রামের দেশে রাবণ

আফসানা বেগম


ঝিরঝিরি বৃষ্টির রাতে তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। টিনের চালে রাতভর বৃষ্টি হতে থাকবে। একটানা বৃষ্টির ছন্দে নেশার ঘোরের মতো ঘুম চেপে বসবে তোমার চোখে। সামান্য খোলা জানালায় রাতভরথেমে থেমে বৃষ্টির ছাঁট ভিজিয়ে দিয়ে যাবে তোমার বিছানার পায়ের দিকের খানিকটা। ভেজাসেই চাদরে পা ছুঁলেও তোমার ঘুম ভাঙবে না; ভাঙবে অন্য কারণে। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠেবসতে হবে তোমাকে তখন; হবে না তো কী, খুটখাট শব্দে জেগে উঠে চোখের সামনে ওরকম কিছু
কি তুমি আগে কখনো দেখেছ? চোখ কচলে তুমি জানালার দিকে তাকাবে। মুহূর্মুহূ বাতাসে সেদিকে কপাট দুটো ঘনঘন ঠাস ঠাস করে চৌকাঠে বাড়ি খাবে। সেই শব্দ ছাপিয়ে বৃষ্টিতেভেজা মাটির তীব্র সোঁদা গন্ধ তোমার নাকে লাগবে। এইসমস্ত শব্দ আর গন্ধের মধ্যে তুমি দেখবে জানালার ওপারে অদ্ভুত এক মুখ। জানালার শিকে মানুষটার হাতের আঙুল পেঁচিয়ে রাখা। আঙুলগুলোযেন মুখের কালোকেও হার মানাবে। তুমি নিজেও কালো, তা ছাড়া, কম কালো বা বেশি কালোগায়ের রঙ অনেক দেখেছ তুমি; অথচ ওই অপরিচিত মুখের কালো আগের সব কালোকে ছাড়িয়ে যাবে। আগুনে পোড়া যেন! রাতের অন্ধকারের মধ্যে ওই রহস্যময় ছায়া ছায়া মুখ আর আঙুল দেখেতোমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠবে। কাঁপুনি থামতেই তোমার চিৎকার দিতে ই”েছ করবে। বুকেরসবটুকু বাতাস এক করে তুমি তারস্বরে একটা চিৎকার তৈরিতে মনোযোগ দেবে। কিন্তু কী যেনএক অদ্ভুত কারণে তোমার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোবে না। তুমি অসহায় বোধ করবে। আবারো সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকারটা নতুন করে গোছাতে শুরু করবে। পারবে না। জানালার দিকে ওঠানো তোমার একটা হাত সামান্য উঠেই কোলের উপরে ধপ করে পড়ে যাবে; নিষ্প্রাণের মতো সেখানেইপড়ে থাকবে হাতটা। বিছানার মাঝখান থেকে এতটুকুও নড়তে পারবে না। চোখের মণিও নড়বে না
তোমার। কালো কুচকুচে আঙুলগুলোর দিকে তুমি একভাবে তাকিয়ে থাকবে। ভাববে, আঙুলগুলো কি তোমার জানালার শিক বাঁকিয়েই ফেলবে নাকি! আশঙ্কার চোটে আঙুল ছাড়িয়ে সেই কি¤ ¢ুতকিমাকার মুখের দিকে তোমার দৃষ্টি সহজে প্রবাহিত হবে না; তারপর আবার হুট করে হবেও। যেন কিছু একটা তোমাকে বলে দেবে যে আঙুলগুলো স্থির, নড়ছে না। যেন তুমি বুঝতে পারবে, সে এখনই তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তখন এক ঝটকায় তুমি তার মুখের দিকে তাকাবে। তোমার মুখের মাংশপেশি থরথর করে কাঁপবে। অন্ধকারে বোঝা না গেলেও তোমার মুখ লাল হয়ে যাবে। ক্রোধে তোমার মাথা ঝিমঝিম করবে এই ভেবে যে মধ্যরাতে এক অচেনা কালো মুখ তোমাকে বীভৎস ভয়ে কুঁকড়ে দিতে এসেছে কেন? চোখ কুঁচকে তুমি তখন মুখটার দিকে ভালো করে তাকাবে।
অভিব্যক্তিহীন কালো মুখ তোমার চোখে চোখ রেখে একভাবে তাকিয়ে থাকবে। কিছু বলবে না। তুমিও চাইবে না যে সে কিছু বলুক। শুধু চাইবে যে সে সরে যাক, হাওয়া হয়ে যাক। অথচ সে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। সে আসবে রাতে। কয়েক রাত সে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে।

পরপর কয়েক রাত খুট করে অস্পষ্ট শব্দ শুনে তোমার ঘুম ভাঙবে। তুমি তখন জানই যে কী কারণে তোমার ঘুম ভাঙল, তাই সোজা জানালার দিকে তাকাবে। তাকালে তুমি যা দেখবে বলে আশা করবে তাই দেখতে পাবেÑ সেই অভিব্যক্তিহীন কালো মুখটা। উঠে গিয়ে যদি দরজা খোলো কিংবা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াও, দেখবে সেখানে কেউ নেই। কেউ সেখানে কখনো ছিল বলেও কোনো প্রমাণ তুমি কোনোদিন পাবে না। কেউ বলতে পারবে না কোথা থেকে সেই মুখ তোমার জানালায় উদয় হয় আর কোথায়ইবা মিলিয়ে যায়।

তোমার বাড়ির আশেপাশে আরো বহু একইরকমের বাড়িÑ টিনের ছাদ, টিনের দেয়াল, সামনে ছোটো উঠোন, বাড়ির চারদিকে বেড়ার পাঁচিল, ফাঁকে ফাঁকে ছোটো পুকুর, পুকুর-ঘাটের দু’পাশে বাঁশের বেঞ্চ। কারো বাড়িতে সারাদিন থেমে থেমে গরু-ছাগলের ডাক, কারো বাড়ির সামনে এক চিলতে সবজি বাগান। বাড়িগুলোর পিছনের অবারিত শষ্যক্ষেত, জমিগুলোর মাঝের সরু আলের উপরে লতিয়ে ওঠা শিমের গাছÑ উজ্জ্বল বেগুনি ফুলের ছিটেফোঁটা, পানিতে আকাশের নীল প্রতিফলিত হওয়া চিংড়ির ঘের, আর শেষ প্রান্তে কেবল সবুজ আর সবুজ। সবুজ যেন দেয়াল তুলে দিয়েছে তোমাদের গ্রামের ওই দিকটায়। আরো খানিকটা এগিয়ে গেলে তুমি দেখবে সবুজ সেই দেয়ালটা আসলে জঙ্গল। সাধারণ কোনো জঙ্গল নয়, তার নাম সুন্দরবন। গ্রামের পথেঘাটে তুমি যেমন খালি পায়ে ছুটে বেড়াও, সেখানে সেভাবে হাঁটতে পারবে না। গাছের শ্বাসমূলগুলো তোমার পায়ে সুড়সুড়ি দেবে, কুটকুট করে আঘাত করবে। ছেলেবেলায় প্রথম দেখার পর তুমি অবাক হয়ে ভেবেছিলে, গাছেরাও শ্বাস নেয়? গাছেদেরও নাক থাকে! আর তারপর থেকে ওই গাছগুলোকে তোমার মানুষের মতো মনে হতো। তখন জঙ্গলের কাছাকাছি গেলেই তুমি যে কোনো একটা গাছের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে ভেবে নিতে কোন ডালটা তার হাত, কোনটা পা। তুমি ভাবতেই থাকতে, এটা যদি গাছটার শরীর হয় তবে তার মাথাটা ঠিক কোনখানে। মাথাটা পেয়ে গেলে তার উপরের দিকে উজ্জ্বল দুটো চোখ খুঁজতে তুমি। বোঝার চেষ্টা করতে, তুমি যেমন গাছটার দিকে তাকিয়ে আছ, ওই গাছটাও কি ঠিক সেইভাবে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে? সে-ও কি তোমার চোখ-মুখের অবস্থান দেখছে, তোমার অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে? এইসমস্ত নানান ভাবনার মাঝখানে কোনো কোনোদিন তুমি সত্যিই গাছের মুখটাকে আবিষ্কার করে ফেলতে। আকস্মিক সাফল্যে উত্তেজিত হয়ে উঠতে তুমি। তারপর দেখতে মুখের চারপাশে ঘন সবুজ চুল! বাকলের উপরের ফুলে থাকা বৃত্তপ্রায় গিঁটগুলোর মধ্যে কোনো দুটো বৃত্তকে তুমি গাছটির মায়াময় চোখ বলে ধরে নিতে তখন। আর চোখগুলো নির্দিষ্ট হতেই আবেগে নতজানু হয়ে পড়তে। দেখতে কী গভীর মমতায় গাছটা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তোমার মাথায় হাত রেখে ক্রমাগত জোরে জোরে শ্বাস নিতে বলছে, বলছে যা সে তোমাকে দিচ্ছে তা যেন তুমি পুরোপুরি নাও। তুমি বেঁচে থাক আর বিনিময়ে তাকে শুধু ভালোবাস।

তুমি তাকে ভালোবাসতে। বলতে দ্বিধা নেই যে তুমি একটা সুন্দরী গাছের প্রেমে পড়েছিলে। অস্বীকার করার কিছু নেই যে তোমার প্রথম প্রেম ছিল একটা সুন্দরী গাছের সঙ্গে। কৈশোরে তুমি ভাবতে, জীবনভর সুন্দরী গাছের ওই সারির দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেবে।

তাই গ্রামের বাড়িগুলোর শেষ মাথার উঁচু জমিতে পা ছড়িয়ে প্রায়ই তুমি বসে থাকবে। তুমুল বাতাসের তোড়ে তোমার চোখ বন্ধ হয়ে আসবে। তোমার পাশের গোলপাতা গাছগুলো সিজদার মতো মাটিতে নুয়ে পড়বে। তাই দেখে তোমার গলায় সুর উঠে আসবে। কলেজে সমবেত গানে গলা মেলানোর কথা মনে পড়বে... ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা। বাতাসের এলোমেলো তরঙ্গে তোমার কণ্ঠস্বর চুর চুর হয়ে ভাঙতে থাকবে । বাতাসের ধাক্কা সামলিয়ে নিভুনিভু চোখ কোনোমতে খুলে তুমি নাচতে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবে। দেখবে শষ্যক্ষেতের শেষ সীমানায় বাতাসে দুলে দুলে গাছেরাও হাত-পা নেড়ে তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তুমিও সামান্য হাসবে। উথালপাতাল বাতাসে তোমার মুখ থেকে শিসের মতো শব্দ বেরিয়ে আসবে, বাতাসের আঘাতে মুখের সামনেই মিলিয়ে যাবে সে সুর।

আর ঠিক তখনই বাতাসের স্্েরাতের কাল্পনিক রেখায় সেই কালো মুখটা ভেসে উঠবে। কোথাও সে ছাড়বে না তোমাকে; না খোলা শষ্যক্ষেতে, না বাড়িতে, না কলেজে, না রাস্তায়, না দিনে, না রাতে। তুমি দেখবে ভীড়ের মধ্যে অনেকের মাথার উপর দিয়ে সেই মুখ তোমার দিকে স্থির তাকিয়ে আছে। দেখবে কুয়োতলার সবচেয়ে পিচ্ছিল জায়গাটায় সে অনঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তপ্ত দুপুরে পুকুরে কয়েকটা ডুব দিয়ে উঠে চোখ কচলে দেখবে সে পুকুরের ধারের কাদায় বসে সোজাসুজি তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। মধ্য দুপুরে ক্ষেতের আল ধরে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখবে দূরে সুন্দরী গাছের সারির পাশে দাঁড়িয়ে সে মিটিমিটি হাসছে। তার হাসিতে তাচ্ছিল্যটা ধরতে তোমার এতটুকু কষ্ট হবে না। সহজেই আঁচ করবে যে সে যেন কী গ্রাস করে নেবে, কিন্তু তুমি কোনো উচ্চবাচ্য করতে পারবে না।

ঠিক যেমন পারনি যখন সেদিন নোটিস এল যে তোমাদের পাশের গ্রামের কিছু মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে। কারণ বহুবছর ধরে নিজেদের জায়গাজমি হিসেবে জানা ওই জায়গাটুকু অন্য কাজে ব্যাবহার করা হবে। সেই কাজ নিশ্চয় তাদের নিজ বাড়িতে আরাম করে ঘুমানোর চেয়ে বেশি দরকারি। সেই কাজে নিশ্চয় কিছু মানুষ এত বেশি লাভবান হবেন যা ওই অভাগাদের নিজবাড়ির সঙ্গে জড়িত আবেগের তুলনায় অসম্ভব বড়ো ব্যাপার। তাই হয়ত তুমি কিছ্ইু বলতে সাহস পাওনি। তুমি জানো মানুষ এক জায়গায় যুগযুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। মানুষ তোমার ভালোবাসার সুন্দরী গাছটা তো নয়! মানুষ এগিয়ে যায়। এগিয়ে যাওয়ার পথের দরকারি নানান উপকরণের মতো মানুষের ঘরে আলো লাগে, পাখা চলতে হয়; সুখী আর উন্নত হতে মানুষের সত্যি অনেক কিছু লাগে। আর সেই জিনিসগুলো পাওয়ার জন্যে মানুষ তোমার ভালোবাসার সুন্দরী গাছের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতিকে যেমন খুশি তেমন করে ব্যবহার করে। মানুষ তখন ভুলে যায় যে পৃথিবীটা তার সুখের জন্য বটে কিন্তু কিছু জীবনের আনন্দের বিনিময়ে সেই সুখ পাওয়ার কথা নয়। যা হোক, এত বেশি কিছুর হিসেব তোমার মতো গ্রামের পথে চরে বেড়ানো সাধারণ মেয়ের কাছে থাকে না। তবে নোটিস পেয়ে যে মানুষগুলো সেদিন গ্রামের মাঠে জড়ো হলো, নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল যে তারা এখন কী করবে, কোথায় যাবে, কার বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিবাদ করবেÑ  এইসমস্ত আলোচনার মাঝখানে কখনো তারা আবেগে ভেঙে পড়ল, কখনো ক্রোধের আগুনে গনগনে চোখ নিয়ে উঠে দাঁড়াল, তাদের সেসব চিৎকার চেঁচামেচির মাঝখানেও তুমি দেখলে নির্লিপ্ত সেই অন্ধকার মুখটাকে। দেখলে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসিটা তার লেগেই আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তোমার তখন কেন যেন ভয় লাগেনি; কোনো অস্বস্তিও হয়নি। কোনো কারণে তোমার মনে সাহস জমা হচ্ছিল। মানুষের প্রতিবাদের শক্তির উপরে তোমার আস্থা জন্মেছিল। সেই প্রথম তোমার মনে হয়েছিল, ওই কিম্ভূতকিমাকার মুখটাকে তুমি হটিয়ে দেবে, হারিয়ে দেবে, কিছুতেই তোমার দিকে আর উপহাসের হাসি ছুঁড়তে দেবে না।

তারপর আবার যখন মানুষেরা নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছে, খোলা মাঠে তোমার মতো বেকার কিছু মানুষ এলোমেলো দলে ভাগ হয়ে এদিক ওদিকে বসে আছে, তাদের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়েও তোমার কেমন যেন অসহায় লাগল। মনে হলো শরীর অবশ হয়ে আছে। তুমি বুঝতে পারলে, কী যেন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, কোনো আকুতিই যেন তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

তবে ফিরে আসবে কেবল সেই কালো মুখটা। একইরকমের নিস্তব্ধ রাতে। আবারো খুটখাট শব্দ জানালার কপাটে। অদ্ভুত উপায়ে বন্ধ জানালা হাট হয়ে খুলে যাবে, দেখবে কালো কুচকুচে মুখ নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে তোমার দিকে।  তুমি জানবে কোথাও তাকে আটকে রাখা যাবে না। সে সবখানে ঢুকে যাবে অনাহুত অতিথির মতো। কেউ যেন তোমাকে বলে দেবে যে তাকে কিছুতেই আটকে রাখা যাবে না।

কলেজে গিয়ে একদিন তুমি জানবে, তোমাদের গ্রামের মাঠের সে ক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে গেছে। রাজধানীতে সভা-সমিতি হচ্ছে, সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা হচ্ছে, কখনোবা কোথাও মূক অবস্থান নিয়ে বসে আছে প্রতিবাদকারীরা। সরকার তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না। চাইবে না তো চাইবেই না, বরং তাদেরকে ঠেঙিয়ে বিদায় করবে; তাদের উপরে ছররা গুলি চালাবে, তাদের গায়ে গোলমরিচ মেশানো উত্তপ্ত পানি ছুঁড়ে দেবে। তুমি জানবে যে তারা আহত হবে কিন্তু সংকল্পে অটল থাকবে। কারণ তুমি বিশ্বাস করবে যে মানুষের লাশের উপর দিয়ে যে উন্নয়ন করতে হয় তা আসলে মানুষকে এগিয়ে দেয় না, বরং পিছিয়েই দেয় খানিকটা।

তবে প্রতিবাদে যে তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না, তা তুমি পরিষ্কার বুঝতে পারবে। তোমার বিশ্বাসে আঘাত লাগবে, কষ্ট হবে, রাগ হবে, কিন্তু কিছুই করার থাকবে না। তুমি ভাবতে থাকবে, এ কেমন কথা, সরকারে বসে কেউ নিজের মানুষের জন্য খারাপ চাইতে পারে? তুমি বিস্মিত হবে, গাছকে ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা কি অপরাধ হতে পারে? ধ্বংসের হাত থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে চাওয়ার চেষ্টা কি অন্যায় হতে পারে? তুমি বারবার বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হবে। তাই উপায়হীন নির্বিকারভাবে তুমিও গ্রামের শেষ প্রান্তের উঁচু ঢিবিটাতে গিয়ে বসবে, যেন দেশের সরকার সেজে পায়ের উপরে পা তুলে বসে আছ। তবে পার্থক্য হলো তোমার চোখ পানিতে টলটল করবে। ঝাপসা চোখে তুমি সামনে তাকিয়ে অষ্পষ্ট দেখবে সামনের সবুজ রঙগুলো সারা প্রকৃতিতে লেপটে গেছে, কিছু থেকে কিছু আলাদা করা যাচ্ছে না। সারা পৃথিবীতে তোমার মনের অবস্থার মতো বিভ্রান্তির ঘনঘটা ছড়িয়ে পড়েছে।   

বিভ্রান্তি গাঢ় হয়ে আবছা ছায়া তোমাকে গ্রাস করবে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার দুশ্চিন্তায় তুমি তখন বাড়ির পথে হাঁটা দেবে। তোমার কেন যেন হঠাৎ খুব একা লাগবে তখন। মনে হবে তুমি অভিভাবকহীন, তুমি বন্ধুহীন, তুমি সঙ্গীবিহীন। মনে হবে বিপদে পড়লে হাতটা বাড়িয়ে দেয়ার কেউ নেই তোমার। তুমি জানবে, যে তোমার রক্ষা করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে নিজের স্বার্থে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তুমি মন খারাপ করে সব কিছু ভুলে ঘুমিয়ে পড়াকেই ভালো মনে করবে। কিন্তু মাঝরাতে সেই খুটখাট... তবে মুখটা সেদিন অন্যরকম। কী যেন একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠবে তাতে। উৎকণ্ঠা কি? মুখটা খানিক এগিয়ে আসবে। শিকের চাপে গালে আর নাকে লম্বালম্বি দাগ বসে যাবে যেন। মুখটা ফিসফিস করে কী যেন বলবে। ভালো করে শোনার জন্য তুমি কান পাতবে, মাথাটা একটু এগিয়ে আনবে জানালার দিকে। শুনবে সে বলছে, ‘ও পাড়ায় গাছ কাটা হচ্ছে, মাটির নীচ দিয়ে পাইপ যাবে তো...

হ্যাঁ, তুমি পরিস্কার শুনবে, কালো মুখটা ঠোঁট প্রায় না নাড়িয়েই কথাগুলো দ্বিতীয়বার বলে যাবে; বলেই উধাও। যেন এখন যা বোঝার তুমি বোঝ, যা করার তুমি কর, তাতে তার কী? তোমার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যাবে। আধা শোয়া থেকে ধড়ফড় করে তুমি বিছানায় উঠে বসবে। বসেই থাকবে ভোরের সামান্য আলো না ফোটা পর্যন্ত। তারপর আবছা আলোয় শব্দহীনভাবে দরজা খুলবে। পা টিপে টিপে কাদামাটির উঠোন পেরোবে, ছাড়িয়ে যাবে বেড়ার গেট, এলোমেলো কিছু বাড়ি, কিছু আখের ক্ষেত, শুপারি গাছের সারি। তারপর গিয়ে উপস্থিত হবে বিশাল এক মিষ্টি আলুর ক্ষেতে যার শেষ সীমানায় তোমার চেনা ঝোঁপ-জঙ্গলটাকে দেখবে ভেবে সেদিকে তাকাবে। কিন্তু এ কী! দেখবে অসংখ্য ছোটাবড়ো গাছ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মিষ্টি আলু ক্ষেতের পাশের বিস্তৃীর্ণ এলাকায় কোনো বড়ো গাছই তখন আর দাঁড়িয়ে নেই। উপড়ে ফেলা গাছের পায়ের কাছে বহুবছর ধরে রোদ না লাগা ফরসা মাটি দাঁত বের করে হাসছে। তুমি যাবার পরপরই চারদিক থেকে এক এক করে বহু মানুষ আসবে। একসময় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মৃত গাছের স্তূপের চারদিকে মেলার মতো ভীড় লেগে যাবে। মানুষগুলো নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করবে, সবার মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা থাকবে। তবে কারো কাছে উত্তর থাকবে না, পুরো জঙ্গলটা কে কাটল, কখন কাটল, কেউ জানবে না। শুধু জানবে গভীর রাতের প্রশান্তির ঘুমঘোরে তাদের প্রকৃতি চুরি হয়ে গেছে। ‘কিছু করার নেই’ ভেবে তখনো মাটির নীচে ডুবে থাকা গাছের গোড়াগুলোর দিকে জুলজুলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। করাত দিয়ে এবড়ো থেবড়ো করে কাটা গোড়াগুলোয় সাদাটে স্বচ্ছ রস জমা হয়ে মাটিতে ঝরতে থাকবে। তুমি হাত দিয়ে কয়েকজনকে সরিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করবে, গাছগুলো কাঁদছিল কি?

গাছের কান্নার সাথে সুর মিলিয়ে মনের ভিতরে কাঁদতে কাঁদতে তুমি বাড়ি ফিরবে। কাটা গাছের মতো তোমারও গাল বেয়ে স্বচ্ছ ফোঁটা গড়িয়ে পড়বে, শব্দবিহীন। সূর্য তখন প্রায় মাথার উপরে। গ্রামের মানুষগুলো রোদ মাথায় করে কাটা গাছের স্তূপের পাশে জমায়েত হবে, গবেষণায় ব্যস্ত হবেÑ কে তাদের শত্রু, কার কাছে তারা বিচার দেবে, কার বিরুদ্ধেইবা দেবে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার কাছেই বিচার চাওয়া একরকমের দুর্ভোগ নয় কি? হতাশায়, আফসোসে বাদামি মাঠ হয়ে যাওয়া অতীতের জঙ্গলটার বাতাস ভারী হয়ে উঠবে।

তারপরের প্রতি ভোরে কাটা গাছের স্তূপটাকে তুমি একটু একটু করে কমতে দেখবে। জায়গাটা কয়েকদিনে সত্যি সত্যিই ফরসা! কে বলবে কদিন আগে ওখানে ভিতরের জঙ্গল থেকে পথভুলে দলছুট একটা হরিণ এসে দাঁড়াত, ভীত চোখে এদিক ওদিক উঁকি দিত, গাছের ডালে হলদে পাখি বসে অপরিচিত কাউকে দেখার মতো হরিণটার দিকে তাকিয়ে থাকত। কলেজ যাওয়া-আসার পথে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওইদিকে তোমার চোখ চলে যাবে, পথের ধারে যেমন অপ্রীতিকর কিছু দেখতে না চাইলে চোখটা সেদিকেই বেশি বেশি করে যায়। চিত্রা হরিণের রঙিন শরীরের বদলে তুমি সেখানে খটখটে শুকনো মাঠ দেখবে। তারপর একদিন হঠাৎ দেখবে লম্বা লম্বা পাইপ এনে সেখানে জমা করে রাখা হয়েছে। লোকমুখে শুনবে কাছেধারেই কোথাও বিশাল এক কারখানা হচ্ছে, পাইপ মাটির নীচ দিয়ে চলে যাবে সেখানে। তোমার বাড়ির কাছের পশুর নদী থেকে পাইপটা কারখানায় পানি নিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে মাঠটাতে তুমি লম্বালম্বি গর্ত হতে দেখবে, আর দেখবে পাইপের টুকরোগুলো সেই গর্তে শুয়ে আছে। একদিন ধাতব কিছু অংশ এসে টুকরোগুলোতে জোড়া লাগিয়ে দিলে অজগর সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া আস্ত পাইপটা মাটির নীচে গায়েব; পড়ে থাকবে কেবল শূন্য মাঠটাÑ কখনো কাদা, কখনো চকচকে রোদে ফাটাফাটা। অতীতের সবুজ স্মৃতি সেদিকে তাকালেই তোমার মন খারাপ করিয়ে দেবে।

পরের দিনগুলোতে টানা বৃষ্টির বিষণ্ণ বিকেলে তুমি নকশী কাঁথায় ফোঁড় তুলতে ব্যস্ত হবে। নকশা তুলতে তুলতে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে বনজঙ্গল উজাড় হওয়া নিয়ে দু’চারটা কথা বলবে। তোমরা কেউ কারো দিকে তাকাবে না, হাসবে না, নিবিষ্ট মনে সুতো দিয়ে কাঁথায় ছবি এঁকে চললেও কী যেন অন্যমনস্কতায় তোমার আঙুলে বারবার সূঁচ ফুটবে। প্রতিবারেই তোমার মনোযোগ ফিরে আসবে। চমকে উঠে তুমি ভাববে এসব নিয়ে মন খারাপ করে তুমি কী করবে, এসব তো সরকার আর বড়ো কোম্পানির ব্যাপার; তোমার তুচ্ছ্ব ভাবনাচিন্তা তো এখানে কোনো ছাপ রাখতে পারে না। তুমি গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো আবারো নকশী কাঁথার একটা ফুলে কয়টা পাপড়ি হবে তাই নিয়ে ভাবতে থাকবে। আরো কত কত ব্যক্তিগত ভাবনায় তোমার দিনগুলো ভরে থাকবে! রাতগুলো ভরবে একাকিত্বে। কখনো আবার জানালার পাশে কালো কুচকুচে মুখটা এসে দাঁড়াবে। কোনোদিন ঠায় দাঁড়িয়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকবে, কোনোদিন ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে কিছু বলে যাবে। একদিন বড়ো বড়ো চোখ মেলে বলবে, ‘মানুষের কান্না শুনতে পাচ্ছ? তাদের বাড়িঘর আর নেই আজ থেকে...’

তুমি ধড়ফড় করে উঠে বসবে। ভূমিকম্পের মতো তোমার চৌকিটা নড়ে উঠবে খানিকটা। তুমি কান পাতবে মাটিতে। অনেক দূরে ঘোড়া ছুটে আসার শব্দের মতো শব্দ তোমার কানে বাজবে, যেন কিছু গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যেন ভাঙচুর আর আর্তনাদ! তুমি বোঝার চেষ্টা করবে, এ কি শুধুই কল্পনা? বাকি রাতটুকু তুমুল অস্থিরতায় কাটবে তোমার। শোয়া-বসা, পায়চারি আর থেকে থেকে কান পাতা। সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে আসবে ঘর থেকে। দেখবে তোমার আসার অনেক আগেই মাঠে মানুষ জমা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে তাদের ক্রোধ আর কান্না ভেসে আসছে। শুনবে একটা পুরো পাড়াকে উচ্ছেদ করা হয়েছে কারণ ওই জায়গাটা কোম্পানির দরকার। মানুষেরা সমস্বরে বলবে এ তাদের পূর্বপুরুষের ভিটা, তাদের বাপ-দাদারা তাদের হাতে দিয়ে গিয়েছিল ওই মাটির দেখাশোনা করার জন্য, এখন তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলে কী করে তারা তার দেখাশোনা করবে? পরিবার পরিজন নিয়ে তারা যাবেইবা কোথায়? কোম্পানি বলবে ক্ষতিপুরণ হিসেবে তার চেয়েও ভালো জায়গা তাদের দেয়া হবে। আর তুমি ভাবতে থাকবে, তবে এত মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ল কেন, কেন খোলা আকাশের নীচে তাদের রাত কাটাতে হচ্ছে, হাজার ভাবলেও তুমি তার জবাব পাবে না। কোম্পানি বলবে তারা অনেক আগে নোটিস পাঠিয়েছে কিন্তু নাছোড়বান্দা লোকগুলো সরেনি। উদ্বাস্তু মানুষগুলো বলবে অন্যায়ভাবে তাদের ভিটেছাড়া করা হয়েছে। ভাঙা দেয়াল, উপড়ানো চুলা, যত্রতত্র পড়ে থাকা ব্যাবহারের জিনিসপত্রের মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে দেখবে তুমি তাদের। ভাবতে থাকবে, এটাই কি শিকড় হারানোর বেদনা? মানুষের সঙ্গে তোমার প্রথম প্রেমিক সুন্দরী গাছের অদ্ভুত সাদৃশ্যে তুমি বিস্মিত হবে। তুমি জানবে নিজ খেয়ালখুমিমতো চলে ফিরে খাওয়া মানুষগুলোর অদৃশ্য শিকড় থাকে, উপড়ে নিলে ব্যথা পায়।

যেদিন গ্রামের মানুষের ¯্রােতের সঙ্গে তুমি সেই পাড়ায় উপস্থিত হবে, নিজ চোখে দেখবে রাতারাতি বাড়িঘরগুলো কী করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হলো। দেখবে খোলা আকাশের নীচে শূন্য উঠোনে মাথায় হাত রেখে বসে আছে কেউ, কেউ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজের দরকারি জিনিসটা খুঁজতে ব্যস্ত, মাছ ধরার ছেঁড়া জাল, মধু সংগ্রহের ভাঙা পাত্র, উলটানো হাড়িকুড়ি, ভাঙাচোড়া চেয়ার আর চৌকির ফাঁকে ফাঁকে অর্ধ উলঙ্গ ছোটো বাচ্চারা নিজেদের মতো কানামাছি খেলায় মগ্ন। এত অল্প বয়সে শিকড় গজায় না হয়ত, তাই উপড়ে ফেলাতেও কোনো অনুভূতি নেই। অথচ বয়স্ক কাউকে দেখবে প্রাণপন অভিশাপ দিতে, যারা এল, যারা এসে তাদের ভিটেছাড়া করল, তাদের উদ্দেশে। দেখবে শহর থেকে আসা ক্যামেরা হাতে সাংবাদিক, একেকরকম নাম খোদাই করা মাইক্রোফোন হাতে রিপোর্টার। সবাই অন্যায়ের কথা বলবে, অনাচারের কথা বলবে। তুমি জানবে না এসব করাইবা হচ্ছে কেন। সাংবাদিকরা যেসব ছবি তুলে নিয়ে গেল, তুমি ভাববে সেগুলো পেপারে ছাপলে বা টেলিভিশনে দেখালে তো সারাদেশে তোলপাড় হয়ে যাবার কথা। সরকার কি কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার কথা। তুমি নিশ্চিত কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে, তুমি ভাববে উচ্ছেদ করা মানুষগুলোকে নতুন করে বাড়ি বানিয়ে দেয়া হবে, মানসিক দুর্গতি আর সম্পদের ক্ষতিপুরণ দেয়া হবে। তুমি নিশ্চিত থাকবে যে তা হবেই, কারণ, তুমি জানো তুমি একটা মানবিক পরিবেশে বাস কর, এত বড়ো অন্যায় তো চাপা থাকতে পারে না।

অথচ তুমি পরের দিন মানুষজনকে বলতে শুনবে যে কোথাও কোনো খবর ছাপেনি; টেলিভিশনেও কিছু দেখায়নি। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক জঙ্গলের কাছাকাছি, নদীর ধারের কোনো এক লোকালয়ে কী ঘটে গেছে, তা কেউই পরিস্কারভাবে জানবে না। কোম্পানির কারখানার জন্য নির্ধারিত জায়গা ছাড়িয়ে আরো অনেকটা জুড়ে মানুষের বাস উঠিয়ে দেয়া হলো, এ যেন জরুরি কোনো খবরই নয়। মানুষের আহাজারি কোথাও পৌঁছেনি দেখে তুমি ব্যথিত হবে। কোনো কারণে একদিন বন কর্তৃপক্ষের অফিসের সামনে দিয়ে যাবার সময়ে কিছু নারীকণ্ঠের চিৎকার শুনে তুমি সেদিকে এগিয়ে গিয়েছিলেÑ সেই কথাটা তখন তোমার মনে পড়বে। গিয়ে দেখেছিলে এক লাইনে মেঝেতে বসিয়ে রাখা হয়েছে মধ্যবয়সী কিছু নারীকে। তাদের সামনে স্তূপ করে রাখা সরু কারেন্টের জাল। একটি মাত্র লম্বা দড়িতে তাদের প্রত্যেকের হাত একের পর এক বাঁধা। পুলিশের পোশাকে একজন ঘুরে ঘুরে তাদের পিঠে বেত দিয়ে ঘনঘন আঘাত করছে। একজনের পিঠের আঘাতে সমস্বরে তারা সবাই চিৎকার করে উঠছে। লালাভর্তি মুখে তাদের কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না, কেবল বোঝা যাচ্ছে যে এই জাল ব্যাবহার করে তারা আর মাছ ধরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করছে। তারা ক্ষমা চাচ্ছে, হাতজোড় করে বলছে যে নিতান্ত বিপদে পড়ে তারা অন্যায়ভাবে মাছ ধরতে গেছে। কিন্তু সামনের লোকটি তাদের কোনো সাফাই শুনতে নারাজ। তার হাতের বেতটি ঘনঘন বাতাসে লাফিয়ে উঠছে, লাফিয়ে পড়ছে নারীদের শরীর লক্ষ্য করে। সেদিনের কথা ভাবতে গেলেই সেই নারীদের চিৎকার তোমার কানে বাজবে, চোখে ভাসবে পান আর গুল খাওয়া তাদের কালচে-লাল দাঁতওলা মুখের অবিরাম আকুতির দৃশ্য। তুমি সেখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে আরো কিছু দর্শকের সঙ্গে। তারপর একসময় তোমাদের সেখান থেকে সরে আসতে বলা হয়। তোমার আর জানা হয়নি যে ওই মাছ-চোর নারীদের কপালে কী ঘটেছিল। তাদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এটুকু পর্যন্ত তুমি ভাসা ভাসা শুনেছ। বেতের বাড়ির চেয়েও শক্ত কোনো শাস্তি নিশ্চয় তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল, এটুকু তুমি ভেবে নিয়েছ। কিন্তু বাড়িঘর উচ্ছেদের ওই দিনে ভাঙা জিনিসের ল-ভ- স্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে তুমি কিছুতেই ভাবতে পারবে না যে এতগুলো মানুষকে সর্বস্বান্ত করা লোকগুলোর কোনো শাস্তি হবে না। তোমার জানামতে এ নিশ্চয় পশুর নদীতে চুপিচুপি কারেন্টের জালে মাছ ধরার চেয়ে অনেক বড়ো অপরাধ। এতগুলো লোকের অহেতুক হয়রানির কারণ হওয়া কিংবা সারা জীবনের জন্য ভিক্ষুক হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি করা কি বড়ো অপরাধ নয়?

সেদিন রাতে তুমি অশান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। তোমার মাথার উপরে ছাদ আছে, চারদিকে দেয়াল আছে, তুমি নিরাপদ আছÑ এসব ভেবে তোমার খুব লজ্জা করবে। শেষ বিকেলের আলোয় দেখা হতভাগ্য মানুষগুলোর খোলা আকাশের নীচে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নেয়ার দৃশ্য তোমার চোখ থেকে কিছুতেই সরবে না। তুমি না পারবে ঘরে থাকতে, না পারবে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। এই দোটানার মধ্যে জানালার পাশে উপস্থিত হবে সেই কালো কুচকুচে মুখটা। ঠোঁট না নাড়ালেও মুখটা মিনমিন করে অনেক কিছু বলবে।

‘এত্ত বড়ো এলাকা কেন খালি করা হলো, জানো? কারখানার আশেপাশে বড়ো বড়ো বিল্ডিং হবে। আরো অনেক কারখানা, অনেক মানুষের থাকার ব্যবস্থা আর তাদের কেনাকাটার জন্য বড়ো বড়ো...’

ওঠানামাবিহীন একটানা বলে যাওয়া কথাগুলো তোমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেবে। তুমি চিৎকার করবে, ‘কী?’
‘আহা শোনোই না, বড়ো বড়ো দোকান-পাট তো লাগবে নতুন এসে পড়া এতগুলো মানুষের জন্য। তার জন্য শুধু লোকালয়ের দিকটা পরিস্কার করলেই তো আর হবে না, কিছু বন-বাদাড় কাটতে হবে, কিছু জলা জায়গায় মাটি ফেলে ভরাটও করতে হবে।’

চোখ গোল গোল করে তুমি কিম্ভূতকিমাকার মুখটার দিকে তাকাবে। অবাক হয়ে ভাববে সত্যিই সে এই কথাগুলো উচ্চারণ করল কি? যদি করেই থাকে তবে তো ভয়াবহ বিপদ! অনাগত দিনের কথা ভেবে তখন তোমার সারা শরীর শিউরে উঠবে। ঘুমের ঘোরে তুমি বিরবির করে উচ্চারণ করতে থাকবে, কিম্ভূতকিমাকার তুমি কার, তুমি কার? নিজের ভিতরে পোষা হয়তবা জরুরি সরকার...। একইভাবে দিনের পর দিন মুখটা তোমাকে ভয় দেখিয়ে যেতে থাকবে। দিন কাটবে নানান দুঃসংবাদে, আবার রাত এলেই কালো মুখটার মুখোমুখী হওয়ার আশঙ্কা তোমাকে আড়ষ্ট করে ফেলবে। তুমি জানবে কারো কাছে অভিযোগ করার নেই, কারো কাছে সান্ত¦না পাবার নেই। আর তাই যা যা ঘটবে ভেবে তুমি ভয় পেয়েছিলে, চোখের সামনে সেইসমস্তকিছুকে অনায়াসে ঘটতে দেখবে।

কদিনেই পড়াশোনার পাট চুকে যাবে তোমার। সংসারধর্ম পালন করে দিন কেটে যাবে। পারিবারিক খামার আর কৃষিকাজে সাহায্য করার বাইরে নকশী কাঁথায় নিত্যনতুন নকশা তোলাতে তোমার থাকবে একনিষ্ঠ মনোযোগ। মাটির উঁচু বারান্দায় বসে তুমি নকশা তুলবে। তোমার সন্তান নীচে উঠোনে কাদামাটি দিয়ে খেলবে। ফোঁড় তোলার ফাঁকে ফাঁকে তার দিকে নজর রাখবে তুমি। দিন শেষে তোমার স্বামী কোনাদিন মাছ ধরার জাল বা লাঙল হাতে বাড়ি ফিরবে, কোনোদিন বেতের সরু লাঠি হাতে খেদিয়ে আনবে এক পাল গরু। মাস-দুমাস পরে পরে কারুশিল্পের শহুরে অফিস থেকে লোক এসে দামদর করে নিয়ে যাবে তোমার বানানো কাঁথাগুলো। একইভাবে বারান্দায় বসে আর চুলোয় আগুন দিয়ে দিন কাটবে তোমার। খেলতে খেলতে তোমার সন্তান ‘মা মা’ করে ছুটে এসে কোলে উঠবে। সত্যি, তোমার চেয়ে আর সুখী আর কে হবে তখন! এতসব সুখের ভীড়ে তোমার মনে থাকবে না, কবে কোন রাত থেকে কালো কুচকুচে মুখটাকে তুমি আর দেখনি কিংবা তার কথা ভাবনি। রূপকথার গল্পের শেষ লাইনের মতো কবে থেকে তোমার জীবনে ‘রাজা-রানি সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ ধরনের ব্যাপার শুরু হয়েছিল, সেই দিনতারিখ তোমার মনে পড়বে না। তারপর একদিন পা ছড়িয়ে বসে নকশীকাঁথায় একটা উড়ন্ত পাখির মেলে রাখা ডানায় হলুদ আর নীল সুতোর ফোঁড় তুলতে তুলতে তুমি আশেপাশের মানুষকে নদীর কথা আর জাহাজের কথা বলাবলি করতে শুনবে। তারা বলবে, একসঙ্গে বহু বাড়ির সমান এক জাহাজে ঢাকনা দিয়ে কী যেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জাহাজটা চলে যাচ্ছে পশুর নদী দিয়ে, যারা দেখে এসেছে তারা গল্প বলছে। দেখবে যারা জানে তারা বুঝিয়ে বলছে যে কারখানায় জ্বালানি যাচ্ছে। জাহাজে মোটা কাপড়ের ঢাকনার নীচে আছে কয়লা, যাতে আগুন ধরানো হবে। কৌতূহল রাখতে না পেরে বাড়ির পিছনের কাদা রাস্তায় পা ডুবিয়ে তুমিও ছুটে যাবে দেখতে। জাহাজের বিশাল আকৃতি দেখে তোমার মুখ হা হয়ে যাবে। ভাটির ¯্রােতের টানে ভরা বর্ষায় অত বড়ো জাহাজ তোমার চোখের সামনে দ্রুত নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। জাহাজের পর জাহাজ যাবে। তুমি জানতে পারবে যে কারখানার পাশে কয়লার পাহাড় হয়ে গেছে। তবে কদিনেই নাকি ফুরিয়ে যাবে, তাই আরো অনেক কয়লা লাগবে, আরো বহু জাহাজ আসবে, আসতেই থাকবে। সবকিছু শুনেটুনে বাড়ি ফিরে আসবে তুমি, ভাঁজ করে রাখা অর্ধসমাপ্ত কাঁথায় মনোযোগ দেবে। কোথায় কয়লার পাহাড় হচ্ছে না-হচ্ছে সেই সংবাদে তোমার দৈনন্দিন জীবনে কিছু নড়চড় হবে না।

তারপর আরো বহুদিন তুমি একইরকমের সুখে ভাসতে থাকবে যতদিন আবারো নতুন কোনো খবর অস্বাভাবিক হয়ে তোমার কানে না বাজে।

একদিন সবাই বলাবলি করবে অদ্ভুত এক দুর্ঘটনার কথা। বলবে, দলে দলে লোক নাকি নদীর দিকে ছুটে যাচ্ছে। জানতে পেরে সকালের রান্না রেখে তুমিও যাবে তাদের সঙ্গে। জোয়ারের পানি এসে নদী তখন ভরপুর আর স্থির। গিয়ে দেখবে কাদা গোলানো গাঢ় বাদামির জায়গায় কালো কুচকুচে পানি। চমকে উঠে চারদিকে তাকাবে, কোথাও মেঘ ঘনিয়ে আসেনি, পরিষ্কার আলোতে অন্ধকারের মতো পানি দেখে তোমার বিস্ময় জাগবে। আগেও অবশ্য তুমি শুনেছিলে যে জাহাজ যাবার পথে কয়লার গুঁড়ো পড়ে ¯্রােতের উলটোদিকে ছুটে যাচ্ছে, পানির মধ্যে মিশে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে বলতে শুনেছিলে কোথাও পানির উপরে কয়লার গুঁড়ো ভাসছে, মাছের জালে দলা পাকিয়ে উঠে আসছে। তারা বলেছিল বহুদিন ধরে এ নদীতে এরকম চলতে থাকলে পানি কালো হয়ে যাবে, মাছ তো থাকবেই না আশেপাশের গাছপালাগুলোও মারা পড়বে। নিজচোখে কয়লার গুঁড়ো পড়তে দেখনি বলে তোমার কেন যেন সেসব নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু সেদিন যখন শুনবে ভাটির টানের সময়ে কয়লা ভরা জাহাজ উলটে যাবার কথা, গিয়ে দেখবে তোমার পরিচিত নদীর পানিতে কে যেন কালো রঙ মিশিয়ে দিয়েছে, সব অচেনা লাগবে তখন। তোমার ইচ্ছে করবে এক মুহূর্তে সমস্ত পানি আগের মতো করে দাও, কিন্তু শুধু তুমি কেন, কেউই তখন তা পারবে না। নদী থেকে খানিক দূরে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে তুমি অনেক আগে একদিন দেখা তেলতেলে আর কালো নদীর কথা ভাবতে থাকবে। একদিন নদীতে তেলের ট্যাঙ্কার উলটে গিয়েছিল। বহু মানুষের সঙ্গে তুমিও গিয়েছিলে নদী দেখতে। গিয়ে দেখলে পানি কোথায়, তেল দিয়ে বিচিত্র দেশের ম্যাপের মতো নানান আকৃতির স্তর হয়ে আছে পানির উপরে। কালচে তেলে পুরো এলাকাটা সয়লাব। দেখতে দেখতে চোখের সামনে ছোটো বড়ো নানান ধরনের মাছ মরে ভেসে উঠল। মানুষের ঢল নামল তখন। তারা সেইসব মাছ সংগ্রহে ব্যস্ত হলো। জাল টেনে, তেল ছাড়িয়ে ঝুড়ির পর ঝুড়ি মাছ সরে যেতে লাগল নদীর তীর থেকে। আরেক দল এল আরো সরু জাল নিয়ে। তারা তেল ওঠানোতে মনোযোগী। সূক্ষ্ম জালে তেল ছেঁকে হাড়ি, গামলা ভরতে লাগল। এত তেল, এত মরা মাছ, কালো কুচকুচে নদী আর মানুষের কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তুমি কিছুই বুঝতে পারনি কী ভালো হলো, কী খারাপ। তাই সেসব ছাড়িয়ে নিস্তব্ধ বনাঞ্চলের ভিতর দিয়ে তুমি যখন বাড়ি ফিরছিলে, তখন দেখলে নদীর তীরের গাছের গুঁড়িতে তেলের গাঁদ আটকে আছে। গোলপাতার স্ফীত গোঁড়ার ফাঁকে ফাঁকে তেল যেন থমকে গেছে চিরজীবনের তরে। ভালোবাসার সুন্দরী গাছের শ্বাসমূলগুলো তেলে মাখানো দেখে বুকের ভিতরে চিনচিন করে উঠেছিল তোমারÑ তবে কি ওরা শ্বাস নিতে পারছে না? নিশ্বাস আটকে বসে আছে বেচারারা? দেখে কেন যেন মনে হলো তোমার নিজেরই নাকের সামনে তেলের স্তূপ হয়ে আছে। হাতের উলটোপিঠে ঠোঁটের উপরটা মুছে নিলে বারকয়েক। সূর্য মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে আসতে ভীষণ পিপাসা পেয়ে গিয়েছিল তোমার। তাড়াহুড়ো করে পিতলের কলসির মুখে উপুড় করে রাখা কাঁসার গ্লাসটায় পানি ঢেলে নিলে। মুখে গ্লাস ছোঁয়াতেই ভয়ানক এক ভাবনায় তোমার গলার কাছে আটকে যাবার মতো ব্যথা জানান দিল; তুমি পানি গিলতে পারলে না। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল। আকস্মিক তোমার মনে হলো, চরম পিপাসার সময়ে তোমাকে যদি কেউ এক গ্লাস তেল খেতে দেয়, তবে তোমার কেমন লাগবে? পানির গ্লাসটা হাতে ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে তুমি ভাবতে লাগলে তখন, আচ্ছা, মাছদের কি পিপাসা পায় না?

 সেদিন ওই স্মৃতিরই পুনরাবৃত্তি হবে তোমার মনে। ধীর আর ভারী পা ফেলতে ফেলতে তুমি ভাববে কয়লার গুঁড়ো মেশানো পানি খেতে কেমন লাগবে। গলার কাছে বালু আটকে যাওয়ার অনুভূতি হবে তোমার। ছোটোকালে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে গিয়ে যখন গলার কাছে থুতু মেশানো কয়লা আটকে গিয়েছিল, সেই স্বাদ তোমার সারা মুখে ছড়িয়ে যাবে। গলার কাছে অস্বস্তিতে এক দলা থুতু ফেলে চোখ উঠিয়েই তুমি ধেয়ে আসতে থাকা আরো আরো মানুষের ¯্রােত দেখতে পাবে। তোমাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত তারা ছুটে যাবে নদীর দিকে। কাদা আর কয়লায় মাখামাখি হয়ে তোমার পা আটকে যেতে থাকবে। পায়ের দিকে তাকাবে ভাবতেই চোখ আটকে যাবে অন্য কারো দিকে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়াতে কাদায় তোমার পা ডুবে যাবে কিছুটা। ভিড়ের মধ্যে তুমি হঠাৎ দেখবে সেই মুখ, কালো কুচকুচে, কিম্ভুতকিমাকার! আর তাতে দেখবে সেই একই তাচ্ছিল্যের হাসি।

আটকে যাওয়া পা কাদা থেকে ছাড়িয়ে কোনোরকমে তুমি বাড়ির পথে হাঁটা দেবে। খানিক দৌড়, আবার খানিক হাঁটা। কাদায় পিছলে যাবে ফুটখানেক। কোনো একটা লতায় জড়িয়ে মাটিতে প্রায় পড়তে পড়তে নিজেকে ঠেকাবে। ভালোমতো দাঁড়িয়ে পিছনে তাকিয়ে নেবে সতর্কভাবে। কালো মুখটা কি তোমার পিছু নিয়েছে? কী চায়, কেন এল সে আবার এতদিন পরে? পড়ি কি মরি করে তুমি উঠবে, দৌড়োতে গিয়ে আবারো পড়বে। এভাবেই বাড়ির কাছে পৌঁছে শেষবারের মতো পিছনে তাকাবে। নাহ্, সে নেই। তবু দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে খিল তুলে দেবে তুমি। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে শেষ পর্যন্ত হাঁফাতে থাকবে।

সেদিন রাতে বহুদিন পরে জানালার পাশে খুটখাট শব্দে ঘুম ভাঙবে তোমার। সন্তানের মুখ আঁচল দিয়ে ঢেকে কালো মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাবে তুমি। আগের মতোই ঠোঁট না নাড়িয়ে বলে যাবে সে, কী ভেবেছ, ওই কয়লা অত সহজে পানি থেকে চলে যাবে? মাছ মরবে, গাছ মরবে, মানুষ মরবে...আর কদিনেই দেখবে মানুষ নিশ্বাস নিতে পারবে না। বাচ্চা কেঁদে উঠলে চোখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাতেই জানালার ওপাশ থেকে কালো মুখ গায়েব। নেই তো নেই, তারপর আবারো বহুদিন নেই।

সেবারে নদীর পানি থেকে কয়লা ধুয়ে ময়লা সাফ করতে সত্যি বহুদিন লেগে যাবে। পানির নীচে কাদার মধ্যে গেঁথে থাকবে বড়ো বড়ো কয়লার চাক। গুঁড়ো খেয়ে মাছ মরবে বিস্তর। কালো পানি সহজে কাদামাটির রঙে ফিরবে না। আর তুমি ভাবতে থাকবে, কালো মুখটা কী বলে গেল, মানুষ নিশ্বাস নিতে পারবে না কেন? যা হোক, প্রাণপনে তুমি অবান্তর হাজির হওয়া মুখের অবাস্তব কথাগুলো ভুলে থাকতেই শান্তি বোধ করবে। কিন্তু কতদিন? একদিন খবর পাবে কারখানা চালু হবার। জানবে অনেক বিদ্যুৎ তৈরি হবে, আলোয় আলোয় ভরে যাবে সব। কিন্তু তুমি তোমাদের গ্রামগুলোতে কোনো পরিবর্তন দেখবে না। তোমাদের ওখানে যার যা ভাগ্যে ছিল, টিমটিমে আলোর একটা দুটো বাতি কিংবা কুপি কেঁপে কেঁপে জ্বলতে থাকবে। সবাই বলাবলি করবে তোমাদের বেছে নেয়া হয়েছে কেবল দরকারি বিদ্যুৎ তৈরির ঝামেলাটা পোহানোর জন্য, সুবিধাটা নির্ধারিত অন্য কারো জন্য। তোমার চারপাশটা তারা কেবল তাদের নিজেদের সুবিধার জন্য ইচ্ছেমতো ব্যবহার করবে, বিনিময়ে তোমাদের কিছু দেয়ার কথা যে তারা ভাবেনি তা তোমরা আগেভাগেই জেনে যাবে। তবে হ্যাঁ, কিছু তো তোমরা পাবেই, দিনেদুপুরে ঝিঁঝিডাকা বনবাদাড়ের জায়গায় ঝকঝকে দোকানপাট পাবে, শিল্প-কারখানা পবে, দিনে-রাতে সেখানে ঝলমল করবে আলো। নিজের উঠোনে উজ্জ্বল আলো দেখার ভাগ্য তোমার কবে হবে তা জানা না থাকলেও তুমি দেখবে অন্যকিছু। মধ্যরাতে নিশিডাকার মতো কালো মুখটা তোমাকে ডাকবে একদিন। ঘুমন্ত শিশু ফেলে সম্মোহিতের মতো দরজা ঠেলে রেবিয়ে আসবে তুমি। ইঙ্গিতে বাড়ির পিছনের বেগুনের ক্ষেতে সে তোমাকে নিয়ে যাবে। তাকে অনুসরণ করা ছাড়া যেন তোমার তখন অন্য কোনো উপায় থাকবে না। হাঁটু গেঁড়ে বসে সে তোমাকে দেখাবে ছাইয়ে ঢাকা বেগুনের পাতাগুলো। চাঁদের আবছা আলোতেও পোড়া পোড়া বেগুনের পাতা দেখে তুমি আঁতকে উঠবে।

আর তারপর থেকে শুধুু রাতে নয়, দিনেও বাতাসে ছাইয়ের ঢেউ দেখতে হবে তোমাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যেতে যেতে প্রতিদিন তুমি আকাশে ঘন কালো ছাইয়ের মেঘ ছেয়ে আসতে দেখবে। যেন প্রচ- আক্রোশে তোমাদের লোকালয়টাকে গ্রাস করবে, যেন কাউকে রেহাই দেবে না। কোনাদিন কোনো কালবৈশাখীও এত ভয় দেখাতে পারেনি তোমাকে। এগিয়ে আসা ধূসর মেঘ আকাশ থেকে গড়িয়ে পড়বে তোমাদের বাড়ির দিকে।  নিশ্বাসে ছাইয়ের গন্ধ থেকে যখন তুমি এক মুহূর্তের জন্যেও রেহাই পাবে না, থেকে থেকে তখন তোমার কেবলই সেই কালো মুখটার কথা মনে পড়বে। সে বলেছিল, কেউ নিশ্বাস নিতে পারবে না। তোমার ছোট্ট সন্তানের নাকের ভিতরে কালো ছাইয়ের স্তূপ জমা হবে, তার হাতে পায়ে নখের ভিতরে কালো ছাই অনায়াসে বাসা বাঁধতে শুরু করবে। বাড়ির ছাদে কি আঙিনায়, পিছনের সবজি-ক্ষেতে, ধুয়ে মেলে দেয়া তোমার ঝকঝকে ছাপা শাড়িতে, সবখানে তুমি কেবল ছাইয়ের স্তর দেখবে। বাড়ির পিছনের পুকুরে ছাইয়ের স্তর সরিয়ে ডুব দিতে হবে তোমাকে। পানি মুখে নিলে জিবে আটকে যাবে ছাই। ছাই তোমার চুলে আটকে থাকবে। কোলে উঠে সন্তান তোমার আদরের মাখামাখিতে মায়ের চুলের গোছা থেকে ছাই চুষে নেবে। বাড়ির আশেপাশের বিস্তৃত সবুজ মাঠ হয়ে যাবে ধূসর। ঘাসের ডগায় শিশিরের পরিবর্তে অনুজ্জ্বল ছাই মন খারাপ করে পড়ে থাকবে। ছাইরঙা ফুলকপি ফলবে তোমার খেতে। বাঁধাকপির পরতে পরতে জমে থাকবে ছাইয়ের গুঁড়ো। তোমার পরিশ্রমী স্বামী, যিনি একসময় হৃষ্টপুষ্ট গাভির পাল নিয়ে বাড়ি ফিরতেন, একেক দিন একেকটা গাভির মৃত্যু সংবাদ বয়ে আনবেন তখন। ছাইওলা ঘাস খেয়ে চোখের সামনে মুখে ফেনা তুলে তোমাদের লালন করা গরুগুলো মরতে থাকবে। তোমার সন্তান একদিন জং ধরা টিনের খেলনা দু’হাতে দু’টুকরো এনে উঠিয়ে দেবে তোমার হাতে। বাড়ির দরজার হুড়কো থেকে শুরু করে তোমার পিতলের কলস, কাঁসার গ্লাস, সমস্ত কিছু জং ধরার মতো করে গুঁড়ো হয়ে পড়বে ধীরে ধীরে। ফসল ফলাতে না পেরে উপায়হীন হয়ে তোমার স্বামী উঁচু বারান্দায় তোমারই মেলে রাখা নকশী কাঁথার পাশে মাথায় হাত রেখে বসে থাকবেন। তুমি জানবে না কী বলে সান্ত¦না দেয়া যায়। তুমি কেবল দেখবে কিছুদিনের মধ্যে কী করে তোমার গোলা খালি হয়, গোয়াল ঘর শূন্য হয়। দেখবে কী করে শিশুকে নিশ্বাসের কষ্টে কিংবা গায়ে ভয়ানক চুলকানির জন্য ঘনঘন সরকারি হাসপাতালে নিতে হয়। সব দেখেশুনে অদৃষ্টকে দোষারোপ করতে থাকবে তুমি। সবটুকু দুর্ভাগ্য তুমি মেনে নেবে। উঁচু বারান্দায় বসে আগের সেই সবুজ আর রঙিন দিনগুলোর স্মৃতি তোমাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। তোমার চোখ বেয়ে পানি পড়বে যখন সন্তানের মুখে তুলে দেয়ার মতো সামান্য ভালো খাবারও তোমার কাছে থাকবে না। কারো কাছে চাইতেও পারবে না। কার কাছে যাবে তুমি, প্রতিবেশি প্রত্যেকের অবস্থা তো একই! সবার কূয়োর পানিতে ছাইয়ের স্তর। ফসলের আয় কমতে কমতে তখন নলকূপ বসানোর সঙ্গতিও নেই কারো। তবু ছেঁকে হোক, ফুটিয়ে হোক, সেই পানিই কোনোরকমে খেয়ে বেঁচে থাকবে তোমরা। আর তারই মধ্যে একদিন এক রাতে কালবৈশাখীর তা-বের মতো শব্দ করে কালো কুচকুচে মুখটা জানালা দাপাতে থাকবে। সমস্ত পৃথিবীতে ভূমিকম্প লেগে গেছে ভেবে চৌকি থেকে লাফিয়ে নামবে তুমি। ছুটে যাবে জানালার দিকে, দু’হাতে জানালার কপাট আটকাতে চাইবে জোর করে। কিন্তু বলিষ্ট ওই আঙুলের সঙ্গে পারা কি তোমার কাজ! জানালা হাট হয়ে খুলে যাবে। তার উৎকণ্ঠিত মুখ তোমার দৃষ্টিতে আসবে তখন। অন্ধকারের কালোর সঙ্গে মিশে সবখানে একই মুখ দেখতে পাবে তুমি। আর তার পরপরই যেন হাজার কণ্ঠে তুমি শুনতে পাবে, ‘এখনো ঘুমিয়ে আছ? পাইপগুলো ফেটে গেছে, সারা গ্রামে পানি ছড়িয়ে পড়ছে, সব ভেসে যাচ্ছে... ভেসে যাচ্ছে সব...’

ঠিকমতো কিছু বুঝতে না পেরেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসবে তুমি। ভোরের আলো তখন একটা-দুটো আলোকরশ্মির রেখা বেয়ে তোমার উঠোনে পৌঁছতে থাকবে। মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে ফিরে আসতে থাকা মানুষদের উচ্চস্বরের আলাপে তুমি রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। কী হয়েছে বুঝতে তোমার সময় লাগবে। তবে দলেবলে সবাই যেদিকে যাচ্ছে, দ্রুত পায়ে তুমিও সেদিকে চলতে থাকবে। কেউ বলবে, পনেরো হর্স পাওয়ারের পাম্প চলছে যেন! কেউ বলবে, আমার ক্ষেতে কত ধান ছিল, সব গেল। কেউ বলবে, আসেন, আসেন পাইপের ফুটোগুলো বন্ধ করি, মাটি চাপা দিই। হতাশ কোনো কণ্ঠ বলবে, ওরকম পানির চাপ মাটি দিয়ে চাপা দেয়া যায়!

মাটি-কাদার সরু রাস্তাটা ধরে এগোতে এগোতে দলটা ভারি হতে থাকবে। একের পর এক বাড়ি থেকে মানুষ বেরিয়ে আসবে, দলে যোগ দেবে। মুহূর্মুহু উৎকণ্ঠা আর অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়বে আনাচেকানাচে। একখানে এসে দলটা দাঁড়াবে। নেতাগোছের কেউ একজন আঙুল তাক করে দেখাবে, ওই যে, ওই দিকে। দলটার চলার গতি আরো বেড়ে যাবে তখন। খানিক পথ পেরোনোর পরে পায়ের গোঁড়ালি ডুবে যাবে নোনা পানিতে। রাস্তা, ক্ষেত, মাঠ, উঠোন, সমস্তকিছুর উপর দিয়ে বন্যার ¯্রােতের মতো পানি বয়ে যাবে। নোনা পানি ছড়িয়ে পড়বে সারা গ্রামে, গ্রামের পর গ্রামে। অসংখ্য পা পানির ¯্রােত কেটে কেটে সেই মাঠের কাছে এসে উপস্থিত হবে যেখানে কোনো একদিন জঙ্গল ছিল। যেখানে কোনো একদিন গাছের ডালে হলুদ পাখি বসে থাকত, ঝোঁপের আড়ালে পথহারা কোনো হরিণ এসে দাঁড়াত। দলের সঙ্গে তুমিও এসে দাঁড়াবে ঠিক তার পাশে। সাদা চোখে মাঠটাকে তখন মনে হবে গভীর কোনো পুকুর। আর ভরা বর্ষায় পুকুর ছাপিয়ে যেমন চারদিকে পানি ছড়িয়ে যায়, মাঠ থেকে তোমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে তাবৎ এলাকায় ঠিক সেইভাবে পানি ছড়িয়ে যেতে দেখবে তুমি। একসময় মাঠ ছেড়ে এগোবে আরো খানিকটা, পাইপ যেদিকে গেছে। কোথাও মাটির নীচে, কোথাও রাস্তার পাশ দিয়ে, দেখবে থেকে থেকে বিভিন্ন জায়গায় পানির তোড় বেরিয়ে আসছে। মানুষজন মাথায় হাত রেখে রাস্তার ধারে বসে পড়বে, হায় হায়, এ তো পশুর নদীর নোনা পানি! বলবে, প্রতিদিন কারখানার কাজে তারা পাইপ দিয়ে যে পানি নিয়ে যায় আবার কাজ সেরে নদীতেই ফিরিয়ে দেয়, এ তো সেই পানি; পাইপের জোড়াগুলো চাপ নিতে পারেনি, ফেটে বেরিয়ে আসছে। তুমি আরো এগোবে। কেউ আলের উপরে দাঁড়িয়ে তার ক্ষেতের ফসল তলিয়ে যাওয়া দেখবে, কেউ দেখবে বাড়ির পিছনের ছোটো পুকুর উপচে পড়ার দৃশ্য। ভেসে যাবার আগে জাল হাতে নিজের পুকুরের মাছ ধরে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে কোনো পরিবারের সদস্যরা। নোনা পানি এসে পড়ায় পুকুরের মাছের ঝাঁক এমনিতেই মরে ভেসে উঠবে খানিক পরে। তুমি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকবে। মানুষের দুর্দশা দেখতে দেখতে তোমার নিজের বাড়ির কথা ঘুণাক্ষরেরও মনে পড়বে না। কী হলো তোমার বেগুন কিংবা বাঁধাকপির ক্ষেতের, কী হলো তোমার বাড়ির পিছনের ছোটো ডোবার মতো পুকুরটার, তুমি ভুলে যাবে।

সারা গ্রাম দেখে যখন তুমি ফিরছ তখনও রাস্তায় সরু ¯্রােত। তবে তোমার পায়ের তলার পানি ক্রমশ গরম হতে থাকবে। লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে হবে একসময় তোমাকে; দেখবে পা পুড়ে যাচ্ছে, দেখবে গরম পানির বাষ্পে চারদিক মেঘের মতো ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার, পাইপের মধ্যে পানি গরম করল কে? তুমি ভাবতে থাকবে। তখন রাস্তার ধারের কোনো আলাপ থেকে জেনেও যাবে, পানি দিয়ে তারা জ্বালানো কয়লার বাষ্প ঠান্ডা করে তারপর উত্তপ্ত পানি আবার পাঠিয়ে দেয় পশুর নদীতে। সেই পানি নদীতে ফেরত যাবার আগেই তোমাদের গ্রাম সয়লাব হয়ে গেছে, তুমি বুঝতে পারবে। পানিতে তখন আর পা দেয়া যাবে না, যেন ফোসকা পড়ে যাবে। তুমি উঁচু একটা ঢিবির উপরে দাঁড়িয়ে চারদিকের মেঘ-বাষ্প দেখতে থাকবে, যেন বিশাল কড়াইয়ে কিছু চড়িয়েছে কেউ। নিশ্বাসে নোনা বাতাস হু হু করে ঢুকে যাবে তোমার নাকে। নাক দিয়ে পানি ঝরতে থাকবে, শরীর ঘেমে জবজবে হয়ে যাবে, ভ্যাপসা গরমে মনে হবে কেউ ফুটন্ত কড়াইটাতে এখনই ছাড়বে তোমাকে। এইসমস্ত ভাবনার মধ্যে হঠাৎ ঠিক মন নয়, যেন তোমার শরীর তোমাকে বলবে, আচ্ছা, প্রতিদিন এই উত্তপ্ত পানি গিয়ে যখন পশুর নদীতে পড়ে, তখন মাছদের কী হয়? দেশের দক্ষিণ দিকে সরকার প্রদত্ত একান্ন নম্বর নিয়ে বয়ে চলা নদীটার নীচে যে একান্নবর্তী পরিবার আছে, কী হয় তাদের?  কী হয় পানির নীচের হাজার শৈবাল আর জলজ গাছের? তাদের কি গা পুড়ে যায়? তাদের জ্বালাপোড়ার চিৎকার কি পানির নীচে গুমরে গুমরে প্রতিধ্বনিত হয়?

পাইপের পানিতে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মারা যাবার একটা খবর তুমি আগেই শুনে থাকবে। গ্রামের কেউ একদিন ফিসফিস করে বলে গিয়েছিল তোমাকে যে রাতের অন্ধকারে ট্রাকে করে মরা মাছ পাচার করা হয়েছে। কেউ জানতে পারেনি যে উত্তপ্ত পানি কত মাছকে মেরে ফেলেছিল একদিন। নদীতে পানি খেতে গিয়ে ছোটো কিছু প্রাণীও মরে প্রায়ই, তুমি ভালোমতোই শুনে থাকবে। ওখানে দাঁড়িয়ে সেইসব শোনা কথাকে নিজের দেখার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে থাকবে তুমি। তারপর বহুক্ষণ পরে পানির ¯্রােতকে কিছুটা ঠান্ডা মনে হলে বাড়ির পথে হাঁটা দেবে। তোমার বাড়ির উঠোন তখন নোনা পানির নীচে; গিয়ে দেখবে পুকুরের ছোটো ছোটো মৃত মাছ সেখানে পথের পাশে পড়ে থাকা হীরের মতো দুপুরের রোদে ঝিকমিক করছে।

কারখানার কোম্পানির লোকেরা পাইপ ফাটার খবর পেয়ে জিনসিপত্র জোগাড় করে আসতে আসতে এক মাস। জায়গামতো পাইপের ভাঙা অংশ জোড়া লাগিয়ে মেরামত শেষ করতে আরো মাসখানেক। আর ওই দু মাসে তোমাদের গ্রামের কোনো পুকুরে আর মিষ্টি পানির চিহ্নমাত্র থাকবে না। বাড়ির পিছনের পুকুরের চিৎ-সাঁতারের দুপুর তোমার অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে ততদিনে। পুকুরের পানি আর মুখে নেয়া যাবে না, গায়ে ছোঁয়ানো যাবে না। মাছ তো দূরের কথা, টিকটিকি পড়লেও মরে ভেসে থাকবে। গ্রামের কূয়োগুলোও তখন নোনা পানিতে থইথই। চারদিকে পানি আর পানি, কিন্তু খাবার জন্য এক ফোঁটা পানিও কোথাও পাবে না তুমি। উঁচু বারান্দায় বসে নকশী কাঁথার নকশা তোলাতেও আর মন বসবে না তোমার। ক্ষুধা-পিপাসায় সন্তানের বিরতিহীন কান্œা অসহ্য লাগবে। হতাশ হয়ে স্বামীর বাড়িতে ফেরত আসার অপেক্ষা করতে থাকবে। তিনি ফিরবেন, তবে একেকদিন একে খবর নিয়ে ফিরবেন। কোনোদিন জানাবেন তিন একর জমির ধান তলিয়ে যাবার খবর, কোনোদিন নোনা পানিতে জমির সমস্ত নারকেল আর শুপোরি গাছ মরে যাবার। তুমি কিছু বলবে না, তার কথায় যোগ করবে না যে বাড়ির চারদিকের কাঁঠাল গাছগুলোর সব পাতা ঝরে গেছে, তুমি দেখেছ তাদের মরে যাবার লক্ষণ।

পরের ঋতুতে নিজের জমির কোনো কাঁঠাল, কোনো নারকেল বা শুপোরি তোমার উঠোনে এসে জমা হবে না। সারা বাড়ি ফলের গন্ধে মউ মউ করবে না। উঁচু বারান্দায় বসে তুমি রোদে শুকোতে দেয়া ধানের উপর থেকে হুস হুস করে শালিক তাড়াবে না। শূন্য উঠোনে ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত হয়ে বসে থাকবে কেবল। জমি থেকে শুকনো খড়কুটো এনে নিয়মিত চুলো ধরাবে। কূয়োর ময়লা পানি ফুটিয়ে স্বচ্ছ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। ব্যর্থতায় তোমার চোখ ফেটে গাল বেয়ে অশ্রু গড়াবে। জিবে লাগলে দেখবে সে-ও তো সেই নোনা! নাক-চোখ মুছে ছাই মেশানো আর নোনা বাষ্প নাক দিয়ে টানতে টানতে তোমার যাবতীয় রাগ তখন গিয়ে পড়বে পৃথিবীর সব লবণের উপর। নিরুপায় হয়ে তুমি ভাবতে থাকবে বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবার কথা। আশেপাশের বহু মানুষ খাদ্যের আশায়, পানির খোঁজে ভিটেছাড়া হয়েছে সে কথা তুমি ততদিনে শুনে থাকবে। তুমি ভাববে যতদিন পার মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে। ফসলের অনুপস্থিতি, পানির অভাব, কিছুই তোমাকে ওই মানুষদের দলে ভিড়তে দিতে পারবে না যারা দল বেঁধে শহরের দিকে যাত্রা করছে, রাজধানীতে গিয়ে ভাসমান জীবন যাপন বেছে নিচ্ছে। অথচ সত্যি কথা হলো, তুমি এ-ও জানবে না যে পরের দিন সন্তানের মুখে কী তুলে দেবে, ছাই আর নোনা পানির মধ্যে তাকে কী করে বাঁচিয়ে রাখবে। কোনোদিন তোমার কানে আসবে দূরে কোনো গ্রামের কোনো কূয়ো কি কোনো পুকুরে তখনো স্বাদু পানি থাকার খবর, তুমি সম্বল কিছু মাটির কলস নিয়ে রোদ মাথায় করে সেদিকে হাঁটা দেবে। মাইল খানেক পেরিয়ে পানি ভরে নিয়ে ফিরবে বাড়িতে। কোনোদিন তোমার ইচ্ছে করবে সরু আর অবৈধ জাল দিয়ে নদীতে গিয়ে মাছ ধরতে। উঁচু বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে তুমি তখন নীতি আর দুর্নীতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে থাকবে। ভাববে রাতারাতি ওরকম একটা জাল বানিয়ে ফেলা তোমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়, চুপি চুপি নদীতে চলে যাওয়াও কঠিন নয়, কিন্তু সুযোগ থাকলেই কি তোমাকে অন্যায় করে বসতে হবে? আর তা ছাড়া, নদীতে তখনকার দিনে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না বলেও তুমি শুনে থাকবে। ভাবনার মাঝখানে তোমার লজ্জা করবে, গৃহস্থ ঘরের মেয়ে হয়ে তুমি ভিক্ষে বা চুরির কথা ভাবইবা কী করে! তুমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে। এই অবসরে তোমার বিপদ আরো ঘনিয়ে আসবে, চোখের সামনে সমস্ত জমি অনুর্বর হয়ে পড়বে, কাঁঠাল গাছগুলো আপাদমস্তক শুকনো খড়ির মতো মনে হবে। পেটের ক্ষুধায় নকশী কাঁথায় মনভোলানো ফুল তোলার কোনো মনই তোমার থাকবে না। দেখতে দেখতে বাজারে নিয়ে বিক্রি করার মতো সামান্য কিছুও থাকবে না তোমার কাছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে গিয়ে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে একদিন দূরের বন-জঙ্গলকে ছাইয়ে ঢাকা ধূসর ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবী বলে মনে হবে। বিকেলের পড়ে যাওয়া আলোর সঙ্গে ধোঁয়া মিশে ওদিকে সুন্দরী গাছদের নড়াচড়ার মতো চিরচেনা কিছুই চোখে পড়বে না তোমার। দেখবে তাদের চোখ-মুখ-অভিব্যক্তি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। নিজের চোখে প্রথম প্রেমিক মরে যাবার দৃশ্য দেখার মতো তোমার বুকের ভিতরে চিনচিন করবে। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তুমি বাড়ি ফিরে আসবে।

তীব্র হতাশায় দিনের পর দিন পার করতে করতে একদিন তোমার প্রবল কৌতূহল হবে তাকে দেখার, কে সেই দানব যার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা! তাই একদিন সত্যিই তুমি রওনা দেবে। বেশি দূর তো নয়, পৌঁছানোর অনেক আগেই দৈত্যের খাড়া নাকের দুটো ফুটোর মতো দুটো চিমনি তোমার চোখে পড়বে। দেখবে নাক দিয়ে বিরতিহীন ধোঁয়া বেরিয়ে আকাশের কাছে কোথাও মেঘ হয়ে যাওয়ার ছবি। দেখবে সমস্ত ধূসর মেঘ বাতাসে ভর করে তোমাদের গ্রামের দিকে পাঠানোর ষড়যন্ত্র। কাছে গেলে দেখবে চারদিকে রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি, উঁচু উঁচু সাজগোজ করা ইমারত আর পাঁচিল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই যেন হুট করে একটা শহরে এসে পড়েছ বলে মনে হবে তোমার। নিজের গায়ের ময়লা আর পুরোনো কাপড় খুব বেমানান লাগবে তখন। কালো কালো কয়লার পাহাড়ের ফাঁকফোকর গলে কাদা মাটি মাখানো ময়লা জন্তুর মতো এগিয়ে যেতে থাকবে তুমি। প্রবল কৌতূহল  তোমাকে পাঁচিলের ঘেরাটোপ পার করিয়ে নেবে। ভিতরে লাফ দিয়েই তুমি ছুটে যাবে চিমনি লক্ষ্য করে। কী যেন প্রচ- জিঘাংসা তোমার শরীরকে ক্রমশ টেনে নিয়ে যাবে। একখানে গিয়ে দেখবে অসম্ভব লম্বা একটা সরু রাস্তা, নীচে যেন চাকা লাগানো, তাই রাস্তা নিজেই বয়ে চলেছে। রাস্তাটা ক্রমাগত চলে যাচ্ছে অনেক দূরে তারপর উঁচুতে উঠে যাচ্ছে কোথাও তোমার দৃষ্টির বাইরে। রাস্তার উপরে কয়লার ছোটো-বড়ো চাক সাজানো। আরো কাছে যাবে তুমি যেন রাস্তাটাকে প্রায় স্পর্শ করতে পার। খুব কাছে যেতেই তোমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসবে। নিজের সমস্ত দুর্ভাগ্যের জন্য ওই রাস্তাটাকে দায়ী করতে ইচ্ছে করবে... কী করে নিয়ে যায় সে এত এত কয়লা দৈত্যের পেটের মধ্যে! চোখ মুছে যেই আবার ভালোমতো সামনে তাকাবে, দেখবে রাস্তাটার উপরে সেই কালো কুচকুচে কিম্ভুতকিমাকার মুখটা। নাহ্, একটা নয়, বরং অসংখ্য মুখ, একেবারে একইরকমের হাজার মুখ। মুখগুলোতে একইরকমের মুচকি হাসি। মনোযোগ দিয়ে দেখলে দেখবে, মুখগুলো চলে যাচ্ছে, তোমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেল্টের মতো চলমান রাস্তাটায় চেপে চলে যাচ্ছে, বলে যাচ্ছে যে তোমার কিছুই করার নেই এখন আর, বলে যাচ্ছে যে তোমার কোনো আকুতি কেউ শোনেনি।

দু’দিক থেকে লাঠি উঁচিয়ে দু’জন পাহারাদারকে এগিয়ে আসতে দেখবে তখন। নীচ থেকে উপরের দিকে চলমান রাস্তাটাকে দৃষ্টি দিয়ে অনুসরণ করতে গিয়ে মাথার উপরের গনগনে সূর্যটা হুমকির লতো লাগবে তোমার। ক্ষুধা আর পিপাসায় জর্জরিত শরীরটা হঠাৎ পাক খেয়ে পড়ে যাবে মাটিতে। কয়লা বয়ে নেয়া চলন্ত রাস্তাটাকে ধরে কোনোরকমে ওঠার চেষ্টা করবে। অথচ সেই অসংখ্য মুখ যেন একযোগে ভেংচি কেটে তোমাকে আবারো মাটিতে ফেলে দেবে। ভয়ানক দুর্বলতায় তখন পালটা একটা ভেংচি কাটার শক্তিও তোমার নেই। চোখ বুজে আসার আগমুহূর্তে তোমার দিকে ছুটে আসা লোকদুটির চিৎকার কানে আসবে। তাদের কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারার আগেই গভীর ঘুমের মতো অবসন্নতায় তুমি তলিয়ে যাবে। বুক ভরে শ্বাস নিতে চাওয়ার চেষ্টার মাঝখানে তাদের কথা ছাপিয়ে কেন যেন সেই কালো মুখের সতর্কবাণী তোমার কানে বাজতে থাকবে, ‘কেউ নিশ্বাস নিতে পারবে না, কেউ না।’     
...............................................................             

 

    

 

  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা