্যা করলো এভাবে যে, বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ এবং প্রবীণদের উপস্থিতিই এখানে বেশি ভূমিকা রাখবে। তাই, সুজলার সিদ্ধান্ত অন্যান্য ফটোগ্রাফারদের তুলনায় সঠিক। তবে, ফয়সাল অপেক্ষায় থাকবে, প্রতীক্ষায় থাকবে সুজলার মতো বিখ্যাত ফটো-জার্নালিস্টের ফ্রেমের মধ্যমণি হতে।

সুজলাও কিন্তু তেমনি। এই যেমন সেমিনার শেষে চায়ের আড্ডায় ফয়সাল যখন প্রথম চায়ের কাপটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আঞ্জুমান আরা লিপিকে এগিয়ে দিলো এবং সুজলার দিকে ফিরেও তাকালো না, তখন সুজলাও ছাত্রনেতা নাঈমের হাত থেকে কফির কাপটা নিতে নিতে ভাবলো, কেনই-বা ঘরে-বাইরে সর্বত্র স্ত্রীকে প্রাধান্য দিতে হবে?

এতো গেল বাইরের পৃথিবী। ঘরে ফেরার ব্যাপারেও কোনো গঁৎবাঁধা নিয়ম তাঁরা মানে না। একজন হয়তো তাঁর বন্ধু কিংবা বান্ধবীদের নিয়ে বাসায় আড্ডা দিচ্ছে কিংবা চা-নাস্তা-ফলমূল খেতে-খেতে জরুরি আলাপ-আলোচনা সারছে, ঠিক তখন অন্যজন এলে বলে, ‘কী ব্যাপার, এই সময়ে? এখন তো আপনার আসার কথা ছিল না। আপনাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ফ্রেশ হয়ে চা খান। আপনার বন্ধুরা বারবার আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল’। সুজলাও সমান সৌজন্যে বলে, ব্যস্ত হবেন না ফয়সাল রায়হান। হাওর অঞ্চল কাভার করে এলাম। কোটি কোটি টাকার ফসল, মাছ নষ্ট হয়ে গেছে’। ফয়সালও ঠিক তখনই প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের সঙ্গে বলে, হ্যাঁ, আমরাও ঐ ব্যাপারেই আলোচনা করছিলাম। লিজপ্রথা তুলে না-নিলে ঐ অঞ্চলের মানুষ না-খেয়ে মারা পড়বে’।

এভাবে ঘরে-বাইরে তাঁরা চিন্তা ও কর্মের সংহতি স্থাপন করতে চায়। মাঝে মাঝে তাদের মনে হতে থাকে, তাঁরা যেন রোবট হয়ে যাচ্ছে। নিজেদেরই তৈরি করা নিয়মের নিগড়ে বাঁধা পড়েছে তাঁরা। যেন বা দিন দিন তাঁরা কন্সেপ্ট-কিঙ্কর হয়ে যাচ্ছে। অথচ মানুষ যেমন অভ্যাসের দাস, তেমনি অভ্যাসও মানুষের দাস। কেননা, সবসময় অনুমতি নিয়ে নিজের স্বামী বা স্ত্রীকে ছোঁয়া যায় না। বলা যায় না, আমি কি আপনাকে চুমু দিতে পারি? ‘কীভাবে শুরু করা যায়’-জাতীয় সমস্যা কখনো-কখনো তাদের ঘিরে ধরে। সবসময় সতর্ক সৌজন্য সীমাহীন ক্লান্তি বয়ে আনে। অধিকার ছেড়ে দিয়ে অধিকার রাখবার মতো বিড়ম্বনা যেমন নেই, তেমনি সৌজন্য ভেঙে-ফেলে সৌজন্য রক্ষা করাও কঠিন। একইভাবে, সৌজন্যেও প্রাচীর কিংবা অচলায়তন গড়ে তুলে সেটা ভাঙাও ততোধিক কঠিন। এমনতর আলোচনা-সমালোচনা-আত্মসমালোচনার মাধ্যমেই কোনোদিন ফয়সাল, তো কোনোদিন সুজলা তাদের স্বাভাবিক সাংসারিকতায় ফিরে আসে। সন্তান তাঁরা নেয় নি। কারণ, তাঁরা রক্তের উত্তরাধিকারে বিশ্বাসী নয়। বন্ধু-বান্ধবীরা বিদায় নিলে আজ ফয়সাল সহজভাবেই বললো,‘ হাওর অঞ্চলের ফটোগ্রাফিগুলি নিয়ে তোমার একটা সলো করি?’
-‘ না, এখন সলো করার সময় না। তুমি রাজনৈতিক প্রোগ্রাম করো।’

-‘ না, মানে, ফটোগ্রাফিও তো রাজনীতিরই অংশ!’

- ‘এখানেও প্রতিযোগিতা আছে। যাঁরা এই সোসাইটির অংশ, তাঁরা না-বললে ব্যাপারটা ন্যাকেড লাগে।অন্যরা বললে দেখা যাবে!’

এভাবেই, যেনবা সাংসারিক আলাপ-আলোচনাতেও সাংগঠনিক মিটিং-এর আবহ বিরাজ করে। কেউই তাঁর ট্র্যাকের বাইরে এসে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ হারাতে চায় না। ফয়সাল আর কথা না-বাড়িয়ে সোজা গাউন পরে কিচেনে ঢুকে যায়। যেতে যেতে বলে, ‘মাছ না মাংস?’

- ‘তেলাপিয়া ভাজি আর সবজি করো। দুধের বোতলটা বের করে পানিতে ঢুবিয়ে রাখো। আমার বেশি দেরি হবে না। তুমি গুছাতে গুছাতেই আমি এসে যাবো।’

-‘ না, তুমি শাওয়ার নিয়ে রেস্ট নাও। আমি দেখছি।’

সকালে দু’জনে পত্রিকা দেখতে বসে দেখলো, হাওর অঞ্চলের নিউজটা লিড হয়েছে। আর গাইবান্ধার সাঁওতালদের নিয়ে সেমিনারটা ভিতরের পাতায় এসেছে। আজ তাঁরা দু’জন একসঙ্গে এক রিকশাতেই বেরুলো। সুজলাকে প্রেসক্লাবে নামিয়ে দিয়ে সেই রিকশাতেই ফয়সাল চলে গেল পল্টনে। মণি-সিংহ-ফরহাদ ট্রাস্টে একটা ইনডোর মিটিং আছে।

আজ প্রেসক্লাবে ঘুরে-ফিরে গাইবান্ধার সাঁওতালদের জমি থেকে উচ্ছেদ এবং হাওর অঞ্চলের নিঃস্ব মানুষদের আলোচনাই হচ্ছিল। কেউ কেউ গতকালের সেমিনারে ফয়সাল রায়হানের বক্তৃতার প্রশংসা করলো। বললো, সত্যিই তো যাঁরা প্রথম উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন করেছে, মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে সঠিক ভূমিকা রেখেছে তাদের প্রতি এই অবিচার মেনে নেয়া যায় না। এমনকি ক্ষমতাসীনরা তাদের ফসলটা তোলার সময় পর্যন্ত দিলো না। আবার এদিকে তাদের লোকেরা জলমহালের লিজ নিয়ে বসে আছে। আমরা তো জানি, জাল যাঁর জলা তাঁর। ঘটনার এ-ধরনের উত্তাপে সুজলার বেশ ভালো লাগলো। যেন বা, এই প্রথম ফয়সালের প্রতি তাঁর প্রেমবোধ জেগে উঠলো। আগেও বেশ কয়েকবার এমন অনুভূতি হয়েছে। তবে আজকের অনুভূতি অনেক বেশি আস্থার।

মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হলো, এ-ধরনের ইস্যু নিয়ে দেরি করা ঠিক হবে না। তাঁরা প্রেস ব্রিফিং দিয়ে দিলো। বিকাল চারটায় শাহবাগে সমাবেশ হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামকে জানানো হলো। তাঁরাও আসবেন। প্রেসক্লাবে বসেই সুজলাও জেনে নিলো। ফেসবুকে, মেইলে প্রচার চালানো হলো। শুভস্য শীঘ্রম। বিকাল চারটায় বেশ বড় জমায়েত হলো। উপস্থিত নেতৃবৃন্দ এবং শিক্ষকদের তুলনায় ফয়সাল রায়হানই অপেক্ষাকৃত অনুজ। তাই, তাঁকে দিয়েই সভা শুরু করলো ছাত্রনেতা নাঈম। ফয়সাল রায়হান যখন বক্তৃতা জমিয়ে এনেছে এবং উপস্থিত সবাই যখন বেশ মনোযোগ দিয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনছে ঠিক তখনই সুজলা তাঁর ক্যামেরা নিয়ে সমাবেশের মাঝখানে সটান দাঁড়িয়ে পড়লো। সবাই ফয়সাল এবং সুজলার পারস্পরিক পরিচয় জানলেও যেনবা এই কাভারিং ন্যায্যতারও অধিক। যেনবা এ-কোনো আবেগী আদিখ্যেতা নয়। এ-হলো ইতিহাস।ফয়সাল রায়হান বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার ক্লিক করার সময় নিজের প্রোফাইলও শো করলো। সেই সঙ্গে এ-ও ভাবলো, সুজলা শারমীনের মতো এতবড় ফটোগ্রাফার জনসমক্ষে আমার মতো এক উঠতি নেতাকে কাভার করছে, ভাবাই যায় না। এভাবে তাঁকে এতবড় ঘটনার মধ্যমণি করা হচ্ছে, ভাবাই যায় না। আজ সুজলা তাঁর মূল্যায়ন করেছে ইতিহাসের পাটাতনে দাঁড়িয়ে।

আজ তাঁর গভীর প্রেম জেগে উঠলো ফটোগ্রাফার সুজলা শারমীনের প্রতি। যেনবা সুজলা তাঁর স্ত্রী নয়। যেনবা সে পরস্ত্রী। তাঁর মনে তেজীভাব বিরাজ করছিল। সুজলার আরো কয়েকটি ঐতিহাসিক ক্লিকে ফয়সাল রায়হানের মন প্রাসঙ্গিক পরকীয়ায় মেতে উঠলো।

Madolhasan

মাদল হাসান

মওদুদ-উল-হাসান, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সরিষাবাড়ি মাহমুদা সালাম মহিলা অনার্স কলেজ, জামালপুর। পদ্য ও গদ্য লেখক।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা