মক্কা থেকে দামেস্ক: মুহাম্মদ (দ.) এর চিন্তার উৎকর্ষের ভ্রমণ

মাসকাওয়াথ আহসান

 

আজ মুসলিম পৃথিবীতে নিমজ্জন দেখে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে; ধর্মের উদ্দেশ্য যদি মানবিক ঐক্য হয় তবে আমাদের মাঝে এতো বিভাজন কেন। মহানবী মুহাম্মদ (দঃ) –এর মনে একই প্রশ্ন জেগেছিল মক্কার বিভাজিত সংস্কৃতি দেখে। উনাকে নিরক্ষর নবী বলে একটি ন্যারেটিভ প্রচলিত; অন্ধ খাদেম সমাজের অলৌকিক মুহাম্মদ চিত্রায়িত করার লেখালেখিতে;অতিবুদ্ধির কট্টর মুহাম্মদ বিরোধী শিবিরও সেটি লুফে নিয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদের (দঃ) প্রায়োগিক ব্যবসা শিক্ষার বিবরণ ও দামেস্কে কবি-লেখক-চিত্রকর-দার্শনিকের সঙ্গে তার নিয়মিত আড্ডার তথ্যগুলোর দিকে আমরা তাকিয়েছি খুব কমই।

দাদার মৃত্যুর পর মুহাম্মদ (দ.) পুরোপুরি যখন একা তখন তাকে চাচার ব্যবসায়ী সামগ্রী পরিবহণ ব্যবসায় কাজ দেয়া হয়। বেদুইন সমাজে শৈশব কাটায় উটকে কীভাবে বশ মানানো যায়; এই কৌশল তার মাঝে সহজাত ছিলো। যেহেতু বেদুইন সমাজের শিশুদের মাঝে প্রকৃতি ও প্রাণীর সঙ্গে একটি সাহজিক সম্পর্ক তৈরী হয়। ব্যবসা পরিবহনে হাজার খানেক উটের উপর পণ্যের বহর যেতো ইয়েমেনে ও দামেস্কে। মুহাম্মদ (দ.) বেছে নিয়েছিলেন দামেস্কের রুট। অন্যরা যখন উটকে পোষ মানাতে পারতো না; মুহাম্মদ (দ.)  তখন অনায়াসে একটা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারতেন; এই গুণটি খুব অল্প বয়েসেই খ্যাতি এনে দেয়। তার এই যোগাযোগের ক্ষমতা সবার সঙ্গেই ভালো ছিলো। সে সময় এরকম উটের বহরে পণ্য পরিবহণের সময় বিভিন্ন এলাকার বেদুইন সর্দার বা গোত্র প্রধানদের টোল দিতে হতো। এখনও যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সর্দাররাও পণ্য পরিবহণে টোল পান। এসব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সমঝোতা আলোচনাগুলোতে মুহাম্মদ খুবই দক্ষ ও বিনয়ী অথচ ঋজু ছিলেন।

মুহাম্মদ (দ.)  কোন বিশাল পণ্য বহরের পরিবহণের কাজে থাকলে; ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত থাকতেন কোথাও কোন সমস্যা হবেনা।কারণ মক্কা থেকে দামেস্ক এই যাত্রা পথের সব গোত্র প্রধানের প্রিয় হয়ে উঠে ছিলেন মুহাম্মদ (দ.)। উনি নিজের টাকা-পয়সার ব্যাপারে খুবই উদাসীন ছিলেন। উনি যা উপার্জন করতেন তার বেশীর ভাগই সুবিধা বঞ্চিতদের মাঝে বিতরণ করতেন গোপনে। কাছের বন্ধুরা অনেকেই মুহাম্মদকে (দ.) আরেকটু সচেতন হতে বলতেন ব্যক্তিগত  সঞ্চয়ের ব্যাপারে। কিন্তু মুহাম্মদ (দ.) যে একাকী শৈশবে বেড়ে উঠেছেন সেখানে পার্থিব পাওয়া-না পাওয়ার হিসেবগুলো অর্থহীন ছিল। প্রতিদিনের বেঁচে থাকাই যেখানে ছিল শোক ভুলে বাঁচার লড়াই। মক্কা থেকে দামেস্ক পরিবহণ বানিজ্যে মুহাম্মদ (দ.)  হয়ে ওঠেন আস্থার নাম।

দামেস্কে গিয়ে মুহাম্মদ (দ.) সেখানকার নাগরিক সমাজের চিন্তক থেকে ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে আড্ডার সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। দামেস্ক সাংস্কৃতিক মানে মক্কার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলো। মক্কার মোহর মুখী ফাঁপা সমাজের বিপরীতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এগিয়ে থাকা কসমোপলিটান দামেস্ক মুহাম্মদের খুব পছন্দ হয়েছিলো। তিনি দামেস্কের ইহুদী ও খৃস্টানদের কাছ থেকে তোরা ও বাইবেল ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেষ্টা করেন। বুঝতে পারেন মক্কায় যারা এই দুটি গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছিল, সেগুলো অপভ্রংশ ছিলো। মুহাম্মদ  (দ.) এসময় দামেস্কের ইহুদী ও খৃস্টান ধর্মের শিক্ষাবিদদের এই প্রশ্নটা রেখেছেন, ধর্মের লক্ষ্য যদি ঐক্য হয়; তাহলে আমরা এরকম বিভাজিত কেন!

মক্কা থেকে দামেস্ক যাবার পথে বাইজেনটাইন আমলের পরিত্যক্ত এক পোড়োবাড়ীতে একজন একাকী খৃস্টান সন্ন্যাসী বাস করতেন। তার নাম ছিল বাহেরিয়া বা সাগর। একটি মানুষ একা কেন একটা পরিত্যক্ত বাড়ীতে থাকবে; বাইবেলের কিছু পান্ডুলিপি পড়বে; তার অর্থ লিখবে; এই রোমান্টিকতা ও সমানুভূতিতে এরকম একজন সন্ন্যাসীর প্রতি আসেপাশের গোত্রের মানুষের ভালবাসা ছিল। নানা গোত্রের মানুষেরা তাকে খাবার দিয়ে যেত। অল্প কথা হতো। কিন্তু সাগর ছিলেন নিভৃতচারী চিন্তক; পারতপক্ষে পোড়োবাড়ীর বাইরে আসতেন না। এই সাগর একবার মুহাম্মদের (দ.) চাচার উট বহরটি থামিয়েছিলেন।আবহাওয়ার বিপর্যয়ের আশংকায়। সবাইকে তার আতিথ্য গ্রহণ করতে বলেছিলেন। মুহাম্মদের (দ.) চাচা তার বন্ধুদের নিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করলেও মুহাম্মদকে (দ.) রেখে আসেন বহর পাহারার কাজে। মুহাম্মদ (দ.) নিজেই এ আস্থা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সাগর অনুরোধ করেন বহরের কনিষ্ঠতম সদস্যটিকে নিয়ে আসতে। নৈশভোজের শেষে সাগর তার বাইবেলের পান্ডুলিপির একটি উদ্ধৃতি থেকে মানবিক ঐক্যের জন্য একজন সুনেতার আগমনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। মুহাম্মদের (দ.)  চাচাকে বলেন এই কিশোরের মাঝে একজন সুপারম্যান হবার সম্ভাবনার কথা। চাচা ও তার বন্ধুরা এটা হেসেই উড়িয়ে দেন। মুহাম্মদেরও (দ.) এতে কিছু এসে যায়নি। সাগর লোকটা একা একা থাকে। হয়তো সে কল্পনা প্রবণ পাগল ছাঁট মানুষ।

মুহাম্মদ (দ.) ফলিত ব্যবসা প্রশাসনে নিখুঁত একজন ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠেন। মক্কার যেসব ব্যবসায়ীর পরিবহণ ব্যবসা আছে তাদের সবারই মুহাম্মদকে (দ.) বিজনেস ম্যানেজার হিসেবে পাওয়া ছিলো সৌভাগ্যের ব্যাপার। সততা, পেশাদারিতার সম্মিলনে মুহাম্মদ (দ.) তখন মক্কায় প্রিয় মুখ। সুবিধা বঞ্চিত মানুষ থেকে ব্যবসায়িক নিও এলিট শ্রেণী সবাই মুহাম্মদের (দ.) প্রতি অনুরক্ত। কারণ ঐ যে; যে মানুষের নিজের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব থাকে না; অথচ অনায়াসে পাশে মানুষের দাঁড়ানোর মানবিকতা থাকে; তাকে মানুষ ভালবেসে ফেলে মনের অজান্তে।

মুহাম্মদ (দ.) এসময় তার চাচার মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব রাখেন। চাচা মুহাম্মদের (দ.) ক্যারিশম্যাটিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনার গুণমুগ্ধ হলেও এই বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করেন। ব্যবসায়ী চাচার মুহাম্মদকে (দ.) যোগ্য পাত্র মনে হয়নি। কারণ মুহাম্মদ (দ.) ব্যবসার কাজটা করলেও; সর্বনিম্ন মুনাফা ও সর্বোচ্চ মানব কল্যাণের চর্চা করতেন। বাস্তববাদী ব্যবসায়ী পিতা ভাবালুতাগ্রস্ত মুহাম্মদের  (দ.) মধ্যে হয়তো কোন কথিত সফল ভবিষ্যত দেখেননি। মুহাম্মদ (দ.) খুব দুঃখ পান এই প্রত্যাখ্যানে। চাচার ফার্মের চাকরী ছেড়ে নিজেই ট্রেডিং শুরু করেন। চাচাত বোনের সঙ্গে বিয়ে হলে হয়তো মুহাম্মদ (দ.)  বিবি খাদিজার সান্নিধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক সাফল্য তিনি পেয়েছেন; তা পেতেন না। মুহাম্মদ (দ.) যখন নৈরাশ্যের মধ্যেও নতুন ব্যবসা গড়ার কাজ করছেন, তখন খাদিজা তার বিজনেস ফার্মটি চালানোর জন্য একজন আস্থাবান ম্যানেজার খুঁজছিলেন। মক্কায় খাদিজা তখন অত্যন্ত অভিজাত উদ্যোক্তা নারী হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। তিনি তার পরিবহণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার কাজটি মুহাম্মদকে (দ.) দেন। প্রত্যক্ষ করেন মুহাম্মদের (দ.) সততা, পেশাদারিতা ও অধ্যবসায়। প্রথম মক্কা থেকে দামেস্ক সফরে একজন আস্থাভাজন কর্মচারীকে মুহাম্মদের (দ.)  ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠান। পর্যবেক্ষক লক্ষ্য করেন পথিমধ্যে মুহাম্মদ (দ.) চমৎকার সমঝোতার বাতাবরণে নির্বিঘ্নে পণ্যবহর নিয়ে পৌঁছে দেন দামেস্কে। সেখানে সমাজের আলোকিত মানুষদের সঙ্গে তার সখ্য; ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্ধুতার সাহজিক ও সৎ লেনদেন সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করেন খাদিজার নিযুক্ত গোয়েন্দা। ফেরার পথে একটি গাছের ছায়ার নীচে বসেন মুহাম্মদ (দ.) । সেখানে সেই খৃস্টিয় সন্ন্যাসী সাগর এসে আবার বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে মুহাম্মদকে মানব ঐক্যের নেতা হবার কথা মনে করিয়ে দেন। মুহাম্মদ (দ.) যথারীতি নিস্পৃহ ছিলেন। উনি অত বড় উচ্চাভিলাষ নিয়ে ঘুরতেন না।

মুহাম্মদের (দ.) ব্যবসায়িক কুশলতার এই প্রায় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খাদিজা মুগ্ধ হন। আর মুহাম্মদের (দ.)  মত কাজে সচেতন কিন্তু নিজের ব্যাপারে উদাসীন মানুষকে যে কোন বুদ্ধিদীপ্ত নারীরই ভালো লাগার কথা। আর মক্কার সমাজে খাদিজার কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করার অধিকার ছিলো। উনি বিয়ের প্রস্তাব রাখেন। যদিও মুহাম্মদ বয়েসে ছোট বলে আত্মীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ছিল; খাদিজার বাবাও একটু অমত করেছিলেন; কিন্তু মুহাম্মদ ও খাদিজার বিয়ে-বন্ধুতা মুহাম্মদের (দ.) জীবনের ইতিহাস বিনির্মাণের প্রয়োজনেই হয়তো নিয়তি নির্ধারিত ছিল। প্রত্যেক ইতিহাস বিনির্মাতা পুরুষের জীবনে একজন নারীর অবদান থাকে বা সফল নারীর পিছে একজন পুরুষের অনুপ্রেরণা; সেটা মুহাম্মাদের (দ.) জীবনে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। বিবি খাদিজার জীবনেও এটা দৃশ্যমান।

মুহাম্মদ (দ.)  ও খাদিজা মক্কা নগরীর অন্য নিও এলিটদের মতো সিল্কের পোশাক পরতেন না; তাঁতে বোনা কাপড় পরতেন; মক্কার এই লোক দেখানো বড়লোকি মুহাম্মদের (দ.) অপছন্দ ছিল। বিবি খাদিজাও সেই একই ভাবনার মানুষ।

মুহাম্মদ (দ.) ব্যবসার সঙ্গে না থাকায় উনার চাচার ব্যবসায়িক বিপর্যয় দেখা দেয়। তিনি চাচার ছেলে আলীকে (রা.) নিজের বাড়ীতে রেখে সন্তান স্নেহে বড় করেন। যে চাচা তাকে বড় হতে একটু সাহায্য করেছিলেন নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ছোট্ট কাজ দিয়ে; সেই চাচার ছেলেকে সন্তান স্নেহে বড় করে তোলেন মুহাম্মদ (দ.)। আর মক্কার সুবিধা বঞ্চিত মানুষের আশ্রয় ও আস্থার মানুষ হয়ে ওঠেন মুহাম্মদ-খাদিজা। মক্কায় একটি দার্শনিক-চিন্তক গোষ্ঠীকেও মুহাম্মদ (দ.)  প্রণোদনা দেন। কারণ মক্কার সেই অসাম্যের মোহরমুখী সমাজে সাংস্কৃতিক ও মনোজাগতিক পরিবর্তন জরুরী; 

সেটি মুহাম্মদ (দ.) অনুধাবন করেছিলেন।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা