নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

প্রবাদ আছে- কারো ওপর অন্যায় অত্যাচার করলে সে অন্যায় কাজের কাফফারাও চুকাতে হয়। কিন্তু অনেকের বেলায় এমন হয় যে, কাফফারা পরিশোধ আর শেষ হতে চায় না। সেই দশাকে খুবই খারাপ সময় বলতে হয়। নেপাল-ভারত সম্পর্কের বেলায় ভারতের জন্য এখন সেই ‘খারাপ সময়’ চলছে, যখন তার কাফফারা চুকানো যেন আর শেষ হতে চাচ্ছে না। নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক নেপাল হওয়ার লড়াইয়ে আমেরিকার সাথে মিলে ভারতের অনেক ইতিবাচক ভূমিকা ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। ভারত সে লড়াইয়ের সাথে ইতিবাচক পথ ধরেই হাঁটতে পেরেছিল। কিন্তু পরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গঠনের কালে ভারত ভেবেছিল, তাতে নতুন নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক হবে আগের নেপাল-ভারত কলোনিয়াল দাসত্ব চুক্তির মতোই। স্বভাবতই দিন বদলেছে- সেটা বুঝতে ভুল এখানেই। অথচ ভারত প্রাকটিক্যাল হতে পারলে অন্য কিছু হতে পারত হয়তো।

বলা বাহুল্য, সেটা কখনোই হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। উল্টো নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট) যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে- এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। ভারত নতুন রিপাবলিক নেপালের তাৎপর্য বুঝতে ভুল করেছিল। বলা যায়, ভারত নেপালের পরিবর্তনের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। কেবল ভেবেছিল, নতুন নেপাল রিপাবলিক হলেও সে তো ল্যান্ডলকড, ভারত দিয়ে ভৌগোলিকভাবে ঘেরা। ফলে সে ধরে নিয়েছিল, নতুন নেপালও আগের মতোই ভারতের অনুগ্রহে এবং ভারতের আরো নিয়ন্ত্রণের নেপালই হবে। ভারতের এমন আচরণ দেখলে মনে হয়, ভারতে প্রশাসনের চোখে, আমলা-গোয়েন্দার ইমাজিনেশনে ‘সম্পর্ক’ বলতে কলোনিয়াল সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা কখনোই তাদের জানা হয়নি। ফলে ভারত সীমান্তসংলগ্ন মাধেসি ও তরাই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সাথে নেপালের প্রধান ধারার জনগোষ্ঠীর, পাহাড়ি-সমতলী স্বার্থবিরোধকে উসকে দিয়ে তা থেকে নেপালের রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর শেষ চেষ্টাই ছিল ভারতের শেষ ভরসা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলেছে ভারত। 

নেপাল ল্যান্ডলকড এই অবস্থাটির অর্থ কেমন, তা বোঝা যায় নেপালের শুধু শহুরে জ্বালানি ব্যবহার করা দেখলে। নেপালের গ্রাম হয়তো লাকড়ি দিয়ে চলে, কিন্তু একটি সেমি-আরবান শহরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং নির্ভরশীল; তবে অবশ্যই ভারত যদি সেই গ্যাস নেপালে আসতে দেয়। শুধু গ্যাস নয়, নেপালের জনগোষ্ঠী বরাবরই একমাত্র ভারতের ভেতর দিয়ে রান্নার গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ভারত নেপালের সব শ্রেণীর জনগণের এই মৌলিক চাহিদা জ্বালানিকে পণবন্দী করে চাপ প্রয়োগের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ নেপালে সব প্রভাব হারিয়েছে, ভারতের এমন অনুভব হতে শুরু করেছিল। বিশেষত নেপালের ওই তিন প্রধান দল পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নেপালে ভারতের সব প্রভাব ও স্বার্থ অস্বীকার করেছিল। এরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই তিন দল সমন্বিতভাবে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা। এই ঘোষণা দেয়া মাত্র যেন নেপালের রাজনীতিতে ভারত আসলেই সব নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। তাই দিগি¦দিক হারিয়ে ভারত পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের পণ্য নেপালে যেতে বাধা দিয়ে অবরোধ করে রাখে। এই চরম পদক্ষেপের পথ ধরাতে নেপালের গরিব সাধারণ মানুষের স্তরেও মন থেকে ভারতের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এত দিন সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল রাজনীতিকদের স্তরে, তা এবার সেখানে সীমিত না থেকে সর্বস্তরের আমজনতা লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছিল। হতে পারে ভারত এ দিকটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবেনি অথবা তার সব কার্ড ফুরিয়েছিল। তবে সব হারানো ভারত চিন্তাও করেনি এর কাফফারা কী হতে পারে। কারণ পণ্য অবরোধের মূল ধাক্কা বিশেষ করে জ্বালানি অবরোধের ধাক্কা খেয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষ। এদের জীবনও ভারত পণবন্দী করে ফেলেছিল। এরই ফলাফল হিসেবে নেপাল-ভারত সম্পর্কের মধ্যে এখন জনগণের পর্যায়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভারতবিরোধী মনোভাব।

 নেপাল-ভারত সীমান্ত প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আগে যেখানে ছিল আরেক পাড়ায় গিয়ে সওদা কেনার মতো, আজ সেই সম্পর্কের মধ্যেও যেন আগুন লেগেছে। সীমান্তে এক কালভার্ট নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। আর তাতে আলাপ-আলোচনার পথে গিয়ে নয়, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে নেপালিদের সাথে এই বিরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে গুলি করায় এক নেপালি তরুণের (গোবিন্দ গৌতম) মৃত্যু হয়। ভারতের দুর্দশা এখন এমন যে, ক্ষুব্ধ মারমুখী নেপালি সাধারণ জনগণকে মোকাবেলা করতে ভারতকে নিজের রক্ষীবাহিনীর ওপর ভর করতে হচ্ছে। অথচ ভারত গত বছর প্রায় পাঁচ মাস ধরে নেপালে পণ্য চলাচল আটকে রেখেছিল, কনস্টিটিউশনের বিরোধিতা করেছিল। এসব নাকি নেপালের সীমান্তবর্তী জনগণের স্বার্থেই! আজ নেপালি পুলিশের ভূমিকা হলো লড়াকু নেপালিদের ফেরানো, যেন তারা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়। 

ঘটনার সূত্রপাত ও সারসংক্ষেপ হলো, সীমান্তে নেপালের কালভার্ট নির্মাণকে কেন্দ্র করে কিছু ভারতীয় দাবি করে, কালভার্টের অপর পার নোম্যান্সল্যান্ডে পড়েছে, তাই তাদের আপত্তি আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নেপালি পক্ষের বক্তব্য জোরালো। কারণ তাদের কথা হলো, সীমান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক টেবিলে বসে ঠিক করা হোক। আর আসলেই তা টেবিলেই ছিল। কিন্তু সেটাকে বল প্রয়োগের স্তরে নিয়ে গিয়েছে ভারতীয় পক্ষই। আর কেন এতে এক নেপালিকে হত্যা করা হলো? ফলে তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।

 নেপালের ‘মাই রিপাবলিকা’ ইংরেজি দৈনিক গত ১১ মার্চ নেপালি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে লিখছে, ভারতীয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঐকমত্য ভঙ্গ করে নেপাল-ভারত সীমান্তে কাঞ্চনপুর জেলায় আনন্দবাজারে নির্মীয়মাণ কালভার্ট ভেঙে দিয়েছে। আর তা থেকে ডেকে আনা মুখোমুখি সঙ্ঘাতে একজন নেপালি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে গত ৯ মার্চ। নেপালের স্থানীয় সমাজকর্মী হরি লামসাল বলছেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে উভয় দেশের স্থানীয়রা ও নিরাপত্তা সদস্যরা মিলে একমত হয় যে, কালভার্ট নির্মাণ হবে। কিন্তু পরে এই একমত হওয়া বিষয়টি না মেনে তারা কালভার্ট ভেঙে দেয়।’ কাঞ্চনপুর জেলার এসপি প্রকাশ বাহাদুর চাঁদও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ‘দুই দেশের কর্তৃপক্ষ একমত হয়েছিল এই নির্মাণে। অথচ পরে ভারতীয় পক্ষ এককভাবে এটা ভেঙে দিচ্ছে। এটাই সীমান্ত উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।’

ঘটনাস্থল কাঞ্চনপুর জেলার ‘পুনর্বাসন মিউনিসিপালিটির’ অন্তর্গত। ওই মিউনিসিপালিটির প্রধান নির্বাহী শের বাহাদুর বুধা বলেন, তারা নেপালের মাটিতে ওই কালভার্ট নির্মাণের জন্য পাঁচ লাখ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। নেপাল ও ভারতীয় পক্ষ কালভার্ট নির্মাণে একমত হওয়ার পরই ওই ফান্ড মিউনিসিপালিটি অনুমোদন করেছিল। ওই জেলা পুলিশ অফিসার এবং তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ গত ২০ ফেব্রুয়ারি দু’জনে বসে ওই নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সেই সূত্রে নেপালের সংশ্লিষ্ট উপপ্রধান জেলা অফিসার (ডেপুটি ডিসি) ও তার ভারতীয় প্রতিপক্ষও পরের দিন একসাথে বসে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্থানীয় ভারতীয়রা বুধবার সন্ধ্যা (৮ মার্চ) ৬টার দিকে কালভার্টটি ভাঙা শুরু করেছিল আর স্বভাবতই তা নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়। 

বাংলাদেশের সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের ভারতীয় রক্ষীবাহিনী নাম যেমন বিএসএফ, নেপাল-ভারত সীমান্তে এখানে সে বাহিনীর নাম এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)। রিপাবলিকা লিখছে, ‘ভারতীয় এসএসবির একজন এএসপি আর কে মোড়ল স্বীকার করেছেন, কালভার্টটি দুই দেশের সম্মতি অনুসারে নির্মিত হচ্ছিল।’ এ ছাড়া কাঞ্চনপুরের পাশের জেলা কাইলালির (এটাও নেপালের আরেক ভারতীয় সীমান্ত জেলা শহর) চিফ জেলা অফিসার (ডিসি) গোবিন্দ রিজালের বরাতে আরো জানিয়েছে, রিজাল পরের দিন (১০ মার্চ) ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করেছেন। তিনি জানান, ‘আমরা তাদের বলেছি, দ্বিপক্ষীয়ভাবে একমত হওয়ার ভিত্তিতে এরপর তৈরি করা কালভার্ট তারা একতরফা ভেঙে দিতে পারে না। 

৯ মার্চ সকাল থেকেই ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেপালিরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকে। কোনো কোনো মিডিয়ার (যেমন নিউইয়র্ক টাইমস), অনুমানে তারা প্রায় ১০ হাজারের বেশি। তারা ভাঙা কালভার্টের স্থানে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। আর তা রুখতে সীমান্ত সীমার অপর পারে ভারতীয় এসএসবিও সমবেত হয়। ৯ তারিখের রিপাবলিকা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে লিখেছে, এসএসবির লোকাল ইউনিট চিফ যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘থানেদার’ ডাকা হয়, পিস্তল বের করে পরপর চারটি ফায়ার করেন এবং চতুর্থ শটটি গোবিন্দকে কোমরে আঘাত করে। কথাগুলো বলছিলেন, দেবেন্দ্র খাড়কা, তিনি মৃতব্যক্তির এলাকার। খাড়কা বলেন, ‘বুলেটটি গোবিন্দের কোমর বরাবর আঘাত করলে সাথে সাথে ও পড়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘থানেদার অরবিন্দ কুমার শুক্লা গুলি ছোড়ার আগে নেপালি প্রতিবাদকারীদের ছোড়া পাথরে আঘাত পেয়েছিলেন। গুলিতে আহত গোবিন্দকে ধানগাড়ী সিপি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি।’

 ঐকমত্যে নির্মিত কালভার্ট ভেঙে দেয়া আর এসএসবির গুলি ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। কিন্তু তাতে আরো ঘি ঢেলে দেয় নেপালের ভারতীয় হাইকমিশন। এ ঘটনায় হাইকমিশন এক টুইট বিবৃতি প্রচার করে। কিন্তু সেটা সব দায় অস্বীকার করা এক বক্তব্য। ‘কাঞ্চনপুরের আনন্দবাজার সীমান্তে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেখানে এসএসবি গুলি ছুড়েছে’ বলে ওই বিবৃতি সব কিছুই অস্বীকার করেছিল। বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা ছিল খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার কাজ। 

এতে স্বভাবতই ফুঁসে ওঠা নেপালি সাধারণ মানুষ, ভারতবিরোধী স্লোগান তুলে সারা নেপাল তোলপাড় করে ফেলেছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠায় ভারত এক দিন পরই অবস্থান বদলায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, তাদের অবস্থানের রেকর্ড ঠিক রাখার চেষ্টা হিসেবে এসএসবি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে । আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির হয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং তদন্ত করে দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ইতোমধ্যে নেপাল সরকার গুলিতে নিহত গোবিন্দ গৌতমকে শহীদ ঘোষণা করে এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাঞ্চনপুর জেলার ডোডা নদীর তীরে তার সৎকারের আয়োজন শুরু করে।

এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান যে ভুল ছিল এর প্রতিফলন ঘটে ভারতের এনিডিটিভির এক রিপোর্টের শিরোনামে। তা হলো ‘সীমান্ত হত্যায় প্রতিবাদ প্রতিরোধ বেড়েই চলছে। ফলে ভারত নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তদন্ত করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।’ ইতোমধ্যে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টেও নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন, এই বুলেট এসএসবির। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওই রিপোর্ট তিনি হস্তান্তর করেছেন। সুষমা শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।

অপর দিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখার নির্বাহী পরিচালক আকার পাতিল নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবি করেন, বিশেষ করে ভারতীয় এসএসবির সদস্যরা ‘প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে দাবি জানান। নেপালে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয়, মিডিয়ায় রিপোর্টিংয়ে সঠিক আইনি ভাষা প্রয়োগ। বেশির ভাগ মিডিয়া শুরু থেকেই খুব বেছে একটা শব্দ প্রয়োগ করেছে- ‘হাইহ্যান্ডেডনেস’। কথাটির আইনি অর্থ হলো- কোনো নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, যেমন কাউকে গ্রেফতার করে গাড়িতে উঠানোর সময় কোনো বাধা না দিলেও তাকে টেনেহিঁচড়ে অথবা অযথা কোমরে একটা রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে মেরে তোলা অথবা প্রতিহিংসামূলকভাবে বল প্রয়োগ ইত্যাদি। মাই রিপাবলিক পত্রিকা আইনি শব্দে নেপালিদের ভাষ্য খুবই সফলভাবে তুলে ধরেছে। যেমন পর্যবেক্ষণ ধরনের ১১ মার্চের এই রিপোর্ট লিখছে, ‘একটা দেশের একজন নাগরিক অন্য দেশের (বাহিনীর) ছোড়া গুলিতে মারা যাওয়া; এটা খুবই সিরিয়াস ইস্যু।

এটা এমন এক ইস্যু যা সর্বোচ্চ সতর্কতা, যত্ন ও সূক্ষ্ম সেনসিটিভ বিষয়াদির দিকে খেয়াল রেখে নাড়াচাড়া করা উচিত।’ পত্রিকাটি কথাগুলো বলছিল ভারতীয় হাইকমিশনের দায় অস্বীকার করা বিবৃতি দেখে। তাই আরো বলছিল, ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেই টেনশন কমানোর বদলে হাইকমিশনের ঘটনার দায় অস্বীকার করা; এমনকি এসএসবির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ন্যূনতমভাবেও এটাই বলতে পারেনি যে, আমরা ব্যাপারটা আরো খুঁজে বা যাচাই করে দেখব। অ্যাম্বাসি অফিসিয়ালদের এমন আচরণ যদি চলতে থাকে তবে নেপালে ভারতের দীর্ঘ পণ্য অবরোধে ইতোমধ্যেই (২০১৫ সালে) দাগ লেগে থাকা নেপাল-ভারত সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। এ সবের ফলাফলে ভারতবিরোধী যে জ্বর এখন নেপালে বয়ে যাচ্ছে, তা দিয়ে নেপালে ভারতের কোন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল। এভাবে ভারত প্রসঙ্গে আমাদের মুখ যদি এত তেতো হয়ে যায়, তাতে স্বভাবতই এর প্রতিফল হিসেবে জনগণের ভেতর থেকে একটা চাপ প্রবল হতে থাকবে যে, চীনের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করো। স্বভাবতই এটা ভারতের জন্য সবচেয়ে বাজে এক ব্যাপারে হবে। সেজন্য নেপালের পাবলিক সেন্টিমেন্টের বিষয়ে আরো সেনসিটিভ হতে নেপালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আহ্বান জানাই। নেপাল-ভারত সম্পর্ক ইতোমধ্যে অনেক জটিল হয়ে গেছে, একে আর জটিল করবেন না।’ 

ভারতের সাথে নেপালের সীমান্তবিরোধ কী করে মোকাবেলা করতে হয়- তা সবার জানা-বোঝার জন্য নেপালের জনগণ এখানে কিছু শিক্ষা রেখে গেল।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

Goutom Das

গৌতম দাস

বুয়েট থেকে গ্রাজুয়েশন করেছেন। ১৩ বছর যাবত আফ্রিকার নানা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জাতিসংঘের সাথে চাকুরি সুত্রে কাজকর্মে। তিরাশির ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। অনুবাদ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র বিষয়ক লেখালেখি করছেন। প্রকাশিত বই: কার্ল মার্কসের জর্মান ভাবাদর্শ(অনুবাদ), আগামী প্রকাশনী এদেশে সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবে কৃষকের ভূমিকার প্রশ্নে, প্রতিপক্ষ প্রকাশনী

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা