হেমন্তের বৃষ্টি

আরফান আহমেদ

 

হেমন্তে কোন একদিন অবিরাম বৃষ্টি ঝরতে থাকে। সারাদিন সারারাইত। বৃষ্টি পরে। কেমন জেনো ভেজা ভেজা লাগে দমকা বাতাস ছাড়ে,  ফ্ল্যাট বাড়িটার উপরের তলার দিকে যেইখানে ব্যালকনিটার ধারে সুপারি গাছটা হেলান দিয়া থাকে সে মাথা দুলাইতে থাকে  শীতের  গন্ধ  লাইগা থাকে বাতাসে। অনেকদিন গরম থাকনের পরে বৃষ্টি আসলে শহরের প্রতি আমাদের প্রেম ভাব একটু বেশি জাগে বিছানাটা  কেমন  জানি নরম নরম লাগতে থাকে। আর ঐ দিকে বৃষ্টি অবিরাম চলে।

নিয়ম মাফিক খিচুড়ি খাইতে ইচ্ছা হইতে পারে। ঘরে চাল নাই। কিন্তু  সাদা ফ্ল্যাট বাড়িটার ভিতরে একটা হাহাকার আছে বাইরে  থাইকা  তেমন বুঝা যায় না। পর্দাগুলাও সাদা বাড়িওয়ালী দরজা জানালা  সাদা  পর্দা  দিয়া ঢাইকা দিছে। তাতে বাড়িটারে আরো বিশাল মনে হয়। একটা  ছাতার  হদিস  পাওয়া  গেলে  নীচে  নাইমা  এক  কেজি  চাল  কিনা আনা যায়।

 ঘুরতে ঘুরতে সিঁড়ি দিয়া নামতেনামতে হাউয়াই চপ্পলে চটাশ চটাশ শব্দ করে , বেয়াদবের মতন । তাই  পাউ  টিপা  টিপা  হাটন লাগে। নীচে নামলে একজন কনফিউযড দারোয়ান দেখা যায়। গায়ের  রং  গাঢ়,  নাকটা  অতিরিক্ত  খাড়া  দেইখাই  হয়তো  একই দিকে বাঁইকা গেছে। এইরকম নাক খাড়া আলাদের অনেকেরই দেখা আছে নিশ্চই, মানুষটা ছোটখাট হয়া দরজা খুইলা দেয়। ছাতাটার  বাট  ধইরা ঠিক বন্দুকের মতন আকাশে তাক কইরা বোটামটাতে টিপ দিলে ব্যাপক আওয়াজ কইরা মেইলা যায় মাঝে মাঝে বন্দুকে গুলি করার ফিলিং আসে এই টিপ ছাতায়। একটু দূরের মুদির দোকানটায় একজন ছোটখাট মহিলারে কাউন্টারের সামনে দাড়ায়া থাকতে দেখা যায়। তার ছাতাটা প্রায় তার সমান। সে পুরা কাউন্টার ঢাইকা রাখায়,দোকানদারের সাথে কথা বার্তা চালানি মুশকিল হয়া যায়। 

একটু আগেই পাশের মসজিদের হর্ণ থাইকা কর্কশ কন্ঠে আযান ভাইসা আসে। মুয়াজ্জিনের বোধয় আযানে মন আছিল না কোনদিন। হয় অভাবে নয় বাপে মায়ের ইচ্ছায় মাদ্রাসায় পড়া লাগছে, হয়ত। জোর কইরা তো আর প্রেম হয় না লোকে কয়। তাই  শহরের  অনেক  মসজিদের মতন এই মসজিদেও হয়ত অনিচ্ছায় মুয়াজ্জিন আযান দিছে।আযান  ভাইসা  আসছে  কিন্তু  প্রেমটা  অইটার  সাথে  ছিল  না  মনে হয়। সামনের ভদ্রমহিলা অনেক দেরি করতেছে, নানান গফসপও করতেছে মনে হয়। ছাতার  আড়ালে  তার  উজ্জ্বল  হলুদ  লাল  সবুজ কামিজ আর সালওয়ার দেখা যায়। খিয়াল কইরা দেখা যায় গার্মেন্টসের মাইয়ারা এইরাম রঙ্গিন জামাকাপড় পিন্দে। উজ্জ্বল,  কেমন  যেন স্বাধীন, ভয়ডরহীন। কারখানাগুলা ছুটি হইলে  রঙ্গিন জামা পিন্দা অগুনতি মাইয়ারা হাঁইটা  যাইতে থাকে। শহরের  বিভিন্ন  যায়গায়  এই রকম দৃশ্য দেখা যায়। 

বেটিটা কথা কয়াই যাইতেছে, তার বাজারের ফর্দ অনেক লম্বা, অনেকগুলা ডিম কিনছে, বুড়া দোকানদার হিসাব করতেছে ধীরে ধীরে , একটু দূরে তার বৌ, ঘরের ভিত্রে বুরকা পিন্দা বুড়ী । তারে বুড়া নানান জিনিশ দিতে বলতেছে তা  একটু  দূর  থাইকাই  বলা  যায়  চাইল  আছে?  আছে। কী? মিনিকেট আর নাজিরশাইল। নাজিরশাইল কত কইরা? আশি টেকা। শি টেকা, আশি টেকা। শিয়া কাটে । আশি কাটে। ফেরত আসবো বিশ পনেরশ  টাকা থাকলে  আর  ঘরে  খাউনের  চাইল  না  থাকলে, আশি  টেকা  চাউলের  দাম  হইলে,  মাসের  বাকি  দশটা দিন কেমনে কাটানো যায় সেইটা  নিয়া, মাইক্রোসফট এক্সেলে একটা  ফাইল খুইলা হিসাব করা যায় । নানান দুশ্চিন্তা করা যায়। এই মাসে যা যা কেনার কথা আছিল সেইটারে আগামী মাসে ট্রানসফার করা যায়। আরো কয়েকটা টেকা পাইলে কারো চিকিৎসা করা যায়। বৌরে ভাল যায়গায় খাউয়ানির প্ল্যানটা পিছানো যায় অবলীলায়। সামনের  ভদ্রমহিলা  নিজেই  সইরা  যান,  আমার  দিকে  তাকায়  ইশারা  দেন যান কাউন্টারের সামনে যান। কিন্তু উনার ছাতা এত বড়, আর উনি সাইযে এত  ছোট  যে  কাউন্টারের  ছোট  যায়গায়  এই  সবই  একসাথে হওয়াটা মুশকিল। এক  কেজি  চাউল  একটা  পলিথিনে  দিলে,  অই  বেটিরে  জিগান  যায়,  আপা, চাউলের  ব্যাগটা  একটু  কষ্ট কইরা এইদিকে দিয়া দেন। তার পরের ঘটনা দ্রুত ঘটতে থাকে, দেখা গেলো আরো কয়েকদিন খাউনের মতন ডাইল বাসায় আছে। মশলাপাতি সব সাজানো গোছানো। অনেকদিন আগে আইনা রাখা ঘিয়ের একটা ডিব্বাও খুঁইজা পায়া যায়। রান্তে  রান্তে  মশ্লা  বেশি  হয়া  যায়। ঠান্ডা ঠান্ডা থাকায়, অতি মশলায় শইল খারাপের চান্স নাও পাইতে পারে।গতরাইতের তরকারিটি, গরম কইরা খিছুড়ির সাথে খাওন যায়, ফিরিজে অপমানে লাঞ্ছনায় পইড়া থাকা একটা লেবুও দেখা যায়। এই  শহরে  অনেকদিন  পরে,  খাবারের  পেলেট  থাইকা  ধুঁয়া উঠতে দেখা যায়, ঘি, ধইনা মিলা কেমন যেন একটা ঘ্রাণ হইছে। 

সামনের বিল্ডিংটা ভাঙা হয়া গেছে প্রায়। অতি বৃষ্টি আর শুক্রবার দেইখা হয়ত, লোকের হাতুড়ির বাড়ি এখন আর পাওয়া যাইতেছে না। দূরে আরেকটা লাল ইট কংকৃটের  বাড়ি। খাউনের জিনিশপাতি পাকঘরে রাইখা না আসতে ইচ্ছা করলে, বিছানায় এলায়া যাওয়া যায়। একটা সিগেটও ধরানি যায়। কিন্তু সেই সময়টাতেই ঐ হলুদ মতন দেখতে ম্যাচটা দূরে থাকা রান্না ঘরটার কাউন্টারে বইসা থাকে। একবার ভাবতে হয় উঠুম, নাকি না খায়াই একটা ঘুম দিমু। কিন্তু নেশা জয় যুক্ত হয়া যায় বারে বার।

ঘুম ঘুম লাগলে মোবাইলে এলার্ম দিতে গিয়া দেখা গেল ভাতঘুমের আর সময় নাই, অলরেডি সাড়ে পাচটা বাইজা গেছে। এক আড্ডায় যাউনের কথা আছিল। অইখানে ফ্রি মদ আছে। 

এই বৃষ্টিতে একটু মদ খায়াও আসা যায়, এমন সময় ধাড়াম কইরা ব্যালকনির দরজাটা বন্ধ হয়া যায়। ভুলে ছিটকিনিটা না লাগানো হয় নাই , তাই বাতাস আইসা দরজা খুইলা আবার বন্ধ কইরা দিছে। 

জামা প্যান্ট পিন্দা, আবার পাউ ঠিপা টিপা সিঁড়ি দিয়া নাইমা আসতে হয়। এই এলাকার ভিত্রে রিশকা গাড়ী কিচ্ছু পাওয়া যায় না। বড়লোকের এলাকা হউনে, এইখানে সকলেই গাড়ি চইড়া বেড়ায়। বিদেশি খাউনের দোকানগুলার ওয়েটাররা মাছি তাড়াইতেছে। দুই তরুণী সামনে সামনে আগাইতেছে দেইখা স্পঞ্জের স্যান্ডেলের আওয়াজটা কমাইতে হয়।

 তাদের চুল ছাতা, সুন্দর পাছা দেখতে দেখতে, বিদেশি আতরের সুবাস নিতে নিতে, বড় রাস্তার মোড়ে আইসা খুব প্রেম করতে ইচ্ছা হয়।কৈশোরের মাইয়াগো চামড়ার ঘ্রাণ মনে আসতে থাকে। বাতাস পাতলা থাকার কারণে নাকের ভিত্রে আসা যাওয়া টের পাওয়া যাইতেছে। রিশকা ডাইকা দরদাম করতে ইচ্ছা করে না এই বাদলায়। চল্লিশ টেকার রিশকা ভাড়া সত্তুর টেকায় চায় । মামা ষাইট টেকা দেন। ডানে বামে ভাবতে ভাবতে রিশকায় উইঠা পড়তে হয়। একটা নীল মসলিনের মতন পাতলা সন্ধ্যা নামে। স্ট্রিটলাইটগুলা  আগে  যেইখানে  হলুদ ছিল সেইখানে এখন প্রায় সাদা, একটু ইয়োলো কাস্ট। গাড়ীর পিছনের লালহলুদ লাইট। আজকে জ্যাম নাই একদমই। বড়  ডাকাইতা  হাসপাতালটার সামনের রোড ডিভাইডারেরগাছগুলা কেমন জানি মইরা আছে। শইল্লে  কোন  পাতা  নাই,  কালচে বাদামি  রুগ্ন শইল  নিয়া দাঁড়ায়া আছে বেয়াব্রু। 

রিশকার উপরে বইসা নিজের পাও দেখলে দেখা যায়, ঠেস দিয়া রাখা পাউয়ের পাতার নীচ দিয়া পিচে আটকায়া যাওয়া পাথরগুলা দ্রুত  সইরা  যাইতেছে। হাতের দিকে তাকাইলে দেখা যায় স্ট্রিট লাইটের আলোটা কেমন। আর দূরে ছাইরঙা ঘন আকাশ নিশ্চুপ। মনে হইতে থাকে এই শহরে বোধয় আর থাকা যাইবো না। এমন  পাপী  নাগরিক  জানে না  পূর্বপুরুষের  পাপের কথা, কিন্তু  শাস্তি  পাইতেই হইতেছে জন্মের পর জন্মে, তার পরের জন্মে তারো পরে জন্মে। রিশকা আগাইতে থাকলে দেখা যায় দুই পাশের গল্লিগুলাতে রিশকাগুলা হাবুডুবু খাইতেছে, কেউ হয়ত গাড়ার ভিত্রে পইড়া গেছে। ফুটপাথে যারা বইত তাগো হদিশ নাই । এই বৃষ্টিতে ব্যবসা হয় না তেমন হয়ত। গন্ত্যব্যের গল্লিটায় আইসা পড়লে টেকা মিটায়া দিয়া, আরেকটা ফ্ল্যাটবাড়িতে উইঠা যাই। চাইনিজ লিফট, তাই ফুল লতা-পাতা আকাঁ চকচক করতেছে। উঠার সময়ে একটু লড়েচড়েও, মনে হইতে থাকে এই লিফটটা বোধয় প্লাস্টিকের;  হাল্কা, যেকোন সময়ে মেঝে ভেদ কইরা ভিতরের মানুষগুলারে ফেলায়া দিবে। গেইট খুলার আগে আরো একবার কাঁপে। 

ভিতরে গিয়া এমন একজনের দেখা পাওয়া যায়, যিনি সচরাচর এই আড্ডাতে আসেন না। ক্লাসমেইট হইলেও এখন সে বিখ্যাত। নানান সময়েই দেশ বিদেশ ঘুইরা বেড়ায়। তারে দেইখাই বলা যায় অহ নৌ খান্ট বিলিভ, ওয়াটেন প্লিযেন্ট সাপ্রাইয! ওয়াসসাপ ! ভাংগা সোফাটায় বসতেই মেজবান মদের বুতল খুইলা দেয়। এই ফ্ল্যাটে প্রায়শই আসা যাওয়া আছে বইলা, নিজেই পাকঘরে গিয়া গেলাশ ধুয়া আনা যায়। গেলাশে গেলাশে মদ দিয়া দেউনের পরে মেজবান যান রানতে,  খাশির মাংশ। একটু পরে জায়ফলের ঘ্রাণ নাকে ব্রেনে সুরসুর কইরা ঢুইকা যাইতে পারে । অনেকদিনই মদ খাউনের পয়সা না থাকায়, এইসব দাওয়াতের অপেক্ষা করতে হয়। লালিগুড় থাইকা বানানি মদ খাইতে খাইতে নানান বিষয়ে কথা বার্তা চলতে থাকে। আগে রাজনীতি নিয়া আলাপ আলোচনাটা অই চায়ের দোকানেই বেশি হইত, গলা বাড়ায়া অনেক কিছু বলাও যাইতো হয়ত। কিন্তু এহনে নানান আলাপ ঘরের মইদ্যেই করতে হয়। সরকার বাহাদুর আসলে লোকজনে যেন বাইরে বাইর হয়া দুইটা সুখ দুঃখের আলাপ না করতে পারে সেই কারণে ধীরে ধীরে সব পাবলিক মিটিং প্লেইস বন্ধই কইরা দিতেছে। স্বৈরাচারের ভয় না দেখায়া রাজ্য টিকানো মুশকিল হয়া যায় হয়ত। গন্ডগোলের সময়কার কথা উঠে। এখন পুরানো সেই গন্ডগোল নিয়া পত্রিকায় টিভিতে, ফেসবুকে নানান হাউকাউ হইতেছে। কেডা জানি কারে কইছে শত্রুপক্ষ। তাই নিয়া লাগছে হাউকাউ। প্রাজ্ঞপ্রবীণের মতন মেজবান বইলা উঠলেন শুন তাইলে কাহিনী বলি, এইটারে কিভাবে বিচার করবা ভাইবা দেখ তাইলে। গন্ডগোলে তার বয়স তিন কি চাইর, নিজের কিছু জিনিশ তার দেখা আছে , আর কিছু জিনিশ বারে বারে শুনতে শুনতে হয়ত , তার নিজের স্মৃতিই হয়া গেছে। একের পর এক তারিখ বলতে বলতে তার মৃত ভাইয়ের কথা আসে। মিলিটারি ছাত্রাবাসে আতংক ছরানো পরে, ভাইটা লোকজন নিয়া নেটওয়ার্ক বানায়া , মফস্বলে আইসা পরে । মায়ে যুদ্ধে যাইতে দেয় না। এই দিকে পৌর কাউন্সিলের মাথা তার বাপ। মুখ ভর্তি দাড়িগোফ। তারে একবার ছবিতে দেখা গেছে , বই পড়তেছেন, সদালাপী বুড়া দেখতে লাগতেছিল তার আলেয়ানটা গায়ে জড়ানির কায়দা দেইখা। মিলিটারি অই বুড়ারে মারে নাই কারণ তাইলে শহরের সব কাজকর্ম করার আর কোন লোক থাকবো না। তারই বাড়িতে থাকতে একটা  হিন্দু ফ্যামিলি, আর উপরের তলায় একটা বিহারি পরিবার। গন্ডগোল শুরু হইলে তারা আতংকিত দিন গুজরান করতে থাকে। দূরে বাশ ঝাড়ে একটা ছোট ঘর যেইটার খবর কেউ জানত না , সেইখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া এক্স ক্যাডেট পুলায়, রেযিস্ট্যান্স বাহিনীর, অস্ত্র ঠিক করার কারখানা বসায় । একজন তরুণ আর্মি অফিসার আসত নাকি নিয়মিত চা খাইতে। আর বুড়ার পীর আছিল পাঞ্জাবি। মিলিটারি দরগায় কোনদিন জুতা পিন্ধা ঢুকে নাই নাকি। ছেলে যুদ্ধে যাইতে চায় , মায়ে দিতে পারে না। বুড়ারে মিলিটারির আদেশ পালন করতে হয়। একবার পুলা বন্ধু বান্ধব মিল্লা টেলিফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ কইরা দেয়। বাড়ির পাশের বাড়িতে কোলাবরেটরের সর্দার থাকেন। এরা সবাই প্রতিবেশিই। শহরে বোমা পড়লে, মিলিটারির কাছ থাইকা কোন মতে ছুটি নিয়া বাচ্চাকাচ্চা নিয়া, নাকি রাইখা আসতে যান গ্রামের বাড়ি, আর হিন্দু পরিবারটারে পীরের দরগায় রাইখা যান। মফস্বলের উকিল মিলিটারির বড় অফিসারের কাছে নালিশ করে , আপনেদের পিয়ারের লোকের পুলায় কিন্তু রেযিস্ট্যান্স বাহিনীর হয়া কাজ করে খবরতো রাখেন না। বাড়ি সামনে কামান বসায় মিলিটারি উড়ায়া দিবে। কোলাবরেটরে প্রধান আইসা বলে কি করতেছেন আপনেরা, বড় অফিসাররে গিয়া বলে এ আমাদের আপনা লোক , আপনে ওগোরে মাইরেন না। বাড়ির কেয়ারটেকার পুলাটারে ট্রেইনে গ্রামে পাঠায়া দেয়া হয় খবর দেয়ার জন্য; বুড়া যেন তারাতারি পরিবার নিয়া আবার মফস্বলে চইলা আসে, বিপদ চারিদিকে। ট্রেইনে সিপাহিরা তাগড়া জোয়াল লোক খুঁজতে থাকে , চলন্ত ট্রেইনের দরজায় দাঁড় করায়া তাদের একের পর এক গুলি করে । দশাসই চেহারার পুত্রসম কেয়ারটেকারেরো ডাক আসে, দরজায় দাড়ায়া আর আগে আরো ৪/৫ জনের মৃত্যুর কথা মনে করে। সিপাহি গুলি করার ঠিক আগ মুহূর্তে ঝাপ দেয় লোকটা। এই যাত্রায় প্রাণে বাঁইচা যায়। ছেলেটারে রাইখাই মফস্বলের বাড়িতে আসতে হয় বুড়ার, কারণ কেউ জানত না পুলায় বাড়ি আসছে। আর ছেলেটা ছোট ছোট টিলার ভিতর দিয়া যুদ্ধ করার সুযোগ পায়া যায়। নস্ট বন্দুক নিয়া যুদ্ধ হারে। তার গুলি খাউনের ঘটনার চাইর রকম ভার্শন জানতে পারা যায় তারো অনেক দিন পরে । 

এই প্রসংগে আরো অনেকেই অনেক কথা বলতে থাকে। গল্প আসতে থাকে যাইতে থাকে, আরেকটা  গল্প এমন হয় গন্ডগোল শেষ হবার সাথে সাথে, যে নানীর বিয়া হইছিল একজন বিহারির লগে, তারে রেইপড হইতে হয় রেযিসট্যান্সের আর্মির ছেলেপিলেদের কাছে। এমন কইরাই গন্ডগোলের গন্ডগোল মার্কা গল্প শোনা যায়। যে গল্প বাজারে বিক্রি হইতেছে তার চেয়ে এই গল্পগুলা কেমন আলাদা তাই নিয়া আলাপ করতে করতে খাবার রান্না হয়া আসে। এ দরজায় কে জানি আসে। হ্যাট পরা বুট পরা আরেক বুড়া আসলে, আরেক সাংবাদিক না কি আসতেছে। কথা পালটায়, মিরিয়াচির সুরে মোহিকান যুবকের দল গান গাইতে থাকে। এর মধ্যে একজন উইঠা গিয়া পাশের ঘরের ইলেকট্রিক পিয়ানোতে বসে। আন্তঃমহাদেশীয় সংগীত চুলায় গরম হইতে থাকে , মদের নেশা আমাদের বাজাইতে থাকে দশ আংগুলে। অনেক কথা হয়া যাউনের পরে এক ধরনের নিস্থব্দতা জাইকা বসে। হ্যাটপরা বুড়া তরুনদের মাঝে একটু অস্বস্তি বোধ করে। নেশায় জিজ্ঞেশ করে, ও আসায় কি সব থাইমা গেছে নাকি। কয়েকজন তারে আস্বস্ত করে এইরকম কোন ব্যাপারই না। মেজবান আমতা আমতা করে, একলা মানুষ, ঠিকমতে কি না কি রানছি, অল্প আছে চাইরটা খায়া যাইতে হবে। পিয়ানোতে দূর শহরের আতঙ্ক বাজে এইবারে। 

বন্ধুরে নিয়া রিশকায় উইঠা সেই সাদা ফ্ল্যাটবাড়ীটায় ফেরত যাইতে হয়। পথে বৃষ্টির ঝাপটা, আর রস্তায় স্ট্রিটলাইটগুলা কেমন দুলতেছে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে । ঠান্ডা বাতাস পুরা শরীরে লাগাইতে ইচ্ছা হইতে পারে। এগলি ওগলি ঘুইরা রিক্সা দালানটার সামনে আসতেই ভাড়া মিটায়া দিয়া উপরে উইঠা যাইতে হয়। অল্প গাঞ্জা আছে, অইটা  দিয়া একটা জয়েন্ট ধরায়া একটা গান ছাইড়া দিতে হয়। তারুন্যের সংগীত, মোমের আলোয় কাইপা কাইপা উঠতেছে, দেয়ালে নিজের আর দোস্তের ছায়া। মোমের আবছা আলোয় কি বিষন্বই না হয়া যায় ঘড়টা।  প্রেম বৌ ভালবাসা এই নিয়া আলাপ করতে করতে, গাঞ্জার ধোয়া ঘরময় ঘুইড়া বেড়ায় উচা পাহাড়ের মেঘের মতন। আর একটা মাইয়ারে নিয়া কথা হয়। দুইজনেই একমত হওয়া যায় যে মাইয়াটা আসলেই একটা সুইটহার্ট। কিন্তু একটা বেনামী অবসাদে গলা বইসা আসে। বৃষ্টির শব্দ বাড়লে বিছানার পাশের জানালাটা খুইলা দিলেই পুরা শহরের একটা টুকরা ঘরে চইলা আসে। বিজলি চমকায়, দালানগুলারে কেমন যেন হাড়জিরজিরা হয়া চমকায়া চোখে আটকায়া যায়। চোখের পাতা ভারি হয়া আসলে চোখ বন্ধ কইরাও সেই হাড় জিরজিরা দালানকোঠা চোখের মণিতে লাইগা থাকে। রাত আরো বাড়লে বন্ধু চইলা যাইতে চায়। একটা ছাতাও, চায়। আমতা আমতা কইরা তারে ছাতাটা ধরায়া দিতে হয়। বারে বারে মনে করায়া দিতে হয় দোস্ত ছাতাটা হারাইছ না। ছাতাটা আমার না। আর মনে মনে দোয়া করতে হয় দারোয়ান যেন ঘুমায়া না যায়। ঘুমায়া গেলে ৫তলা নিচে নামা লাগবো, ওরে উঠাইতে হবে বহুত প্যারা। এই ভাইবা দরজার সামনে কিছুক্ষণ খাড়াইতে হয় । আকাশে আবার বিজলি চমকায়। পেছনের জানলা ভেদ কইরা সাদা আলো দেয়ালে পড়লে নিজের অবয়ব দেখতে হয় এক ঝলক। শরীর অবশ হয়া আসতেছে, বিছানায় যাইতে হবে, এক গ্লাস পানি খাইতে হবে। শুয়া শুয়া আকাশ পাতাল ভাবতে হবে। চোখ থাইকা নিজের অবয়বটা দূর হইতে আরো সময় লাগবে। ছাতাটা আমার না, ছাতাটা নিজের কাছে নিয়া রাখতে হবে।

Arfun Ahmed

আরফান আহমেদ

জন্ম: নবগ্রাম, ঢাকা। শিক্ষক (ফটোগ্রাফি), লেখালেখি

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা