এ লিফ অন দ্য উইন্ড

অাশানুর রহমান খোকন
আমার কলিগ জনি সম্প্রতি প্রমোশন পেয়ে অন্য শাখায় বদলি হয়েছে। আজ সকালে তারই খোঁজে এক ভদ্রলোক ব্যাংকে এলেন। আমার অন্য কলিগ এ্যালেক্স বললো, ' জনি তো নেই, তুমি কি আশানুরের সাথে কথা বলবে'। ভদ্রলোক আমার অফিসে এসে পরিচয় দিলেন,  ' আমার নাম মোহাম্মদ জিয়া উদ্দীন'। আমি নিজের পরিচয় দিলাম। দু/এক কথায় জানতে চাইলেন আমি কোন দেশী। বাংলাদেশ বলতেই তিনি বাংলায় জানতে চাইলেন, 'আপনি কি ঢাকায় থাকতেন?' আমি হ্যাঁ বলতেই বললেন, 'আমরা এক সময় ঢাকায় থাকতাম'। 

-আপনি বাংলাদেশী?

-না, আমরা ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ছাড়ি।

-আপনি পাকিস্তানি?

ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন,  সে অনেক কথা। আসছি ব্যাংকের কাজে, তাছাড়া আপনারও সময় নষ্ট হবে। থাক,  সে সব কথা। আমি ভদ্রলোকের কথায় একটু বেশীই আগ্রহী হয়ে উঠি। বললাম,

-আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা কিছুটা সময় কথা বলতে পারি। আপনারা ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ছাড়লেন কেন?

-১৯৭২ সালে আপনার বয়স কত?

-সে বছরই আমার জন্ম।

-আপনি তাহলে অনেক কিছুই জানেন না। শোনেন তাহলে। আপনি এ্যাড. জহির উদ্দীনের নাম শুনেছেন? শোনেন নি তো? তিনি এম এন এ ছিলেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের থেকে ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকার এমএনএ পাশ করেছিলেন। তাঁর অফিস ছিল আসাদ এ্যাভিনিউয়ের পার্ক ভিউ বিল্ডিংয়ের ৪ তলা ভবনের নীচতলায়, যার পূর্ব নাম ছিল আইয়ুব এ্যাভিনিউ । ঐ পার্কভিউ বিল্ডিংটি ছিল আমার বাবার। আমার বাবা আওয়ামী লীগ করতেন। শেখ মুজিব, বাবার বন্ধু ছিলেন সেই ১৯৪২ সাল থেকে। আমার বাপ-দাদাদের বাড়ী ছিল বিহারে। বাবা কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র হিসাবে 'বেকার' হোস্টলে থাকতেন। সেই থেকেই শেখ মুজিবের সাথে বন্ধুত্ব। বয়সে শেখ মুজিব বাবার থেকে একটু বড় ছিলেন বলে এক সাথে পড়লেও বাবা শেখ মুজিবকে 'মুজিব ভাই' বলতেন। তাছাড়া তখন দু'জনেই মুসলিম লীগ করতেন এবং সোহরাওয়ার্দী সাহেবের খুব ঘনিষ্ট ছিলেন। ৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে যখন অপশন দেয়া হলো, বাবারা ঠিক করলেন পশ্চিম পাকিস্তানে নয়, পূর্ব পাকিস্তানে যাবেন। আমার বাবা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও তাঁর পরিবার বিহার থেকে ঢাকা চলে আসেন। আমরা তিন ভাই, দুই বোন। সবারই  কিন্তু জন্ম ঢাকায়। ঠাঁটারি বাজারে বাবার ফ্লাওয়ার মিল ছিল, সেমাইয়ের কারখানা ছিল মিরপুরে। বাবা সব সময় শেখ মুজিবের অনুগামী ছিলেন। আওয়ামী লীগ করার কারণে এবং আমাদের বাড়ীতে এমএনএ সাহেবের অফিস হওয়ায়, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে কিছু বিহারী এসে আমাদের বাড়ীতে আগুন দেয়। বাবা নিজেও অবাঙালী এবং বিহারী হওয়ায় আমরা অবশ্য জানে বেঁচে যাই। আমরা পুরো ৭১ সালটা ভয়ে ভয়ে থাকতাম। আমাদের ভয় ছিল দু'দিক থেকেই। এভাবেই নয়টা মাস কেটে গেলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ১৬ ই ডিসেম্বর আমার মনে আছে, আমরা দুই ভাই 'জয় বাংলা' বলে অন্যদের সাথে মিছিলে শরীক হয়েছিলাম। একজন আমার বড় ভাইকে বললেন, 'এই, তোরা এই মিছিলে কেন?' আমি অবাক হয়ে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ১৩, বড় ভাইয়ের ১৫। আমার বড় ভাই মুখ কালো করে ফেললো। আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম। মিছিল এগিয়ে চললো, সেই মিছিলে আমরা হাঁটতে পারলাম না। স্বাধীনতার আনন্দে আমরা শরীক হতে পারলাম না। দুই ভাই মুখ কালো করে বাড়ী ফিরে বাবাকে সব খুলে বললাম। বাবা বললেন, 'গত নয় মাসে আমরা অবাঙালীরা যা করেছি, তাতে আমাদের বিশ্বাস করতে মানুষের সময় লাগবে। কিছুদিন যাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।' আমরাও বাবার কথা বিশ্বাস করেছিলাম।

এক সময় মুজিব চাচা ফিরে এলেন। আমার মনে আছে, বাবার সাথে সেদিন আমরাও গেলাম এয়ারপোর্ট রোডে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। অত মানুষের ভিড়ে মুজিব চাচা আমাদের হয়তো খেয়াল করেননি, করার কথাও নয়। কিন্তু বাবা, মুজিব  চাচাকে দেখে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললেন। এরপর বাবার সাথে মুজিব  চাচার কবে দেখা হয়েছিল জানিনা। তবে আমাদের সাথে মুজিব  চাচাদের পারিবারিক পর্যায়ে যোগাযোগ ছিল। আমরা যে স্কুলে পড়তাম সেই স্কুলেই শেখ কামাল ভাই পড়েছিলেন। আমাদের উপরে ক্লাসে পড়তেন শেখ জামাল ভাই। ছোট বেলায় শেখ কামালকে দেখলে নায়ক নায়ক লাগতো। আমরা অনেকদিন বাবার সাথে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ীতে গেছি। ঐ বাড়ীর ড্রয়িং রুম, চাচার স্ট্যাডি রুমেও আমাদের যাতায়াত ছিল। চাচী আমাদের খুব আদর করতেন। যতবারই গেছি একটা না একটা কিছু আমাদের খাওয়াতেনই। তবে মুজিব চাচাকে আমরা ভয় পেতাম। এত মানুষজন সব সময় ওনার আশে পাশে থাকতেন যে ওনার কাছে যাবার সাহস হতো না। একবার তো একটি ঘটনায় আমরা এমন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম! আমার বড় ভাইয়ের সম্ভবত: সেটা ১৪ তম জন্মদিন। সে জেদ ধরলো একটি হোন্ডা মোটর সাইকেলের। বাবা প্রথমে রাজী হননি। কিন্তু ভাইয়ের আবদার ও মায়ের সুপারিশে তিনি রাজী হলেন কিন্তু কতকগুলো শর্ত দিলেন। কবে কবে চালাতে পারবে, কতদূর যেতে পারবে এই সব। একদিন ভাইয়া আমাকে পিছনে বসিয়ে এয়ারপোর্ট রোড ধরে বেশ কিছুটা চালিয়ে ফার্মগেট দিয়ে ফিরছে। আমরা তখন সিগন্যালে দাঁড়িয়ে আছি। পাশেই একটি প্রাইভেট কার এসে থামলো। ভাইয়া খেয়াল করেনি। আমি তাকাতেই দেখি মুজিব  চাচা  গাড়ীতে বসে আছেন। আমি তো ভয়ে অস্থির। যেন দেখিনি এমনভাবে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। কিন্তু মুজিব চাচার চোখ ফাঁকি দেয়া কী এত সোজা! গাড়ীর জানালা দিয়ে মুজিব চাচা বললেন, ' এই তুই জিয়া না? আলাউদ্দিনের বেটা না তুই? মোটর সাইকেল কি তোর বাবা কিনে দিয়েছে?'

মুজিব চাচার গলা শুনে আমার বড় ভাই ততক্ষণে বোবা-কালা সেজে, চুপ করে বসে আছে। ভাগ্যিস তখনি সিগন্যাল ছেড়ে দিল। ভাইয়া তো পড়ি মরি করে টান দিল। আমরা বাড়ী ফিরলাম ভয়ে ভয়ে। সেদিন রাত ৯টার দিকে বাসার ফোনটি বেজে উঠলো। বাবা ফোন ধরলে ওপাশ থেকে মুজিব চাচা বললেন, 'আলাউদ্দীন, তুমি এত ছোট একটি ছেলেকে মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছো? যদি দরকার হয়, গাড়ী কিনে ড্রাইভারকে সাথে দাও'। বলেই চাচা ফোন রেখে দিলেন। সেদিনই বাবা ভাইয়ার মোটর সাইকেল চালানো নিষেধ করে দিলেন। এটা সেই ১৯৭০ সালের কথা। 

যাইহোক, সময় কম। সংক্ষেপে বলি। মুজিব চাচা ফিরলেন বটে, কিন্তু মানুষের মধ্যে একটা ভয়, আতংক, অবিশ্বাস কাজ করছিল। কেউ কাউকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। আমার ঠিক মনে নেই কত তারিখ। বাবা একদিন ফ্যাক্টরী থেকে রাত করে ফিরলেন। খেতে খেতে মা'কে বললেন, 'একদল লোক মিরপুরের সেমাই ফ্যাক্টরীটা দখল করতে চাচ্ছে। ঠাঁটারি বাজারের ফ্যাক্টরীতেও গন্ডগোল শুরু হয়েছে। মুজিব ভাই যদিও খুব ব্যস্ত, তবু কাল সকাল সকাল তাঁর বাসায় গিয়ে একটু দেখা করে কথা বলতে হবে।' আমার মনে আছে সেদিন বৃহস্পতিবার। বাবা ফজরের নামাজ পড়লেন। আমাদের ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসতে বললেন। আলো ফুটলে তিনি মা'কে বললেন, 'আমি মুজিব ভাইয়ের বাড়ী থেকে ঘুরে আসি'। বাবা সকালের খাবার না খেয়েই সেই সাত সকালে বের হয়ে গেলেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো, বাবার দেখা নেই। সন্ধা গড়িয়ে রাত হলো। দশটা বাজলো তখনও বাবা ফিরলেন না। মা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বড় ভাইকে বললেন, এম এন এ সাহেবকে ফোন দিতে। বড় ভাই ফোনে কাউকে পেলেন না। ছোট ছোট ভাই-বোনদের মা খাওয়া-দাওয়া করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। আমি সেদিন সারা রাত মা ও ভাইয়ার পাশে বসে ছিলাম। অনেকবার ঘুমে ঢলে পড়ে যেতে গিয়েছি, আবার উঠে বসেছি। এভাবে সারারাত আমরা তিনজন মানুষ বাবার অপেক্ষায় বসে থাকলাম। সকালের আলো ফুটলে মা বললেন, 'তোরা দু'ভাই একটু মুজিব ভাইয়ের বাড়ী যাবি? দেখবি কী হলো?'

আমরা দুই ভাই অনেকটা হাঁপাতে হাঁপাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়ীটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গার্ড চাচা আমাদের আগে থেকেই চিনতেন। এত সকাল সকাল এ বাড়ীতে দেখে একটু অবাক হলেও গেট খুলে দিলেন। আমরা অনেকটা দৌঁড়ে বাড়ীর ভিতরে ঢুকে সোজা দোতলায় উঠে গেলাম। মুজিব  চাচা  তখনও নামাজের পাটিতে বসে আছেন, চাচী বিছানা গোছাচ্ছেন। আমি অনেকটা দৌঁড়ে মুজিব চাচার হাঁটুর কাছে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ি। গড় গড় করে বলতে শুরু করলাম। বড় ভাই তখনও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। চাচা বললেন, 'আস্তে আস্তে বল, কী হয়েছে?' আমি একটু দম নিয়ে আবার বললাম যে, গতকাল বাবা আপনার সাথে দেখা করার কথা বলে বের হয়ে সারা দিন, এমনকি রাতেও বাসায় ফেরেননি। চাচা বললেন, ' বলিস কী? তোর বাবা তো গতকাল এখানে আসেনি। দাঁড়া আমি দেখছি!' তিনি তৎক্ষণাৎ কয়েক জায়গায় ফোন করলেন। এ্যাড. জহির চাচাকেও ফোন করে জানালেন। আমাদের বললেন, 'তোরা চিন্তা করিস না। ভাবীকেও চিন্তা করতে না করিস।  আমি জহিরকে বলে দিয়েছি। সেও খোঁজ-খবর নিচ্ছে। খবর পেলে ও' নিজেই তোদের বাড়ী যাবে'। আমরা চলে আসছিলাম। চাচী বললেন, 'তোরা যাসনে। দাঁড়া! এই সকালে খালি মুখে যাবি নাকি?' বড় ভাই বললেন, 'না, চাচীমা। আজ থাক। মা চিন্তা করছেন'। চাচী বললেন, ' দাঁড়া, দেরী হবে না'। তিনি আমাদের হাতে একটি করে সন্দেশ দিলেন আর বললেন, 'আমি জামালকে ওবেলা খবর নিতে পাঠাবো। ভাবীকে চিন্তা করতে না করিস'।

আমরা দু'ভাই কিছুটা নিশ্চিত মনে বাড়ী ফিরে মা'কে সব বললাম। মা তখনই নামাজে বসলেন। সারাটা দিন কেটে গেলো অপেক্ষায়। জহির  চাচা ফোন করে জানালেন, 'সব দিকে লোক লাগানো হয়েছে চিন্তা না করতে। একটা খবর ঠিকই পাওয়া যাবে'। এভাবে দিন গড়াই, সপ্তাহ যেতে থাকে। আমাদের দুশ্চিন্তা ভয়ে রূপ নিতে থাকে। বড় ভাই একদিন মিরপুর গেলো ফ্যাক্টরীতে খোঁজ নিতে। ফিরে এলো কাঁদতে কাঁদতে। আমাদের সেমাই ফ্যাক্টরী কারা যেন দখল করে নিয়েছে। ভাইয়াকে ভিতরেই ঢুকতে দেইনি। কয়েকদিন বাদে ঠাঁটারি বাজার থেকে খবর এলো আমাদের ফ্লাওয়ার মিলও দখল হয়ে গেছে। আমাদের আতংক তখন দুঃস্বপ্নে রূপ নিচ্ছে। প্রায় এক মাস পর জহির চাচা একদিন আমাদের বাড়ী এলেন। আমাদের অন্য ঘরে যেতে বলে মায়ের সাথে বসার ঘরে কিছু কথা বলেই আবার চলে গেলেন। তিনি যাওয়ার সাথে সাথে মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আমরা সব ভাই বোন তখন মায়ের পাশে জড়ো হই। মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'তোদের বাবা আর ফিরে আসবে না'। আমরা সবাই ততক্ষণে কাঁদতে শুরু করেছি। অনেকক্ষণ পরে মা বললেন যে, 'তোদের বাবাকে একদল লোক ঐ দিন সকালে রাস্তা থেকে তুলে নিয়েছিল। তাকে মেরে,  তার মরদেহ তুরাগ নদীতে ফেলে দিয়েছে'। বলেই মা আবার হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকেন। সেই সাথে আমরাও। 

ভদ্রলোকটি এ পর্যন্ত বলে একটু থামলেন। মনে হলো তিনি দম নেবার পাশাপাশি অতীত হাতড়াচ্ছেন। আমি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলাম। বলে উঠলাম, ' আমি সত্যিই দুঃখিত আপনার বাবার এই করুণ মৃত্যুর জন্য'।

তিনি বললেন, ' না, না, আপনার দুঃখিত হবার কিছু নেই। আমরা বাবার মৃত্যু সংবাদে কষ্ট পেয়েছিলাম সেটা ঠিক। তবে তার থেকেও বেশী কষ্ট পেয়েছিলাম অন্য কারণে। আপনি যুদ্ধ বা বিপ্লব দেখেন নি তো? আপনি ঠিক বুঝবেন না। একটা যুদ্ধের মধ্যে, বিপ্লবের সময় এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা আমার বাবাকে হারালেও সেটা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের ব্যপারটা ছিল ভিন্ন।'

-সেটা ঠিক কী ছিল?

-আপনার সময় বেশী নিচ্ছি না তো?

-না, না, আপনি বলুন।

তিনি বলে চললেন---

'দিন সাতেক পর আমরা যখন শোক একটু সামলে উঠেছি তখন আবার একদিন জহির চাচা এলেন। তিনি যেটা বললেন তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, মুজিব চাচা বলেছেন যে আমরা এদেশে এখন নিরাপদ নই। তিনি আমাদের পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে চান। তিনি নাকি ইতোমধ্যে ইউনিসেফের সাথে কথাও বলেছেন। জহির চাচার কথা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার বাবারা ৪৭ সালে এদেশকে বেছে নিয়েছিলেন নিজের বাসভূমি হিসাবে। বাবা, মুজিব চাচার ৬ দফার একজন সৈনিক ছিলেন। ৭১ সালে আমার বাবা-মা কত বাঙালী পরিবারকে বাঁচিয়েছেন। আমার সেই বাবা স্বাধীন দেশে খুন হলেন। আমাদের কোন নিরাপত্তা স্বাধীন দেশটি দিতে পারলো না? স্বয়ং মুজিব চাচা বললেন, পাকিস্তান যেতে? সত্যি কথা বলছি বাবার মৃত্যু সহ্য করেছিলাম, সেটা মেনে নিয়েছিলাম কিন্তু এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। ইন্ডিয়া আমাদের রাখতে চায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের জায়গা হলো না। পাকিস্তানে আমরা হলাম সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। যেদিন আমাদের বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল, অনেক অভিমান হয়েছিল মুজিব চাচার উপর। যে মানুষটির আঙুলি হেলনে গোটা দেশ নাচতো, সেই মানুষটির কথা স্বাধীন দেশের কেউ মানছে না। দেশটা শুরু থেকেই ভুল পথে হাঁটা শুরু করলো। সেই ভুলের খেসারত মুজিব চাচাকেও এক সময় দিতে হলো! 

বলতে বলতে ভদ্রলোক যেন একটু আনমনা হয়ে পড়লেন। আমি অপেক্ষা করছিলাম। তারপর যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, হ্যাঁ, যা বলছিলাম, মুজিব চাচার উপদেশ মেনে নিয়ে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ইউনিসেফের সহায়তায় আমরা পাকিস্তানে চলে যাই। পাকিস্তান আমাদেরকে তো গ্রহণ করতে চাইনি। আমরাও তখন পাকিস্তানে যেতে চাইনি। তাইতো একদিন সুযোগ পেয়ে কানাডা চলে এলাম। 

তারপর হঠাৎ করেই তিনি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, ' আজ দেরী হয়ে গেলো, আপনারও অনেক সময় নষ্ট করলাম। but, do you know what, I am a leaf on the wind'. 

আমি লোকটির চলে যাওয়াটা চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা