ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা ও সমাজভাবনা

আমানউল্লাহ রাইহান

একটা সময় ছিলো,সমাজে মানুষ পরস্পরে অত্যন্ত সম্প্রীতি ও ভালোবাসার সাথে সহাবস্থান করতো।অন্য ব্যক্তি ও পরিবারে সম্পর্ক ছিলো অটুট বন্ধনের।প্রকৃত অর্থেই ছিলো নাড়ির টান।ছিলো সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি৷অন্যের সুখকে নিজের সুখ, অন্যের দুঃখকে নিজেরই দুঃখ মনে করতো।পাশের ঘরের, কাছের পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়াকে নিজের সামাজিক নৈতিক দায়িত্ব মনে করতো।আমার পাশের ভাই কেমন আছে, কী করছে, কোনো কষ্টে আছে কিনা—এগুলো মোটামুটি প্রত্যেকের চিন্তায় রেখাপাত করতো।আন্দোলিত করতো।

মোটকথা, মানুষের চিন্তা-ভাবনা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিলোনা।তার চিন্তা চেতনাবোধ উৎসর্গিত হতো অন্যের জন্য।নিজের ভালোর আগে অন্যের ভালো,নিজের কষ্ট লাঘবের আগে অন্যের কষ্ট লাঘবের ভাবনা এমনকি নিজে কোনো উৎকৃষ্টমানের খাবার আহারের পূর্বে পাশের ঘরের বাচ্ছাদের খবর নিতো।ইত্যকার সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের মন-মানসে, কাজে-কর্মে, মানবিকতায় ইনসানিয়াত ও সমাজভাবনা আন্দোলিত হতো।কাড়িকাড়ি অর্থকড়ি কিংবা বিলাসবহুল দালান-কোঠার অযাচিত অহমিকা আমাদের কল্পনা থেকেও ছিলো বহু দূরে ৷

কিন্তু বর্তমান সমাজের চিত্র এর পুরো উল্টো।এখনের সমাজে মানুষের মাঝে "আমি ও আমার" চিন্তা অনুপ্রবেশ করেছে।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত।ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে এবং প্রকৃত অর্থের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।আমি কী করলাম, আমার কতটুকু হলো– এসবের হিসেব কষতেই জীবন পার হয়ে যায়।সমাজের কথা, সমাজের মানুষের কথা, তাদের সুখ-দুঃখের কথা হৃদয়ে জাগ্রত হয় না।দাগ কাটে না, রেখাপাত করে না আমাদের বিবেক-মননে।মানবিকতা ও সামাজিকতা এখন শুধু শব্দেই সীমাবদ্ধ।

আমাদের চিন্তার পৃথিবী নির্দিষ্ট পরিধির মধ্যে বদ্ধ হয়ে পড়েছে।অন্যের জন্য, সমাজের জন্য, নানান শ্রেণির অবহেলিত জনমনের জন্য সেই চিন্তা,ভাবনাচিহ্ন ও চেতনাবোধ করে না৷ ব্যক্তিতত্ত্ব,ব্যক্তিতন্ত্র ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চেতনা এবং আপন বৈষয়িক উৎকর্ষের আকাশচুম্বী ভাবনা আমাদেরকে সামগ্রিক বোধ ও সমাজচিন্তা থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।মানবিকতার স্লোগান এখন মুখরোচক বুলি।কার্যত এর কোনো প্রতিফলন নেই ৷ ইনসানিয়াত ও মনুষ্যত্বের শিক্ষা থেকে আমরা দূরে সরে পড়েছি৷যার দরুন মানবতাবোধ আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছে৷নীতি-নৈতিকতা ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে এগুচ্ছে৷ এহেন ভয়ংকর ও বিধ্বংসী পরিস্থিতির কারণ কী?

 পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নাকি মূল্যবোধ ও দীক্ষার অভাব তা সমাজচিন্তকগণ খতিয়ে দেখবেন৷ এবং তা থেকে সমাজকে রক্ষার সম্ভাব্য সঠিক দিকনির্দেশনা দিবেন৷ সাথে সাথে আমাদেরকে বিশেষ করে ইনসানিয়াতের সেই তালিমকে ফের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে৷নিজের মনন- মানসিকতাকে ব্যক্তি থেকে মুক্ত করে সমগ্রকে ধারণ করতে হবে৷ প্রকৃত মনুষ্যত্বের দীক্ষা ও সামগ্রিক চিন্তা-চেতনাই পারে আমাদের পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে দিতে৷

 

Amanullah Raihan

আমানউল্লাহ রাইহান

ছাত্র, দারুল উলুম হাটহাজারী, চট্টগ্রামে অধ্যয়নরত

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা