মারুফ বরকতের কাব্যিপনা

মারুফ বরকত

 

চোখ

চোখের অসুখে মনে পড়ে প্রিয় মুখ

মন চায় খুব দুচোখ ভাসিয়ে কাঁদি

আহা-উহু আর কপালে হাতের সুখ

 

জোয়ারে ডুবেও মেঘনায় ঘর বাঁধি

আসমান তবু গুনেছে লাভের খাতা

ঠোঁটে করে পাখি এনেছে বটের পাতা

 

পাখিটার ঠোঁটে খড়কূটো মানে ঘর

ঘর নয় ঠিক, বাসনা বলাই শ্রেয়

ফুলেছে এ চোখ- এসে তুমি দেখে যেও

 

ফেলে এসেছি গো চিলমারী বন্দর

 

ঘরামি

ঘর আছে, শুধু আমি নাই কাছাকাছি

জোছনা মেখেছে ঘরপোড়া সাঁওতাল

রাণীর পেখমে সুখ দেখে ভালো আছি

কোথাও বুঝিবা ভেঙেছে গাছের ডাল

 

ঘর বাঁধিনাই, পেশায় ঘরামি, মিছা

ঘর নাই, নাই বাসনাও, নাই বাতি

কিনে তো দেইনি নাকফুল, বালা, বিছা

গহণাবিহীন বিকাবে কি এ বেসাতি

 

ঘোর যমুনায় হারিয়েছি নাকছাবি

আঁধারমানিকে খুলনার শেষ ট্রেন

রূপসায় ভেসে গিয়েছে ঘরের চাবি

নদীর গোস্বা ভাঙছে তীর, সফেন

 

মানুষের দেশ পার হয়ে গেছি আমি

মানুষ ভাঙছে মানুষের ঘর যদি

ঘর নাই, নাই ঘর বাঁধার ঘরামি

পার্বতীপুরে মরে গেছে সব নদী

 

ঘুম

আমাদের চরে ঘুম নাই বহুকাল

ঘুমের জন্য বিছনা-বালিশ, মানুষটাও তো লাগে

বেঘোর ঘুমের হাত গিয়ে পড়ে শীত-কলঙ্ক-দাগে

বিছানা ভরা যে বিছানার কঙ্কাল

 

ভালোবাসা বুঝি পীথাগোরাসের বিপুল বীজগণিত

প্রমাণ করতে ফোন করি দুই বেলা

জাতিসংঘের মানুষ মানুষ খেলা

মানা যায় তবু। কী করে মানব অবহেলা-সঙ্গীত?

যাদুকাটা আর বিষকাটা- দুই ভাই

দেশে দেশে কোন যাদুকর বল দিয়েছে নদীর নাম

কোথা হতে আসে, কোথা চলে যায়, কোথায় নদীর গ্রাম?

আমি কোনদিন নদী চোখে দেখিনাই

 

শরীর ভর্তি সফেদ ফেনার ঢেউ

এমন নদী কি কখনও দেখেছে কেউ?

যমুনার পাশে ঘর তুলে থাকে নামটি দুধকুমার

কাছে গিয়ে দেখি আমারই মতন ঘুমের অসুখ তার

 

গহনা

 

মেঘনার ঢেউ গুণে আমি পাই যত সংবেদ

মেঘের ওপাশে থাকে মিকাইল, ডাহুকের প্রেত

গাছের শেকড় বেয়ে পাতার ভাবনা পায় মাটি

বাতাসে আমার কথা শুষে নেয় গাছের পাতাটি

বিছানায় খেদ আনে শালুকের ঘ্রাণ আর ঘুঘু

দুপুরে রোদের খাঁজ আশ্বিণে বুক করে হু হু

ঘাসের ডগায় স্বেদ ভেঙে আসে ট্রেন ঝমাঝম

শাড়ির পাড়ের মত রূপসার তীরে ভাসে ভ্রম

 

শীত আসে, ঘোর আসে, পরশ-বাসনা জেগে ওঠে

গ্রহণ লগন শেষে মেঘনায় ডুবেছে আমিনা

কে বাজায় দূর-বাঁশি, লোহিত শিমুলে, এই গোঠে

ফিরে যায় বাজিকর, বুক খুঁড়ে ক’রে লেনাদেনা

আমাকেই পাবে রাই, নীলফুল দেখ যদি মাঠে

কেবল একটি কথা, ভেজা ফুলে গহনা হবে না

 

অসমাপিকা

ছোলাবাটার ঘন ক্বাথ জ্বাল দিয়ে যাচ্ছি

লাভার মত বুদবুদ

ওগড়ানো অচিন ও অদৃশ্য আগুন

চামচ ধরা হাতে ফোস্কা ফেলে অবিরত

মনের ভেতর ঘাই মারে বর্ষিয়ান মহাশোল

চিনি দিলেই মিষ্টি হয়না দাহ্য ক্লেদ

বলে ফেললেই হয়ে ওঠে না আশু সমাধান

 

মুখ আঁটা ড্রামের চালেও বাচ্চা ফোটায় কিরি পোকা

নিঃশব্দে খেয়ে চলে দেশ ও সংসার

অস্ফূট প্রেম ও মনস্তাপ ক্ষত্রিয়ের সঙ্গী চিরকাল

খিণ্ন হাটের শেষে নিঃস্ব বাজিকর

কাগজের ফুল ছুড়ে নিজেই ঘায়েল হয়ে আছে

 

আদমসুরত এক, ক্ষয়ে যাওয়া তরবারী হাতে

পশ্চিম আকাশে দেখে চলে গেছে ট্রেন

মাঘের রিক্ত বিল, ঘষা চোখের পারা

 

আমি একা দুলদুল

ছোট এক বাক্যের দোমড়ানো কাগজ হাতে

যাব ফের চিরিরবন্দর

সেখানে পায়রা আছে,

এখনও শুকায়নি ইছামতী

বিকাল নামার আগে লেজ দুলিয়ে অসীম কিশোরীর মত

একবার ডেকে যাক ধূসর ফিঙেটা আর্তনাদের মত খ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ! করে চিড়ে দিক

চরাচর, মানুষ হৃদয়

 

চিঠিটা কি পেয়েছ, বালিকা?

 

Maruf Barkat

মারুফ বরকত

মারুফ বরকত। গল্পকার ও চিত্রনাট্যকার। মাঝে মাঝে কবিতাও লেখেন। জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৪ আগস্ট। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ একটি- "শৈশবের দাগ"। প্রকাশিত চলচ্চিত্র চিত্রনাট্য "প্রিয়তমেষু" ও "আমার বন্ধু রাশেদ"। দুটোরই পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম। প্রকাশের অপেক্ষায়- কাব্যগ্রন্থ "রাধাবলি"; উপন্যাস "মায়া" এবং গল্পগ্রন্থ "নির্বাপন বিন্দু"।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা