নামনিগ্রহ

মাদল হাসান

তাওহিদেরই মুর্শিদ আমার মুহম্মদের নাম

ওই নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ি কালাম

মুর্শিদ মুহম্মদের নাম।

 

জিয়াউদ্দিনের মনোহারী দোকানে আজ রেডিও-তে যখন এই গানটা বাজছিল তখন আইয়ুব আলী এসে বললো,‘ রতন জর্দা দিয়ে একটা পান দে, একটা নেভিও দিস’। তখন জিয়াউদ্দিন পান বানাতে বানাতে জানতে চাইলো,‘ ঝালুপাড়া ঘাটের ব্রিজের কাজটার খবর কী ?’ আইয়ুব আলী পানটা মুখে পুরতে পুরতে এবং পানের বোঁটায় চুন লাগাতে লাগাতে বেজার কণ্ঠে বললো, ‘নারে, নামের জন্যেই কামডা হইলো না। শালার বাপে যে কোন দুঃখে এই নামডা রাখছিল ক্যারা জানে?’ কন্ট্রাকটারির লাইসেন্স করার সময় প্রথম এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছিল আইয়ুব আলী।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারলো না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করলেন। সে বছরই আইয়ুব আলীর জন্ম। আইয়ুব আলীর বাবা ইব্রাহিম আলী আইয়ুব খানকেই বাপের বেটা সাদ্দাম ভেবেছিলেন, নাকি আইয়ুব নবিকেই বড় ভেবেছিলেন, তা কোনোদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি আইয়ুব আলীর। বাপ তাঁর মুসলিম লিগ করতো, তা কে-না জানে? কিন্তু ঐ সময় তো প্রায় সবাই মুসলিম লিগই করতো। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকার নির্বাচনে জিতেও গদিতে বসতে না-পারলে তখনও মুসলিম লিগ করা-নিয়েই-না যত প্রশ্ন। গ্রামের কৃষক মানুষ কি আর অত কিছু বুঝে। গ্রামের মণ্ডল হিসেবে ছোটো মাথায় যা খেলেছে, তাই করেছে। আর ছেলের নাম একবার রেখে ফেলায় এবং সবাই ডাকাডাকি শুরু ক’রে দেয়ায় জোড়াখাসি কুরবানি দিয়ে রাখা নামই-বা পাল্টায় কীভাবে? ১৯৬৬-র পর রাজনীতির  গতি-প্রকৃতি কিছুই বুঝতে না-পেরে একরকম নিশ্চুপই হয়ে যান ইব্রাহিম আলী। তাঁর অনেক বন্ধুই তখন আওয়ামী লীগ করে। তারপর গেল ১৯৬৯ গেল, সত্তরের নির্বাচন গেল, দেশ স্বাধীন হ’লো কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাঁর রাজনৈতিক বন্ধুরা তাঁকে আর ডাকলো না। কারণ, সে উপস্থিত হ’লে তাদের আর নেতা সাজা হয় না।তাই, যাঁরা তাঁর হাত-ধ’রে রাজনীতিতে এসেছিল তাঁরা স্পষ্ট একটি দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তাই সাইলেন্ট হ’তে হ’তে অবশেষে স্থবির হয়ে শেষমেশ ঘরেই পড়ে গেলেন ইব্রাহিম আলী। ১৯৭৫-এর ১৫-ই আগস্টেও ক্র্যাকডাউনের পর অন্যান্য বয়স্যদের মতো তিনিও এই জাতীয় বড় অঘটনে অগ্যস্ত যাত্রা করলেন। কিন্তু কিছুতেই আইয়ুব আলীর জানা হ’লো না, কেন তাঁর বাবা তাঁর এই নাম রেখেছিলেন। ১৯৭৫-এর পর যাঁরা যাঁরা ক্ষমতায় এলো, বিশেষত মফস্বল লেভেলে তাঁরা বেশ খাতির করেছিল আইয়ুব আলীকে। তাঁর তখন টিন-এইজ তারুণ্য। উঠতি নেতাদের কারো সঙ্গে ঘুরতে গেলেই নগদ টাকা পাওয়া যায়। পাগলা-পানিও খাওয়ায়। বলে, ‘তোর কিছু করা লাগবে না, খালি আমগর সঙ্গে ঘুরবি-চলবি’। এভাবেই কখন, কীভাবে তাঁর নাম-ভাঙানো হয়েছে, তা সে নিজেই বলতে পারবে না। এরপর আবার পালা বদল। আবার সামরিক শাসন। ১৯৮৬-তে আরেকটু হ’লেই তাঁকে ডিটেনশন খাটতে হয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক উমেজের কারণে এবং কোনো কিছুর আগে-পিছে-নাই-ধরনের হবার কারণে  পরিচিত এক পুলিশ অফিসার তাঁকে ছেড়ে দেয় এবং চলে যেতে সাহায্য করে। আইয়ুব আলীকে তাঁর বাবা মৃত্যুশয্যায় শুধু এটুকুই বলেছিল, বাবা আইয়ুব, না-বুঝে কোনো দলে যোগ দিবানা। আমগর যা সহায়-সম্পদ আছে, তা দিয়া সংসার কইরা খাবা। আর যদি সম্ভব হয়, ব্যবসা কইরো। এছাড়া তিনি এলাকার আলিয়া মাদ্রাসার জন্য কিছু পরিমাণ জমি ওছিয়ত ক’রে গিয়েছিলেন। সেই সুবাদে আইয়ুব আলী আজও আলিয়া মাদ্রাসার দাতা-সদস্য। বাংলাদেশে যখন জঙ্গি উত্থান হ’লো তখন তাঁর দিকে সবাই বাঁকা-চোখে তাকাতে লাগলো। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর কীভাবে-কীভাবে যেন টিনএইজ বয়সের বন্ধুরা আবার কাছে চলে এসেছিল। মাঠে ফুটবল খেলা হ’লে ডাকে, ওয়াজ মাহফিলে ডাকে এবং বিয়ের অনুষ্ঠানেও যথারীতি দাওয়াত করে। অর্থনৈতিক সাহায্য চাইলে সামাজিকতার খাতিওে সাহায্যও করে। কিন্তু পৃথিবীতে একই কাজের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়, তাফসির হয়। পছন্দের কেউ বেশি বললে বলে, বাগ্মী। আর অপছন্দের কেউ বেশি বললে বলে, বাচাল। পছন্দের কেউ সহজে সাড়া দিলে বলে, সংবেদনশীল। আর অপছন্দের কেউ সহজে সাড়া দিলে বলে, প্রতিক্রিয়াশীল। কখনো এসব ব্যাখ্যা পক্ষে যায়, কখনো যায় বিপক্ষে। ১৯৯৬-এর নির্বাচনের পর প্রথম কন্ট্রাটারি লাইসেন্স বের করতে গিয়ে সে দেখলো, তাঁর নাম দেখেই কেউ কেউ যেন কেমনভাবে তাকাচ্ছে। নামে কী-বা আসে যায়? কিন্তু এই নামই যেন আজ একমাত্রিক ইতিহাস। অথচ আইয়ুব আলী আগে-থেকেই সবার সঙ্গে চলে। তাঁর কাছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ব’লে কিছু নেই।কিন্তু তাঁর কাছে না-থাকলে কী হবে? অন্যদের কাছে তো পক্ষ-বিপক্ষের মূল্য আছে। কেননা, এসবের সঙ্গে বস্তুগত লাভালাভের সম্পর্ক আছে। লাইসেন্সটা সে জোগার করেছিল এক কাছের আত্মীয়ের মাধ্যমে। কিন্তু আজ সেই লাইসেন্স তাঁকে কাজ দিতে পারলো না। যেনবা অন্য কিছু নয়, শুধু নামটাই তাঁর প্রধান শত্রু হয়ে উঠলো। আজ প্রথম আরো স্পষ্টভাবে বিষয়টা নজর কাড়লো তাঁর। তাই, কথাটা জিয়াউদ্দিনকে না-ব’লে পারলো না। তখন জিয়াউদ্দিনও কিছু বলি বলি করছিল। তাই, আইয়ুব আলীকে বললো, ‘আইয়ুব ভাই, ভিতরে আয়া বও, তোমারে আমার একটা হিস্ট্রি কই। তুমি তো জানোই আমার এই মুদি দোকানডা ছাড়া বলতে গেলে কিছুই নাই। পর পর তিন মেয়ে। তিনজনই গার্লস স্কুলে পড়ে। বুঝোই তো, এই যুগে সংসার চালানো কত কঠিন। তাই ইস্কুলে গেছিলাম উপবৃত্তির আশায়। এখন তো সরকারি দলের লোকেরাই ম্যানেজিং কমিটির সদস্য। সভাপতিও তাই। হেডমাস্টারও তাই। আমি কুনোমতে একজন দোকানদার। আমিতো অতো তত্ত্ব-ফত্ত্ব বুঝিনা। তাঁরা আমারে কইলো, আপনি অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে যান, পরে ম্যানেজিং কমিটির মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হবে। আমি আর কিছু না-বলিা আইসা পড়লাম। আসার পথে ইয়াহিয়া ভাই, জিন্নাহ ভাই, ভুট্টো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হইল। অরা কী-জানি একটা বিষয় নিয়া অনেকক্ষণ গুজুর-গুজুর করল। আমারে ভাইঙ্গা কইলো না। পরে শুনলাম, পরের রবিবার সিদ্ধান্ত জানানো হবে। পরের শনিবার আমার মেয়ে পারুল ইস্কুল থেইকা মন-খারাপ কইরা ফিরলো। কান-কথায় জানাজানি হইছিল, অর উপবৃত্তি হয় নাই। পরের দিন রবিবার আমার মতো আরো অনেকেই ইস্কুলে গেছে উপবৃত্তির খোঁজ নিতে। কিন্তু দেখা গেল, বাইছা-বাইছা আমার, জিন্নাহ ভাই, ইয়াহিয়া ভাই আর ভুট্টো ভাইয়ের মেয়েই উপবৃত্তির তালিকায় নাই। পরে অনেক কষ্টে বুঝলাম, আমগর নামের সঙ্গে ঐ ঐ লোকের নামের মিল আছে। তাঁরা মনে করে, আমগর বাপেরা ঐ ঐ লোকের পক্ষের লোক ছিল। তাই, আমরা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। আমরা রাজাকারের বংশ। অথচ আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭৬-এ। যদি তাও হয়, আমি যে দুইবার আওয়ামী লীগে ভোট দিলাম তার কী হ’বো? স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়া আমি কি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে? আমার বাপ তো ৭৫ এর পরে পুলার নাম জিয়াউদ্দিন রাইখা পিঠ বাঁচাইছে। আমার বাপও আওয়ামী লীগ অর বাপও আওয়ামী লীগ। ক্যারা আসল আওয়ামী লীগ? এখন তো আওয়ামী লীগের ওয়ারিশনামা বণ্টননামা বাইর করন দরকার, নাকি কও?’ আইয়ুব আলী কিছু বলতে পারেনা। শুধু নেভিতে কষে একটা টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে সিগারেটের মোথাটা ঠেসে ধরে। তারপর ভাঙাকণ্ঠে বলে,‘ আইজ উঠি, আসলে ইতিহাস না-জাইনা আমরা অনেকেই অনেক ভুলের মধ্যে আছি। আন্দাজি ব্যাখ্যায় কার দুষ যে কার ঘাঁড়ে চাপে তা ক্যারা জানে?’

তখন মাগরেবের আজান ধ্বনিত হ’লো আশপাশের সবকটা মসজিদে। মন্দিরের কাছের বাড়ির বাসিন্দারা উলুধ্বনিও স্পষ্ট শুনতে পেল। সকল পর্যালোচনার পূর্বে ধর্মেও প্রসঙ্গটি সেরে নিতে হ’লে বলতে হয়, ‘দেনা-পাওয়া’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কাব্যোত্তীর্ণ নাম রাখে, যেমন যৌতুক তাড়িত নিরুপমা। কিন্তু তার আগে কার্তিক-গণেশ-পার্বতী নামই চালু ছিল। তেমনি, মুসলমানরাও শিক্ষিত হার পর নানা রকম কাব্যিক নাম রাখেন। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলে এখনও অধিকাংশ নাম রাখা হয় আল্লাহর নামের সিফতে। যেমন, করিম-রহিম-জব্বার-সালাম-বরকতইত্যাদি। কিন্তু তাতে প্রগতির পথে কি কোনো বাধা সৃষ্টি হয়? কাব্যিক নামেই বা কী ক্ষতি? কিন্তু সর্বমঙ্গলার্থেই কি ধর্মেও কল বাতাসে নড়েনা? অথচ অধর্মবাতাসও বয়ে চলে সমান তড়াসে। ধর্মবনানী তাতে থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে ওঠে।

Madolhasan

মাদল হাসান

মওদুদ-উল-হাসান, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সরিষাবাড়ি মাহমুদা সালাম মহিলা অনার্স কলেজ, জামালপুর। পদ্য ও গদ্য লেখক।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা