'নোরা', 'অান্না' বা একজন 'নিলুফার জেসমিন

অাশানুর রহমান খোকন

নিলুফার জেসমিনের নামটি অনেকেই শোনেন নি। শোনার কোন কারণও নেই। এমনকি অাজকের অাগে অামিও জানতাম না। পত্রিকা, ফেসবুক সর্বত্র অাপন জুয়েলার্স, রেইনট্রি হোটেল, সাফাত, নাঈম, সাদমান, দিলদার, বিএইচ হারুন এসব নামের অাড়ালে নিলুফার নামটি শোনার বা মনে রাখার বিশেষ কোন কারণও নেই। তবু অাজ একটি অখ্যাত অনলাইন কাগজে এই নামটি দেখলাম। তার কিছু কথাও পড়লাম। নিলুফার জেসমিনের কথা না হয় একটু পরেই বলি।

যদি বলি 'নোরা'র নাম শুনেছেন, অনেকেই বলে উঠবেন, 'ডলস্ হাউজের নোরা?' বা 'ইবসেনের নোরা?'। ইবসেন 'এ ডলস্ হাউজ' নাটকটি লিখেছিলেন ১৮৭৯ সালে। ইউরোপে, বিশেষভাবে ইংল্যান্ডে ইবসেনের কতটা প্রভাব ছিল সেটা না হয় জর্জ বার্নাড শ'য়ের কাছ থেকেই শুনি। তিনি বলেছিলেন, ' তিনটি বিপ্লব, ছয়টি ক্রুসেড, দুইটি বিদেশী অাক্রমণ ও একটি ভুমিকম্পের ফল যা হতে পারে, ইংল্যান্ডের উপর ইবসেনের প্রভাব ততটায়'। ইবসেনের সেই ডলস্ হাউজের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল নোরা। উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের সমাজ, বিবাহ, সংসার সবকিছুকে যেন মন্থন করে ইবসেন দেখালেন নারী কী? নারীর শত্রু কে? নারীর মুক্তিই বা কোথায়? নাটকের শেষ অংকে নোরা শুধু পোষাকই পাল্টায়না, নিজেকে চেনায় নতুন রুপে। পোষাক এখানে প্রতিকমাত্র। পাল্টে যায় নোরা। বুঝতে পারে, বাবার বাড়িতে সে ছিল বাবার হাতের পুতুল, স্বামীর বাড়ীতে স্বামীর হাতের পুতুল। যে জীবনটা সে এতদিন ধারণ করেছে সেটা তার সত্যিকারের জীবন নয়, তার নিজের জীবনটা যাপনের জন্য স্বামী, সন্তান, সংসার সব ছেড়ে পথে নামে নোরা। সমসাময়িক অারেক রাশান নারী, যে অাত্মহত্যার অাগে যেমন বলেছিল 'অামি ঈর্ষাকাতর নই, অামি অচরিতার্থ', ঠিক তেমনটিই মনে হয়েছিল নোরার। বাবার কাছে সে একটি ছোট্ট পুতুল, স্বামীর কাছেও তাই। সে বন্দী, বন্দি পুরুষতন্ত্রের কাছে। সামন্ততন্ত্র ভেঙে যে পুঁজিবাদ এলো, তাও তাঁকে মুক্তি দিতে পারলো না। তাই বাবা, স্বামী হেলমার বা প্রেম নিবেদনকারী ড. রেঙ্ক কেউ তাকে চরিতার্থ করে না। সে একা। সে বের হয় পথে। নোরা তাই অসাধারণ ও অনন্য।

সমসাময়িক সময়ে রাশিয়ায় বসে ১৮৭৩-৭৭ সাল ধরে টলস্টয় লিখলেন 'আন্না কারেনিনা'। রুশ বিপ্লবের নায়ক লেনিন টলস্টয় সম্পর্কে বলেছিলেন, 'তাঁর উপন্যাস ছিল রুশ বিপ্লবের দর্পন'। স্বামী স্টিভা, প্রেমিক ভ্রনস্কি কেউ তাকে চরিতার্থ করতে না পারায় অাত্মহত্যার অাগে উপরের কথাটা তিনিই বলেছিলেন। নোরা যেখানে নিজের জীবন যাপনের পথ খুঁজে পেতে পথে নামে, অচরিতার্থ অান্না সেখানে রেল লাইনে অাত্মহত্যা করে। স্বামী, প্রেমিক, সন্তান সব থাকতেও অান্না সেখানে একাই। সেও বলি সেই পুরুষতন্ত্রের। পুরুষতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ দুটোই শত্রু নোরা বা অান্নার।

এবার অাসি নিলুফার জেসমিনের কথায়। তিনি ইফাতের অাম্মা। ইফাত কে? সাফাতের ছোট ভাই, অাপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদারের স্ত্রী। সেই অখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে নিলুফার জেসমিনের যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে স্বামী দিলদার, সন্তান সাফাত কাউকে নিয়ে সে সুখী নয়। স্বামী মদ্যপ ও লম্পট, ছেলে সাফাত ধর্ষক। তার শংকা তার ছোট ছেলেটি ইফাতও নষ্ট হয়ে যায়নি তো! সংসারে তার কোন মুল্য নেই। স্বামী বা সন্তান কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। ছেলের স্ত্রীকে তালাক দেবার সময় তিনি না করেছিলেন, তার স্বামী বা সন্তান তার কোন কথা শোনেনি। তিনি বলেছেন, এত বিত্ত-বৈভবের মধ্যেও তিনি সুখী নন। তার কথা অনুযায়ী নিলুফার জেসমিনও একা এবং পুুরুষতন্ত্রের কাছে অসহায়। যেমন অসহায় ধর্ষিতা ছাত্রী দুটিও। পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিবাদ (যার অন্যনাম ভোগবাদ) তাদেরও শত্রু।

নোরা বা অান্নার যে পরিচয় অামরা পাই, তার সাথে নিলুফার জেসমিনের হয়তো কোন তুলনায় চলে না, তাছাড়া তার সম্পর্কে অামরা তেমন কিছু জানিও না। তবে এতটুকু বুঝা যায়, নোরা বা অান্নার মতো তিনিও পুরুষতন্ত্রের কাছে অসহায়। নোরা পথে নেমেছিল সব ছেড়ে। অান্না অাত্মহত্যা করেছিল। নিলুফার হয়তো তার কিছুই করবেন না। বরং এই সম্ভাবনা অাছে যে তিনি শেষ পর্যন্ত লম্পট স্বামী বা ধর্ষক সন্তানটির পক্ষ নিয়েই কাজ করবেন। তিনি হয়তো নিজেকেও চিনেন না বা হতে পারে নারী হয়েও তিনি পুরুষতন্ত্রেরই প্রতিনিধি। তবে তিনিও বন্দি, পুরুষতন্ত্রের কাছে, পুঁজিবাদের কাছে। তাহলে নারীর মুক্তি কোথায়?

কেউ বলবেন সমাজতন্ত্রে, কেউ বলবেন ধর্মে। বাংলাদেশের নারীরা বিপ্লবের ধ্বজাধারী বা ধর্মের লেবাসধারী কারো কাছে কি নিরাপদ? অনেকেই তো ভেবেছিল নোরা বা অান্না মুক্তি পাবে নতুন সমাজে, যেমনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সমাজতন্ত্র। ধর্ষিতা ছাত্রী বা নিলুফার জেসমিনকে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেবে কে?

অাজ বিশ্ব মা দিবস। প্রত্যাশা রাখি নিলুফার জেসমিনের ছোট ছেলে ইফাত মানুষ হবে, তার মায়ের অাশংকা ভুল প্রমাণিত হবে। অার অামরা ছেলে সন্তানরা যেন ধর্ষক না হই, বিশ্ব মা দিবসে এই অামাদের অঙ্গীকার হোক!

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা