শিকার

অাশানুর রহমান খোকন

টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে যেন সব কিছু ডুবে গেলো। খাল-বিল, ক্ষেত-খামার কিছুই বাদ গেলো না। পুকুরের পানি পাড় ছুঁই ছুঁই করছে। সকাল বেলা রাশেদের বাবা কাজের ছেলে শহিদুলকে নিয়ে পুকুর থেকে ছোট একটি নালা বের করে দিলো স্কুলের মাঠের দিকে। পুকুরের মাছ যাতে বের হয়ে যেতে না পারে সেজন্য অবশ্য চিকন করে বোনা বাঁশের জালি নালার মুখে দিয়ে দিল। পুকুরের মাছের মধ্যে কই মাছগুলো বোধ হয় সবচেয়ে বোকা। অন্তত: রাশেদের তেমনটিই মনে হয়। বৃষ্টি শুরু হলেই কই মাছগুলো নিজের কানকে'তে ভর দিয়ে উপরে উঠে আসে। পুকুরের কই মাছগুলো তখনও বড্ড ছোট। সারা সকাল রাশেদ ও কাজের ছেলে অলি সেই কই মাছ ধরেছে। মা অবশ্য বড় পানির গামলাতে মাছগুলো রাখতে বলেছে। পরে এগুলো আবার পুকুরে ছেড়ে দেয়া হবে। এই বর্ষার দিনগুলো রাশেদের খুব ভাল লাগে। স্কুলে যেতে হয় না। কেউ ছুটি দেয় না, কোন ঘোষণাও থাকে না, কিন্তু স্কুল আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম প্রথম দু/একদিন হেড স্যার ও দপ্তরী কাশেম বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাড়িয়ে স্কুলে আসে। স্কুলের কাছা-কাছি বাড়ীগুলোর ছাত্র-ছাত্রীরাও কেউ কেউ আসে। অন্য শিক্ষকরা তেমন একটা আসে না বললেই চলে। রাস্তা-ঘাট একেবারে ডুবে গেলে তারাও আসা বন্ধ করে। আবার বৃষ্টি কমলে এক সময় স্কুল খোলে। 

দেশ স্বাধীন হয়েছে তিন বছর।  এবার স্কুল খুললে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হবে। গত বছর রাশেদ রবীন্দ্রনাথের 'দুই বিঘা' আবৃত্তি করে প্রথম পুরষ্কার পেয়েছিল। আলম ভাই কবিতাটি ঠিক করে দিয়েছিলেন। রাশেদ দেখে দেখে পড়তে চেয়েছিল, আলম ভাই বলেছিল কবিতাটি মুখস্ত করে ফেলতে। মন থেকে আবৃত্তিটি করলে সেটা ভাল হবে। রাশেদ তাই করেছিল। সে যখন আবৃত্তি করছিল, 'উপেনে'র কষ্টটুকু যেন তার বুকের ভিতর থেকে উঠে আসছিল। আলম ভাই খুব খুশী হয়েছিলেন। আলম, রাশেদের ফুপাতো ভাই। তাদের বাড়ী থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে যশোর বোর্ডে মেধা তালিকায় সপ্তম হয়েছিল। তাদের গ্রাম তো বটেই এই এলাকায় এমন ভাল রেজাল্ট আর কেউ করেনি। আলম ভাই গত বছর যশোর এম এম কলেজে ভর্তি হয়েছে। কলেজ ছুটি হলে বা অনেক সময় বৃহস্পতিবার সন্ধা নাগাদ আলম ভাই যশোর থেকে চলে আসে। রাশেদের ফুপা গরীব বলে আলম ভাইয়ের সব দায়িত্ব তার বাবাই নিয়েছেন। কাজের ছেলে অলি অবশ্য বলে অন্য কথা। শুনে রাশেদের এমন গা-জ্বালা করে যে মনে হয় অলির গলা টিপে ধরে। অলি বলে, 'তোর বাপ মেয়ের জন্য জামাই মানুষ করছে'। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়। রাশেদের বোন সালমা এবার ক্লাস টেনে পড়ে। মায়ের খুব ইচ্ছে সালমার সাথে আলম ভাইয়ের বিয়ে হয়। কিন্তু মা সে কথা বাবাকে বলতে পারে না। ভয় পাই। বাবাকে সবাই ভয় পাই। এমন কি আলম ভাইও। কিন্তু রাশেদ জানে যে আলম ভাই নিয়ম করে সালমা বু'কে চিঠি লেখে। যশোর থেকে প্রতি সপ্তাহে রাশেদের নামে চিঠি আসে। বাজারের দিন পিয়ন ইদ্রিস চাচার কাছ থেকে সে নিজেই চিঠি নিয়ে আসে। রাশেদ জানে খামের ভিতর কি আছে। একটি সুন্দর 'ভিউ কার্ড' রাশেদের জন্য। আর সুন্দর একটি প্যাডে পিন আপ করা একটি চিঠি। সেটা সালমা আপার জন্য। সালমা আপাই তাকে প্রথম কথাটা বলেছিল। আর এটাও বলেছিল ছোট ভাই হিসাবে বোনের জন্য সে কাজটি করবে কিনা। সালমা বু কি জানে, রাশেদ তার বোনের জন্য জীবনও দিতে পারে। আর এতো সামান্য ব্যপার! প্রথম প্রথম ভয় করতো। চিঠি যদি বাবার হাতে পড়ে বা বাবা যদি খুলে পড়ে। বাবার হাতেও ইদ্রিস চাচা চিঠি দিয়েছে। বাবা কখনো খোলেনি। খামের উপরে বাম দিকে লেখা থাকতো 'আলম, যশোর'। হয়তো আলম ভাইয়ের চিঠি বলেই বাবা কিছু বলতেন না। গত মাসে আলম ভাই যখন এসেছিল রাশেদ জানতে চেয়েছিল এবার সে কোন কবিতাটি আবৃতি করবে। সালমা বু বলেছিল রবীন্দ্রনাথের 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' আবৃতি করতে। এক সময় এই কবিতাটি আলম ভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল।কিন্তু আলম ভাই রাজী তো হলেনই না উল্টো রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কি সব বললেন। রাশেদ সব বোঝেও নি। শুধু মনে আছে আলম ভাই বলেছিলেন, 'রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি। রবীন্দ্রনাথ বাদ। এখন থেকে নজরুল বা সুকান্তের কবিতা আবৃতি করবি। এরাই সর্বহারা শ্রেণীর কবি। আর রবীন্দ্রনাথ সর্বহারাদের শ্রেণীশত্রু'। সব শুনে সালমা বুু বলেছিল, 'আপনিও কি রমজান স্যারের মতো নকশালে নাম লিখিয়েছেন?' শুনে আলম ভাই শুধু হেসেছিলেন।

রাশেদ ঐ সব শব্দ আগে কখনো শোনেনি। 'বুর্জোয়া' শব্দের অর্থ তার জানা নেই। আলম ভাইকেও জিজ্ঞাসা করা হইনি। 'সর্বহারা শ্রেণী', 'শ্রেণী শত্রু' এসব শব্দ রাশেদের কাছে একেবারেই নতুন। নকশালই বা কি?

রাশেদ ভাবে 'বুর্জোয়া' মানে নিশ্চয় খারাপ কিছু হবে। তা না হলে আলম ভাই বলবেন কেন? কিন্তু রবীন্দ্রনাথ লোকটা কি আসলেই খারাপ? তার লেখা অনেক কবিতাই তো রাশেদের মুখস্ত। গতবছরই তো আলম ভাই তাকে 'সঞ্চয়িতা' উপহার দিয়েছিল। 'ডাকঘর' পড়ার পরে রাশেদের নিজেকে মনে হতো 'অমল'। 'পোষ্টমাষ্টার' পড়ে সে সারারাত কেঁদেছিল। অথচ কি এমন হলো এক বছরে, যে আলম ভাই রবীন্দ্রনাথকে সহ্যই করতে পারেন না। ক্লাস সেভেনে পড়া রাশেদ এত কিছু জানে না। আলম ভাই যখন বলেছে রবীন্দ্রনাথ 'বুর্জোয়া' তার মানে লোকটি নিশ্চয় খারাপ! রাশেদ সেটাই মেনে নিয়েছে। আলম ভাই তাকে নজরুলের 'সঞ্চিতা' দিয়ে গেছে। আর সেখান থেকে 'মানুষ' কবিতাটি মুখস্ত করতে বলে গেছেন। রাশেদ গত কয়েকদিনে 'মানুষ' কবিতাটি মুখস্থ করে ফেলেছে। আলম ভাই বাড়ী এলে তাকে শুনাতে হবে। আবৃতির টেকনিকটাও আলম ভাই শিখিয়ে দেবেন বলেছেন। এ সপ্তাহেই তো আসার কথা। সালমা বু'কে সে জিজ্ঞেস করেছিল। গত বিষ্যুদবার আসার কথা। আজ শনিবার। বর্ষার কারণে হয়তো আসতে পারছেন না। গতকাল রাতে সে সালমা বু'কে জিজ্ঞেস করেছিল। সালমা বু'কে কি একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল? দিন দশেক আগে কারা যেন দূর্গাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে সন্ধাবেলা, বৈঠকখানায় একদল মানুষের সামনে গুলি করে মেরে ফেলে। পরেরদিন রক্ষীবাহিনীর একটি গাড়ী এসে মারতে মারতে আধমরা অবস্থায় রমজান স্যারকে ধরে নিয়ে যায়। সেই গাড়ীর পিছন পিছন দৌঁড়াচ্ছিল হামিদ পাগলা। রক্ষীবাহিনী হামিদের পায়ে গুলি করেছিল।

দুপুরের পরে বৃষ্টি একটু ধরে এলে, অলি রাশেদকে বলে, ' চল, আজকে 'ঘুনি'* পেতে আসি'। বিকাল বেলা চারটি 'ঘুনি' নিয়ে রাশেদ ও অলি বাড়ীর পিছনের স্কুলের মাঠটি পেরিয়ে ধান ক্ষেতের দিকে যেতে থাকে। পানি ধানের ডগা ছোঁয় ছোঁয় অবস্থা। ক্ষেতের 'আল'** ঠাহর করা যায় না। কিছুটা আন্দাজে তারা আল বরাবর হাঁটতে থাকে। মাঝে মাঝে পা বেলাইনে পড়লে মুখ থুবড়ে পানির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। অলি ও সে আন্দাজে তাদের ক্ষেতের 'আল' দেখে কিছুটা দূরত্বে 'ঘুনি'গুলো পেতে রাখে। আলের নীচ থেকে কিছুটা এটেল মাটি নিয়ে 'ঘুনি'র দু'পাশে দিয়ে দেয়, যাতে সেটা আটকে থাকে। স্রোতের পানিতে 'ঘুনি'গুলো যেন ভেসে না যায়। কি মনে করে অলি আবার ধানের পাতা দিয়ে 'ঘুনি'র উপরের ধরার জায়গাটায় একটি গিট্টু দেয়। রাশেদকে বলে, 'দেখিস, আর তোড়ে ভেসে যাবে না। মনে হচ্ছে কাল সকালে 'ঘুনি' ভরে যাবে'। 'ঘুনি' যে সবসময় স্রোতে ভাসে তা নয়, অনেক সময় বড় মাছের ঝাঁক এলে 'ঘুনি' ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। 'ঘুনি' পাতা শেষে তারা ফিরে আসে। রাতে সালমা বু'র সাথে সে গল্প করার চেষ্টা করে কিন্তু জমে না। ইদার্নিং সালমা বু'কে বেশ চিন্তিত দেখায়। সালমা বু'র দুশ্চিন্তা কি আলম ভাইকে নিয়ে। কেন? রাতে হালকা একটু বৃষ্টি হলো। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে রাশেদ এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।

তখনও বেলা ওঠেনি। অলি এসে রাশেদকে ডাকতে থাকে। ঘুনি তুলতে যেতে হবে। সেই ভোরের আলোয় রাশেদ ও অলি 'আল' বরাবর যেতে থাকে। এর মধ্যে রাশেদ পা ফসকে দু'বার পড়তে গেছে। ঘুনিগুলো মাছে প্রায় ভরে গেছে। পুটি, ট্যাংরা, খোলসে, ছোট চিংড়ি এই সব। রাশেদ ও অলি প্রচন্ড খুশী মনে দু'হাতে একটা করে ঘুনি ধরে বাড়ী ফিরতে থাকে। ততক্ষণে সূর্য উঠতে শুরু করেছে। ক্ষেতগুলো পেরিয়ে স্কুলের পিছন দিয়ে বাঁশ বাগানের পাশে কবর খানার কাছাকাছি অাসতেই রাশেদের জিনিষটি প্রথম চোখে পড়ে। রাশেদ দেখে বাঁশ ঝাড়ের গোড়ায় পানি উপরে চুল ভেসে আছে। প্রথমে ভেবেছিল, বাঁশের মুলিতে লম্বা চুলের আশায় বেঁধে যাওয়া কোন মেয়ের চুল। একটু কাছে এগিয়ে গেলে দেখতে পায় একটি মানুষের কাটা মুন্ডু, ধড়টা মাথা থেকে আলাদা করা। ধড়টা পড়ে আছে কয়েক হাত দূরে। রক্ত পানিতে মিশে যেন রক্তের স্রোত তৈরী হয়েছে। রাশেদের রক্ত হিম হয়ে যায়। কাছে গিয়ে দেখার সাহস হারিয়ে ফেলে। গায়ের লোমগুলো কাটা দিয়ে ওঠে। অলি এগিয়ে এসে রাশেদের পাশে দাঁড়াতেই, তারও চোখ পড়ে। 'ও, মাগো' বলে অলি ধপ করে পানি-কাঁদার মধ্যে বসে পড়ে। একদিকে প্রচন্ড ভয়, অন্যদিকে কৌতুহল মেটাতে রাশেদ এগিয়ে যায়। রাশেদের পায়ের পানির হালকা ঢেউয়ে কাটা মুন্ডুটার মুখের উপর থেকে চুল সরে যেতেই রাশেদ 'আল্লাগো' বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। রাশেদের চিৎকারে অলি পড়ি মরি করে কাছে ছুটে আসে। রাশেদ আলম ভাইয়ের কাটা মুন্ডুটি চিনতে পেরে পানির মধ্যেই ধপাস করে বসে পড়ে। অলি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। কতক্ষণ রাশেদ এভাবে বসে ছিল জানে না। হঠাৎ রাশেদ দেখে রক্ত মেশা পানির উপরে হলুদ রঙের একটি খাম ভাসছে। সে খপ করে খামটি ধরে ফেলে। খামটি ভিজে জব জব করছে। খামটি উল্টে দেখে ডানদিকে তার নাম ও ঠিকানা লেখা আর বামদিকে লেখা 'আলম, যশোর'। কিন্তু পোষ্ট অফিসের কোন ছাপ নেই। তখম রাশেদের যেন হুশ ফিরে এলো। খামটি হাতের মুঠোই ধরে সে বাড়ীর দিকে ছুটতে শুরু করে। 

সালমা বু'কে এক্ষুনি খবরটি দিতে হবে!

------------------------------------

*ঘুনি- বাঁশ দিয়ে তৈরী, যা মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়।

**আল-দুটি দাগ বা পাশাপাশি ক্ষেতকে আলাদা করে এমন সরু উচু অংশ।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা