মহানবী (দ.): মরুভূমির বিশালতার কাছে মানুষের ক্ষুদ্রতার বোধ (এক)

মাসকাওয়াথ আহসান

 

ইসলাম ধর্ম দর্শনের প্রবর্তক মুহাম্মদ (দ.) –এর শৈশব ব্যক্তি মুহাম্মদের মানসিক গঠনে বড় প্রভাব রেখেছিল। মুহাম্মদ ছিলেন ধনী পরিবারের ছেলে। উনার দাদা জমজম কূপটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। মক্কার প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হবার পরেও মুহাম্মদকে জন্মের পরপরই পাঠিয়ে দেয়া হয় এক বেদুইন পরিবারে। মক্কায় সে সময় শিশু মৃত্যুর হার বেশী ছিল। তাই মক্কার অদূরে মরুভূমি এলাকায় অনেক শিশুকেই বেদুইন পরিবারে পাঠানো হতো। ভবিষ্যত বংশধরদের বাঁচিয়ে রাখতেই ছিলো এ ব্যবস্থা।

মুহাম্মদ (দ.) বেদুইনদের শ্রেণীহীন সুষম সমাজে বড় হন। তার মনোজগতে সবাই মিলে সুখে থাকার সাম্যভাবনা প্রোথিত হয় বেদুইন পরিবারে। কারণ বেদুইন সমাজ মক্কার লোকের সম্পদমুখিতার তীব্র সমালোচক ছিল। বেদুইনরা তাদের নানা সামগ্রী বিক্রি করতে মক্কা যেতো। সেখানে ব্যবসাই ছিলো ধর্ম; এবং কাবাকে কেন্দ্র করে ধর্ম-ব্যবসা ছিল জমজমাট। বেদুইনরা মক্কার মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা আর পুঁজিবাদী মানসিকতা দেখে অবাক হতো। কারণ তাদের ছিল সাম্যবাদী সহজ সমাজ।

আর মরুভূমির বিশালতার কাছে মানুষের ক্ষুদ্রতার যে বোধ তা বেদুইন পল্লীর প্রতিটি মানুষকে বিনয়ী ও উদার করে তুলতো। এদের উপার্জনের উৎস ছিল উট, ঘোড়া, ছাগল প্রতিপালন সঞ্জাত। ফলে প্রাণীর সঙ্গে প্রাণের সখ্য ছিল। বেদুইন সমাজের এই নিসর্গের কাছে আত্মসমর্পণ, প্রাণী ও প্রাণের প্রতি ভালবাসা, সাম্যভাবনা, অতীন্দ্রিয় সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের উপর নির্ভরতা-এসবই মুহাম্মদের মানসিক গঠনকে প্রভাবিত করে।

ফলে উনি যখন মক্কায় ফিরে আসেন; নিজেকে কখনোই মানিয়ে নিতে পারেন না এই মোহরমুখী সমাজে। উনার মা সিদ্ধান্ত নেন ছেলেকে নিয়ে চলে যাবেন মদিনায়। কিন্তু যাবার পথেই মা’র মৃত্যু হয়। তাকে দাদার বাড়ীতে ফিরে আসতে হয়। বাবা-মা হারানো এই শিশুটি নিজেকে মক্কা-নগরের আগন্তুক হিসেবেই ভাবতো। বিভূতিভূষণের পথের পাচালীর ‘অপু’ চরিত্রটির বেদনা ও শক্তির জায়গাটি যারা অনুভব করেন; মুহাম্মদকে (দ.) বুঝতে তাদের সুবিধা হবে। বাবা-মা নেই এ কষ্টবোধের চেয়েও ‘বেদুইন’ সাম্যবাদী সমাজের সাম্যবাদী উদার মন নিয়ে মক্কার মত পুঁজিবাদী সমাজে বেড়ে ওঠার যন্ত্রণা তাকে বেশী তাড়িত করে। যে সমাজে পঙ্গু-প্রতিবন্ধীদের ভিক্ষা করতে হয়; দরিদ্রকে দাস হতে হয়; অন্যদিকে বড় লোকের সম্পদ উপচে পড়ে; সেখানে মুহাম্মদ (দ.) নিজেকে ঐকান্তিক শ্রেণীহীনদের মাঝেই খুঁজে পান।

কাবা তখনো ছিল উপাসনা গৃহ। সেখানে উপাসনা চলতো নানা আকৃতির দেব-মূর্তির। এই পূজামন্ডপকে ঘিরে ছিল এক বিরাট ব্যবসায়ী চক্র। আজকের দিনের পলিটিক্যাল ক্যাডারদের মতো; ব্যবসায়ীরা কেউ খাদ্য-সামগ্রী, কেউ পানি, কেউ তীর্থযাত্রীদের বসবাসের তাঁবুর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতো; এইভাবে আজকের মাজার ব্যবসার মতো বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসে কুরাইশরা। মুহাম্মাদের পরিবার যেহেতু জমজম কূপটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল; উনি ঐ ধণিক শ্রেণীরই একজন ছিলেন। কিন্তু তার সাম্যবাদী মন প্রত্যাখ্যান করে ধণিক সমাজের ভন্ডামী। উনি এই কাবার পৌত্তলিক উতসবকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা পুঁজির কারবার দেখে বিস্মিত হন। আরো অবাক হন তীর্থে আসা ইহুদী ও খৃস্টানদের কাছে তাদের ধর্মগ্রন্থের কথা শুনে। মুহাম্মদের বুঝতে অসুবিধা হয়; এরা তো শিক্ষিত লোক; এদের সবাই বইয়ের মানুষ বলে পরিচিত মক্কাবাসীর কাছে।  অন্যদের চেয়ে বেশী শিক্ষিত এরা। এরাও নিজেদের অকারণে বিভাজিত করলো কেন; সে প্রশ্ন মুহাম্মদকে (দ.) অবাক করে। এ ছিল যেন আলবেয়ার ক্যামুর আউটসাইডারের নায়ক যার কাছে অর্থহীন নিষ্ঠুর রসিকতা বলে মনে হয় নাগরিক জীবন।

যারা মুহাম্মদের (দ.) জীবন দর্শনটিকে আত্মস্থ করতে পারেন না; কেবল ভক্তি দিয়ে সামন্তযুগের খাদেমের মত তাকে মেলে ধরতে চান; অথবা যারা জীবন থেকে পালিয়ে  উত্তরাধুনিক জীবনযুদ্ধে রণেভঙ্গ দেয়া পারমানবিক লোকজন; তারা মুহাম্মদকে (দ.) নিয়ে অযৌক্তিক শব ব্যবচ্ছেদ করেন; এই দুটি অত্যন্ত কট্টর গোষ্ঠী মুহাম্মদের (দ.) মুসলিম দর্শনটির মূল শক্তির জায়গা চিহ্নিত করতে অক্ষম। আজ সৌদী আরব হজ্জকে কেন্দ্র করে যে বিরাট ব্যবসা ফেঁদেছে; মুহাম্মদ (দ.) ঠিক এই ধর্মকে ঘিরে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তিকে ঘৃণা করতেন। উনি মানুষের ভেতরের পার্থিব ধন দৌলতের প্রতি যে পাশবিক লোভ; তার বিরুদ্ধে জিহাদ বা বিপ্লব করেছেন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেই জিহাদের অপব্যাখ্যা হতে হতে আজ কথিত আল-কায়েদা-আই এসের জিহাদে এসে ঠেকেছে।

একটা ছোট উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। মুহাম্মদ এই রোজার সময়ের তারাবির নামাজের বিধান করেন নি। তিনি মসজিদে গিয়ে আট রাকাত নামাজ পড়তেন। পরে খলিফা উমর এই তারাবির নামাজের প্রচলন করেন।সেটিও ছিল সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির চেষ্টা থেকে। পরে এটি ২০ রাকাতের নামাজে পরিণত হয়। ধর্ম-দর্শন বিষয়টি মুহাম্মাদ (দ.) যতটাই সহজ করে অনুশীলন করেছেন; পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ইসলামের মাতবর শ্রেণীর সেই ব্যবসায়ী মনষ্করা একে কঠিন করে তুলেছে। সেগুলোর দায় মুহাম্মাদের (দ.) কাঁধে আমরা চাপাবো কোন যুক্তিতে!  

চলবে...

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা