অনেক দিন আগের কথা

আফসানা বেগম

মূল গল্প : নাদিন গোর্ডিমার

এক পাঠক লিখে জানিয়েছেন যে বাচ্চাদের জন্য দু’একটা গল্প লিখে শিশুসাহিত্যে আমার কিছু অবদান রাখা উচিত। তাকে জানিয়েছিলাম যে আমি ছোটদের গল্প লিখি না; তারপর আবার আরেকটা চিঠিতে তিনি লিখেছেন যে কদিন আগে এক সভা-সমিতি নাকি বইমেলায় একজন ঔপন্যাসিক বলেছেন, প্রত্যেক লেখককে শিশুদের জন্য অন্তত একটি গল্প লিখতেই হবে। ইচ্ছে করে পোস্টকার্ডে লিখে তাকে জানাই যে আমাকে কিছু ’লিখতেই হবে’ তা আমি কিছুতে মানতে পারি না।

আর তারপর কাল রাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। হয়ত কেউ আমাকে জাগিয়ে দিল অথচ কে- বুঝতে পারলাম না।

একটি কণ্ঠস্বর কি আমার অবচেতন মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল?

কোনো একটি আওয়াজ?

মনে হলো কাঠের মেঝের উপরে যেন ধীর অথচ একটির পর একটি পা ফেলার তীক্ষè শব্দ! আমি শুনে যেতে লাগলাম। গভীর মনোযোগ দিয়ে কান খাড়া করে রাখলাম। আবার পা ফেলার শব্দ। থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুন করে শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, পায়ের শব্দটি কি এঘর ওঘর ঘুরে শেষে আমার দরজার দিকেই এগোচ্ছে? আমার জানালায় শক্ত শিক নেই, বালিশের নিচে কোনো বন্দুক নেই কিন্তু যারা ভয় পায় বলে এসবের ব্যবস্থা রাখে, আমিও তাদের মতোই ভয়ে মরি। আর আমার জানালার কাঁচ ছোট্ট ছড়ার মতো হালকা যেন সামান্য ধাক্কাতেই ভেঙে যাবেÑ চুরচুর হয়ে ওয়াইন গ্লাসের মতো ঝরে পড়বে। গত বছর আমার বাসার থেকে দুটো ব্লক পরে এক বাসায় দিনেদুপুরে এক মহিলা খুন হয়েছেন। (দেশে কি কোনো আইনকানুন আছে!) একাকী বিধবা মহিলাকে আর তার প্রাচীন ঘড়ির সংগ্রহ যে কুকুরগুলো পাহারা দিত তাদেরও গলা টিপে মেরে ফেলা হয়। মাঝে মাঝে বাসায় কাজ করতে আসত এরকম একজন লোককে বেতন না দিয়ে বিদায় করে দিয়েছিলেন বলে সে মহিলাকে ছুরি মারে।

আমি দরজার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেলেও নিজের মনে কত দৃশ্য ভেবে নিচ্ছিলাম! পাথর হয়ে পড়ে ছিলাম, ততক্ষণে নিজেকে অসহায় একটি শিকারও ভাবতে শুরু করে দিয়েছি। আমার হৃদয়ের তালের ছন্দ এই বুঝি থেমে যায় যায়! ছন্দটি শরীরের খাঁচার ভেতরে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে ধাক্কা দিচ্ছিল। নির্ঘুম আর ক্লান্তিহীন আমি সমস্ত ইন্দ্রিয়কে টানটান সজাগ করে রেখেছিলাম। দিনের হট্টগোলে কখনো এত পরিষ্কার করে কিছু শুনতে পাই না। অথচ তখন প্রতিটি সূক্ষ্ম শব্দ কল্পনা করে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আচ্ছা, এমন একটা শব্দে আততায়ী ঠিক কী করতে পারে?

কিন্তু কিছু পরে বুঝতে পারলাম, আমাকে কেউ হুমকি দেয়নি, মেরে ফেলতেও আসেনি। মেঝের কাঠের টুকরোগুলোর উপরে কারো পাড়া পড়েনি। যে কড়মড় আওয়াজটা আমাকে পেয়ে বসেছিল তা আসলে অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফসল। আমার চিন্তার ভেতরেই শব্দটা বাজছিল। যে বাড়িটার ভেতরে ঘুমিয়ে আছি তার নিচের মাটিটা ফাঁপা। বিছানার নিচে মেঝে, তার নিচে বাসার ভিত্তি, আর তারও নিচে পাথরের গায়ে সুরঙ্গ করে সোনার খনিতে যাওয়ার রাস্তা। কখনো যখন কোনো শ্রমিকের পা কেঁপে ওঠে, আঁকড়ে রাখা হাত ছুটে গেলে ভয়ার্ত মুখ নিয়ে সে পড়ে যায় তিনহাজার ফুট নিচে। তখন তার আর্তনাদে পুরো বাসাটা কেঁপে ওঠে। আমাকে ঘিরে থাকা ইট, সিমেন্ট, কাঠ আর কাচের তৈরি ইমারতটি তখন একটু নড়েচড়ে বিশ্রী একটা দাগ নিয়ে আবারও দাঁড়িয়ে থাকে। চোপি আর সঙ্গা খনি শ্রমিকেরা যে জাইলোফোন বানায় তার থেমে থেমে বাজা সুরের মূর্ছনায় আমার থমকে যাওয়া হৃদকম্পন আবার চলতে শুরু করে। এ বাড়ির মেঝে থেকে আরও অনেক নীচে যেখানে ঝরনার ঝুলে যাওয়া সরু ধারা থেকে অবিরাম পানি পড়ে পড়ে জমে থাকে, তার পাশে গভীর বেদনায় হতভাগ্যদের জন্য সমাধি সাজানো হয়।

এই সমস্ত ভাবনা মাথায় আসার পর কিছুতেই আর নিজেকে ভুলিয়েভালিয়ে ঘুম পাড়ানো গেল না। তাই কী আর করা, নিজেই নিজেকে একটা ঘুমপাড়ানি গল্প বলতে শুরু করলাম।

কোনো এক শহরতলিতে এক বাসায় এক লোক আর তার বউ সুখেশান্তিতে বাস করছিল। তারা দু’জন দু’জনকে খুব ভালোবাসত। তাদের ছিল একটা ছোট্ট ছেলে যাকে দু’জন খুব আদর করত। ছোট্ট ছেলেটির খুব আদরের একটা কুকুর আর একটা বিড়াল ছিল। তাদের একটা গাড়ি ছিল আর ছুটিতে যাওয়ার জন্য ছিল ক্যারাভ্যান। বাসার সাঁতার কাটার পুলটি ছিল ঘেরা দেয়া যেন ছোট্ট ছেলেটি আর তার খেলার বন্ধুরা কেউ পড়ে ডুবে না যায়। বাসার কাজের মহিলাটি ছিল খুব বিশ্বাসী আর বাগানের মালিটিকে প্রতিবেশীরা সবাই পছন্দ করত। এরকম নিরবিচ্ছিন্ন সুখের জীবনের মধ্যে হঠাৎ বিপদ ঘনিয়ে এল। লোকটির মা অভিজ্ঞ এবং বুদ্ধিমতী হওয়ার কারণে তিনিই প্রথম বুঝতে পারলেন; বলতে লাগলেন, এ সময়ে রাস্তার যাকে তাকে বাসায় এনো না। পরিবারটি এমন এক সমাজে বাস করে যেখানে স্বাস্থ্য সুবিধা সুরক্ষিত, পোষা কুকুর-বিড়ালের লাইসেন্স আছে, বাসায় আগুন লাগলে বা চুরি হলে এমনকি বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হলে তার জন্যও বীমা করা আছে। এলাকার দেখাশোনা করার কর্তৃপক্ষের সাথেও তাদের যোগাযোগ আছে যারা তাদের গেটের বাইরে একটা বোর্ড লাগিয়ে দিয়ে গেছে। হঠাৎ বাসায় কেউ ঢুকে পড়তে পারে ভেবে আগেভাগেই তাতে লিখে রেখেছে ’প্রবেশ নিষেধ’। অনধিকার বাসায় প্রবেশ করবে এমন কারো কল্পিত ছায়াচিত্রের উপরে সাবধান বাণীটি লেখা। বোর্ডে ছবির মানুষটির সারা শরীর ঢাকা। তাই সে কৃষ্ণাঙ্গ না শেতাঙ্গ বোঝার উপায় নেই। এটাই প্রমাণ করে যে বাসার মালিক কারও পক্ষের লোক ছিল না।

বাসা, সাঁতারের পুল অথবা গাড়ি, এসবে রায়টের সময় ঘটে যাওয়া ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য বীমা করার নিয়ম ছিল না। তখন রায়ট শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তারা থাকত শহরের বাইরে যেখানে কালো-সাদা সবরকম মানুষই ছিল। লোকটি বউকে বারবার বোঝাচ্ছিল, যেহেতু এই এলাকায় বাসার কাজের লোক আর মালি ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে পারে না তাই এখানে সেরকম কোনো ভয় নেই। তবুও বউটি ভয় পেত। ভাবত কোনোদিন হয়ত সেরকম কিছু লোক এসে পড়তে পারে যারা বাসার সামনের ’প্রবেশ নিষেধ’ নেটিসটি ছিঁড়ে ফেলে হুড়মুড় করে ভেতরে চলে আসবে..... লোকটি যেহেতু বউকে খুব ভালোবাসত তাই তাকে শান্ত করার খুব চেষ্টা করত, ওহ্ লক্ষ্মীটি, এসব তুমি কী বলছ? তাদের বাঁধা দেয়ার জন্য বাইরে পুলিশ, সৈন্য, টিয়ার গ্যাস আর বন্দুক আছে না? আসল ঘটনা লোকটি জানত। শহরতলিতে যেখানে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রিত গেট ছিল সেখানে বাস পোড়ানো হয়েছে, গাড়িকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়া হয়েছে, কাছেই কোয়ার্টারে এক স্কুলের ছাত্রকে পুলিশ গুলি করেছে- কোনো কিছুই তার অজানা ছিল না। কেউ যদি গেট খুলতে চেষ্টা করে তো তাকে প্রথমে একটি ছোট বোতাম টিপে বাড়িতে ঢোকার উদ্দেশ্য বলতে হবে যেটা সরাসরি বাসার ভিতরে শোনা যাবে। বাসার ছোট্ট ছেলেটি এই মেশিনটি খুব পছন্দ করত। সে তার বন্ধুদের সাথে এটা দিয়ে খুব মজা করে চোর-পুলিশ খেলত।

পুলিশ দিয়ে জবরদস্তি রায়ট ঠেকানো হলো। কিন্তু শহরের আশেপাশে চুরি-ডাকাতি খুব বেড়ে গেল। একজনের খুব বিশ্বাসী কাজের মেয়েকে একা বাসায় পেয়ে, বেঁধে আলমারির মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হলো। এই ঘটনায় লোকটির বাসার কাজের মেয়েটি এমন আঘাত পায় যেন তার মনে হয় সেই হতভাগ্য মেয়েটি সে নিজে। এমন ঘটনা এখানে হলে, কী করে সে তার মনিব, তার বউ আর বাচ্চাকে বাঁচাবে? তাই সে লোকটিকে দরজা-জানালায় শিক আর বাইরে এলার্ম লাগাতে অনুরোধ করল। বউ সাথে সাথে বলল, ও তো ঠিকই বলছে, চল আমরা দরজা-জানালায় শিক লাগিয়ে ফেলি। তাই যে বাসায় সবাই চিরকাল সুখে-শান্তিতে বাস করছিল, তারপর থেকে তারা সেই বাসার দরজা-জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে গাছপালা আর আকাশ দেখত। ছোট ছেলেটির পোষা বিড়ালটি রাতে তার বিছানার ওমে ঘুমানোর জন্য অর্ধবৃত্তাকার জানালা গলে যেই ভেতরে ঢুকত, সাথে সাথে তীব্র শব্দে এলার্ম বেজে বাসাসুদ্ধ সবাইকে জাগিয়ে তুলত।

এলার্মটি আবার মাঝে মাঝে আশেপাশের বাসার অন্যান্য এলার্মের বেজে ওঠাতেও একযোগে বাজতে শুরু করত, প্রশ্নোত্তরের মতো। প্রথম অ্যালার্ম বাজার পরে যে এলার্মটি উত্তর দিত, সে-ও বাজত কোনো পোষা বিড়াল বা অসহায় ইঁদুরের ছুটোছুটিতে। এভাবে বাগানের এধারে-ওধারে এক এলার্ম আরেক এলার্মকে ডেকে ওঠাত তারপর তারস্বরে একপাল গরু-ছাগলের মতো গোঙাত। আশেপাশের মানুষেরা রাতবিরাতে প্রচ- শব্দে বারবার ঘুম থেকে জেগে উঠতে উঠতে কিছুদিনের মধ্যেই অভ্যস্থ হয়ে গেল; যেন ব্যাঙের কর্কশ ডাক অথবা একটানা ঝিঁঝির ডাক শুনছে। এলার্মের শব্দ যখন সবার গা-সহা হয়ে গেল সেই সুযোগে ডাকাতরা মানুষের বাসার শিক কেটে ঢুকে যেত। তারা দামি জিনিসপত্র, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, ক্যামেরা, রেডিও, গয়না, জামাকাপড় সব নিয়ে যেতে লাগল। আবার মাঝে মাঝে বেশি ক্ষিদে পেলে তারা ফ্রিজের সবকিছু সাবাড় করত বা ক্যাবিনেট থেকে নিয়ে হুইস্কি খেতে খেতে একটু জিরিয়ে নিত। বাসার মালিকদের দুঃখটা দ্বিগুণ হতো, একে তো পানীয় খেয়েও কেউ ধন্যবাদ বলছে না, তার উপর বীমা কোম্পানি পানীয়গুলোর জন্য এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ দেয়না।

তারপর একসময় বাসার সামনে ভীড় লেগে থাকত। যেসব কাজের লোক আর মালিকে বিভিন্ন বাসা থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়েছে তারা খামাখা জায়গাটির এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করত। কেউ কেউ এসে আগাছা পরিষ্কার বা দেয়াল রঙ করা, এটাসেটা যে কোনো একটা কাজের জন্য মরিয়া হয়ে অনুরোধ করত। কিন্তু লোকটি আর তার বউ মায়ের সেই সাবধানবাণী ভোলেনি যে অচেনা কাউকে বাসায় জায়গা দেয়া যাবে না। রাস্তার লোকগুলো লিকার খেয়ে বোতলটা অসভ্যের মতো তাদের বাসার সামনে রাস্তায় ফেলে চলে যেত। কেউ কেউ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে লোকটি বা তার বউ যদি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে আসে সেই অপেক্ষায় থাকত। রাস্তার দু’পাশে জাকারান্দা গাছ বেড়ে উঠে যে টানেলের মতো হয়ে আছে তার নিচে বৃষ্টির পানি যাওয়ার ড্রেনের পাশে পা ঝুলিয়ে তারা বসে থাকত। এমনকি ঠিক মাঝদুপুরে গেটের সামনে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাত। এত সুন্দর একটা শহরতলি তাদের যাচ্ছেতাই কাজকর্মে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে কেউ না খেয়ে থাকবে লোকটির বউ একদম সহ্য করতে পারত না। তাই বাসার বিশ্বাসী কাজের মেয়েটিকে তাদের কিছু রুটি আর চা দিয়ে আসতে বলত। কিন্তু কাজের মেয়েটি সাবধান করত যে ওরা খুব খারাপ আর সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে কখন বাসায় ঢুকে তাকে বেঁধে আলমারিতে ঢুকিয়ে ফেলবে। লোকটি তার সাথে গলা মিলিয়ে বলল, ঠিকই তো, এভাবে খাবার-দাবার পাঠালে তারা সবসময় এখানেই পড়ে থাকবে; আর আমারও মনে হয় তারা এখানে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে.....যদিও বাসাটি ভারী ভারী তালা, এলার্ম আর বৈদ্যুতিক গেট দিয়ে পুরোপুরি সুরক্ষিত তবু লোকটি প্রতিরাতে বাগান থেকে বাচ্চার সাইকেলটি ভেতরে এনে ঢুকিয়ে রাখে। কারণ তার মনে হয় কেউ হয়ত পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকে পড়তে পারে।

বউটি শেষে বলে, ঠিকই বলেছ, আমাদের পাঁচিলটা আরও উঁচু করে ফেলা দরকার। লোকটির মা বুদ্ধিমতী তাই ছেলে আর ছেলের বউকে বড়দিনের উপহার হিসেবে দেয়াল উঁচু করার খরচটা দিয়ে দেন। ছোট বাচ্চাটি অবশ্য দাদির কাছে পায় মহাকাশযাত্রীর পোষাক আর একটি রূপকথার গল্পের বই।

প্রতি সপ্তাহে মানুষের বাসা-বাড়িতে হামলার নতুন নতুন খবর আসতে লাগল। দিনেদুপুরে, কী রাতের অন্ধকারে এমনকি ভোরবেলা, এরকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটতেই থাকল। এইতো সেদিন সন্ধ্যার দিকে এক লোক আর তার বউ নীচের তলায় বসে খাবার খাচ্ছিল আর উপরের তলায় শোবার ঘরে মানুষ জিনিসপত্র সাফ করছিল। খেতে খেতে তারা ইদানীং শোনা একটা ডাকাতির ঘটনা বলাবলি করছিল। হঠাৎ দেখে তাদের পোষা বিড়ালটি কীভাবে যেন সামনের সাতফুট উঁচু দেয়ালের উপরে ধপ করে পড়ল। নখগুলো চারদিকে শক্ত করে ছড়িয়ে প্রথমে পাঁচিলের উপর কোনোরকমে দাঁড়াল আর পরপরই দেয়াল থেকে হুড়মুড় করে নীচে বাগানে লাফিয়ে পড়ে লেজ উঁচু করে পালিয়ে গেল। চোখের সামনে বিড়ালের পায়ের আঁচড়ে সাদা দেয়ালে বিশ্রী দাগ বসে গেল। আর তাদের অজান্তে দেয়ালের ওপাশে ভাঙাচোরা জুতার কতকগুলো কাদামাখা ছাপ পড়েছে। এ ধরণের জুতা অলসভাবে এখানে ওখানে শুয়ে-বসে থাকা মানুষগুলোর পায়েই দেখা যায়। কিন্তু যাদের পায়ের ছাপ দেয়ালে পড়েছে তারা ততক্ষণে পগারপার।

বিকেলে লোকটি, তার বউ আর ছোট ছেলেটি কুকুরকে নিয়ে যখন একটু হাঁটতে বের হয়, সুন্দর বাগান বা চমৎকার গোলাপের প্রশংসা করার জন্য আগের মতো এর-ওর বাসার সামনে আর দাঁড়ায় না; আশেপাশের বাড়ির বাগানগুলো পাঁচিল, উঁচু দেয়াল আর অসংখ্য নিরাপত্তা ব্যাবস্থার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ঘুরতে ঘুরতে নিজেদের বাসায় নিরাপত্তার জন্য করা যায় এমন পছন্দসই আরও একটা উপায় তারা পেয়ে যায়। দেয়ালের উপরে সিমেন্ট দিয়ে বসানো সস্তা কাঁচের টুকরো আর কোণার দিকে লোহার গ্রিলÑ স্প্যানিশ ভিলার আদলে তৈরি করা, জেলখানার চিরচেনা বৈশিষ্ট্য যেন আবার ফিরে এসেছে। গ্রিলের তিরগুলো গোলাপি আর দেয়ালটা সাদা, তার ওপর আঁকাবাঁকা করে বিভিন্ন রঙের কাঁচের টুকরো বসানো, সব মিলিয়ে একটা মধ্যযুগীয় সৌন্দর্য। কোনো দেয়ালে আবার একটা ছোট সাদা বোর্ড ঝুলছে। দেয়াল যারা তৈরি করেছে সেখানে তাদের নাম-ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর দেয়া আছে। ছোট্ট ছেলেটি কুকুরের সাথে পাল্লা দিয়ে সামনে সামনে দৌড়ায়। লোকটি আর তার বউ বাসাগুলোর নিরাপত্তার জন্য বানানো এসব ব্যাবস্থার কোনটি কতটুকু কাজের আর তার পাশাপাশি কোনটি দেখতে কত সুন্দর তা নিয়ে আলাপ করতে থাকে। এভাবে কয়েক সপ্তাহ ধরে আশেপাশের বাসাগুলো দেখার পর একটির সামনে এসে তারা দুজনই মুগ্ধ; হ্যাঁ, বানালে এটাই বানানো উচিত। দেখতে যদিও সেটাই ছিল সবচেয়ে জঘন্য কিন্তু সত্যি এতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে হয়। দেয়ালের সমান উঁচু করে লাগানো চকচকে শক্ত কাঁটাতারের কয়েলের মতো প্যাঁচানো একটা বেড়া, ফাঁকে ফাঁকে আবার ধারালো ব্লেড। শরীর কেটে-ছিঁড়ে ওঠা ছাড়া কেউ দেয়ালের ওপরে চড়তে পারবে না। প্যাঁচানো কয়েলের ভেতরের টানেল দিয়ে ওঠা তো একবারে যাবেই না। আর কেউ যদি সেটা চেষ্টাও করে তো কেবল ধারালো হুকগুলোতে বিঁধে শরীরের মাংস চিরে চিরে রক্ত বের হতে থাকবে। বউয়ের তো দেখামাত্রই পছন্দ হয়ে গেল! লোকটি বলল, আমাদের যেটা দরকার ঠিক সেটাই তুমি খুঁজে বের করেছ, যে কেউ এই পাঁচিল ডিঙানোর আগে হাজারবার ভাববে....আর সাথেসাথেই তারা দেয়ালে ঝোলানো ছোট্ট বোর্ডের উপদেশটি টুকে নিল, যোগাযোগ করুন: ’ড্রাগনের দাঁত’--আপনার নিñিদ্র নিরাপত্তার সঙ্গী।

এতদিন যে বাসায় লোকটি, তার বউ, তাদের ছোট্ট বাচ্চা আর তার পোষা কুকুর-বিড়ালসহ সুখে-শান্তিতে বাস করছিল সেখানে পরদিনই একদল মিস্ত্রি হাজির। ক্ষুরের মতো ধারালো ব্লেডগুলো দিয়ে তারা সমস্ত পাঁচিল ঢেকে দিল। সূর্যের আলো ব্লেডের ধারালো শরীরে আর সূঁচালো আগায় পড়ে কেটেকুটে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে প্রতিফলিত হয়। পাঁচিলের উপরে নানান রঙের কাঁচের বাহারে বাসার চারদিক ঝকমক করছিল। আলো আর রঙের বাড়াবাড়িতে কটকটে দৃশ্য দেখে লোকটি তার বউকে বলে, অসুবিধা নেই, আস্তে আস্তে অতিরিক্ত চকচকে ভাবটা চলে যাবে। বউটি সাথে সাথে বলে, যাবে না, তারা গ্যারান্টি দিয়ে গেছেÑ কখনও জং ধরবে না। তারপর বাচ্চা খেলতে চলে গেলে সে বলে, শুধু বিড়ালটার জন্যই ভাবনা হচ্ছে, যদি পাঁচিলে ওঠে! লোকটি বলে, চিন্তা কর না, বিড়াল সবসময় দেখেশুনে পা ফেলে। সত্যিই সে দিন থেকে বিড়ালটা রাতে ছেলেটির বিছানায় ঘুমাত আর দিনের বেলা বাগানেই ঘোরাঘুরি করত। পাঁচিল টপকে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা সে আর ভুলেও করেনি।

ক্রিসমাসে দাদি বাচ্চাটিকে যে রূপকথার বইটি দিয়েছিল, একদিন বিকেলে সেটা পড়ে শোনাতে শোনাতে মা তাকে ঘুম পাড়িয়েছিল। পরদিন সে নিজেকে স্লিপিং বিউটির সেই রাজকুমার বানিয়ে বাগানে খেলছিল। নিজেকে ভাবছিল সেই সাহসী রাজকুমার যে কিনা ভয়ঙ্কর কাঁটাওলা দেয়াল বেয়ে ঘুমন্ত রাজকুমারীকে চুমু দিয়ে জাগাতে রাজপুরীতে ঢোকে। ছেলেটি দেয়ালে একটা মই লাগায়, চকমকে কয়েলের টানেলটি তার ছোট্ট শরীরকে ভেতর দিয়ে পিছলে নামিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তারপর যেই নিজেকে সেখানে সে ছেড়ে দিয়েছে, ক্ষুরের সূঁচালো মাথাগুলো তার হাঁটু, হাত আর মাথায় ঢুকে যায়। চিৎকার করে সে যতই নিজেকে ছাড়াতে চায়, ব্লেডগুলো আরও বেশি তার শরীরে ঢুকে যায়। খুবই বিশ্বাসী কাজের মেয়েটি আর আশ্রয় পাওয়া মালিটি চিৎকার শুনে প্রথমে দৌড়ে আসে। এটা আসলে তাদের বিশ্বস্ততা দেখনোর একটা ভালো সুযোগ ছিল। ছেলেটিকে ওভাবে দেখে তারাও চিৎকার করতে থাকে। দুজন মিলে বাচ্চটিকে সেখান থেকে বের করে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেদের হাত-পা কেটে একাকার করে ফেলে। চেঁচামেচি শুনে লোকটি আর তার বউ বাগানে এসে পাগলের মতো আর্তনাদ করতে থাকে। হয় তাদের চিৎকার নয়তো বিড়ালের ছুটাছুটি, কোনো একটা কারণে নিরাপত্তার অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে। তীক্ষè এ্যালার্মের চেয়েও জোরে জোরে চিৎকার করতে করতে লোকটি, তার বউ, বিশ্বাসী কাজের মেয়ে আর মালি মিলে করাত, কাচি আর দা দিয়ে ধরালো ব্লেডগুলো সরিয়ে বাচ্চাটির কাটা, ছেঁড়া, রক্তে ভেসে যাওয়া শরীরটা নিয়ে বাসার ভেতরে চলে যায়।

                           

              

                                 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা