হন্তারক সমাজ, হন্তারক শিক্ষা

সফিউর রহমান

“I was

And I no more exist;

“Here drifted

An hedonist.” - Ezra Pound

১. এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। ফল প্রকাশের পর কাংখিত ফল লাভে আপাত ব্যর্থ কিছু শিক্ষার্থীরা আত্ম হননের পথ বেছে নিয়েছে।আত্ম হননের এই প্রবণতা একেবারেই নতুন না। তবে কয়েক বছর হলো এই প্রবণতা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। আত্ম হত্যাকারী শিক্ষার্থীদের বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছর।নেশা ধরানো, স্বপ্নমাখা, দূরন্ত, কৌতুহলি বয়স। ভালো লাগার বয়স, ভালো বাসার বয়স। কারণে - অকারণে হেসে ওঠার বয়স, গাল ফুলানোর বয়স। অবাক বিষ্ময়ে চারপাশে তাকানোর বয়স। লাজুকতা আর দু:সাহস নিয়ে সমাজের মাঝে মানুষ এই বয়সে নিজেকে মেলে ধরে। জানান দেয় নতুনের আগমনী বার্তা। এই বিষ্ময় জাগানো বয়সে আমাদের বাচ্চারা আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে আত্মহত্যা করছে আমাদের ভবিষ্যৎ।এ এক হন্তারক সময়। বাচ্চাদের আত্মহননের কারণ তালাশ করলে দেখা যাবে এটা আত্মহত্যা নয়।এটা স্রেফ হত্যাকান্ড। আমাদের বাচ্চাদের, আমাদের ভবিষৎকে আমরাই হত্যা করছি। একটা বাচ্চার ওপর ক্রমাগত সীমাহীন ভালো রেজাল্টের চাপ প্রয়োগ করে রুদ্ধ করা হয় তার মানসিক বিকাশ।A পেলে প্রশ্ন ওঠে A+ পেল না কেন। A+ পেলে তখন আবার GPA 5 না পাওয়ার ভৎসনা শুনতে হয় বাচ্চাকে। GPA 5 এ মন ভরে না।তখন আসে গোল্ডেন না পাওয়ার হাহাকার। যদিও গোল্ডেন নাকি GPA 5 এর মধ্যেই কাউন্ট হয়।আবার এই রেজাল্ট কোন মান সম্মত পরীক্ষণের ভিত্তি নির্ধারিত হচ্ছে কীনা তার কোন জবাদিহীতা নেই।প্রতিকার নেই লাগাতার প্রশ্ন পত্র ফাঁস সন্ত্রাসের। পরীক্ষা পদ্ধতি বাচ্চাদের মননের সাথে সহনশীল কীনা সে ভাবনাও আমাদের নেই।আমাদের আছে শুধু রেজাল্ট ক্ষধা। বাচ্চা বাঁচুক - মরুক তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের চাই রেজাল্ট,একটা কাগুজে দলিল।জীবন্ত বাচ্চার চেয়ে কাগুজে দলিলের মূল্য আমাদের কাছে মূল্যবান। আনন্দময় শৈশব ধ্বংস করে বাচ্চাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ' গাড়ী - ঘোড়া'য় চড়ার বর্ণবাদী স্বপ্ন। সমাজের মাঝেই তৈরি হয় এই আত্মঘাতী বয়ান। স্কুলগামী বাচ্চাদের কাঁধে ঝোলানো বস্তা ভর্তি বইয়ের মাঝে থাকে ডাক্তার, ইন্জিনিয়র, আমলা , ব্যাংক ডাকাত, ভূমি দস্যু হবার তরিকা। বস্তা ভর্তি বইয়ে শুধুই ' গাড়ী - ঘোড়া'য় চড়ার স্বপ্ন ।মানুষ হবার কোন আলাপ আমাদের শিক্ষায় নেই। নেই মহাকালকে স্পর্শ স্বপ্ন। বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলের নিষ্ঠুর শিক্ষা ক্রমাগত খুন করে চলে আমাদের বাচ্চাদের। এসএসসিতে কাংখিক ফল লাভে আপাত ব্যর্থ শিক্ষার্থীদে আত্মহত্যা সেই খুনেরই ভিন্ন প্রকাশ বৈ কিছু নয়।

২. দুনিয়ায় জীবন ধারণ করতে হলে কিছু না কিছু করে মানুষকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।সেজন্য শিক্ষা, কারিগড়ি দক্ষতার প্রয়োজন হয়।কিন্তু মানুষ কোন পশু নয় যে শুধু উদর পূর্তির জন্য কুস্তি লড়বে। নিছক বৈষয়িকতা যখন সমাজের একমাত্র ' উদ্দেশ্য ‘ হয়ে যায় তখন শুরু হয় কুস্তি লড়াই।এ কুস্তি তে সবাই যে প্রথম হবে তার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।কেউ প্রথম হবে, কেউ দ্বীতিয়, কেউ বা তৃতীয় হবে। আবার কেউ কেউ কুস্তি থেকে ছিটকে রিং এর বাইরে পড়ে যেতে পারে। এখন দ্বীতিয়, তৃতীয় অথবা রিং এর বাইরে ছিটকে পড়া প্রতিযোগী কী করবে?

 সমাজের আধিপত্যশীল চিন্তা বলে, তুমি অযোগ্য।অযোগ্যদের কোন জায়গা নেই,কোন সন্মান নেই,কোন প্রয়োজন নেই।তুমি অযোগ্য, তুমি গেট আউট।আধিপত্যশীল চিন্তার এই নিষ্ঠুর বার্তাটি আমাদের সংবেদন শীল বাচ্চারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছে। বাচ্চারা সেই গেট আউটের খপ্পরে পড়ে নিজেকে সমাজ থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

সমাজের আধিপত্যশীল চিন্তা মানুষের চৈতন্যে প্রতিযোগিতার এক অলীক জগত তৈরি করে দেয়। যে অলীক জগতে প্রবেশ সকলের পক্ষে সম্বভ হয়ে উঠে না। তখন মানুষ নিজেকে প্রত্যাহার করা শুরু করে।

৩. আমি বাচ্চাদের আত্মহত্যাকে জাস্টিফাই করছি না।দু: খ ভারাক্রান্ত মনে আমি এর কারণ অনুসন্ধান এবং বিপদ অতিক্রমের পথ সন্ধান করছি।যে ব্যাবস্থায় ভালোবাসা থাকে না,যে ব্যাবস্থা হৃদয়হীন সেখানে বাচ্চারা কীভাবে নিজেকে মেলে ধরবে? রেজাল্টের চেয়ে জীবনের মূল্য কমে গেলে, জীবনের সন্মান কমে গেলে বাচ্চারা কী করবে? আমার কী পেরেছি ছিটকে পড়া বাচ্চাদের বুকে দিয়ে আগলে রাখতে? আমরা পারিনি বিধায় বাচ্চারা অভিমানে , লজ্জায় আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে।যুগ যুগ ধরে বাচ্চাদের প্রতি সমাজ - রাষ্ট্র যে অবিচার করে আসছে বাচ্চারা এখন তারই নেতিবাচক প্রতিশোধ নিচ্ছে। যে সমাজে ভরসা করার মত কোন জায়গা নেই, ধৈর্যের কোন শিক্ষা নেই সেখানে বাচ্চারা কীসের ওপর ভরসা করে আগামীর স্বপ্ন দেখবে? ক্রমাগত ভৎসনা আর প্রতিযোগিতার চাপ কোন মানুষই সহ্য করতে পারেনা। ফলে বাচ্চাদের আত্ম হননের দায় সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাঁধেই বর্তায়। এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

একটা পরীক্ষার রেজাল্ট জীবনের সব না। জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রথম হওয়ার ধারণাটা পৈশাচিকতার প্রকাশ। বাচ্চাদের মনো জগতে এমন পৈশাচিকতা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।

বাচ্চাদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। সমাজের সব জানালা বাচ্চাদের জন্য খুলে দেওয়া প্রয়োজন। ঘরের মাঝে মোবাইল - ট্যাবে বন্দী বাচ্চাদের খোলা আকাশের নীচে দাঁড়াতে দিতে হবে। বাচ্চারা দেখুক, মানুষ, মানুষের জীবন, মানুষের ইতিহাস, মানুষের সম্ভাবনা হিমালয়ের চেয়েও বিশাল।পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ে ভৎসনা গ্রহনীয় নয় ।বাচ্চাদের সামনে হাজির করতে হবে মহাকালকে স্পর্শ করার স্বপ্ন।আমাদের বাচ্চারা কেবল পরীক্ষার্থী নয়।আমাদের বাচ্চারা মানুষ।মহাকালকে হাতের মুঠোয় ধরার ক্ষমতা আমাদের বাচ্চাদের মাঝে বিরাজমান।তাদের বিকাশের সব দরজা খুলে দেওয়াটা সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা