মুহাম্মদ (সঃ)-এর মিস্টিক ঘরানার অনুশীলন (৩য় পর্ব)

মাসকাওয়াথ আহসান

ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে ‘হানিফ’ নামে একটি মিস্টিক ঘরানা চালু ছিল। এই হানিফেরা মনে করতেন কাবাগৃহের মাঝে সুসজ্জিত পাথরের মূর্তিতে কোন শক্তি নেই। শক্তি অদৃশ্য ও বিমূর্ত। হানিফেরা পর্বতের গুহায়,মরুদ্যানে বসে সেই অধরা শক্তিকে খুঁজতে ধ্যানমগ্ন হতেন। নিসর্গের মাঝে আত্মসমর্পণ করে রহস্য ভেদী সাধনায় নিমগ্ন হতেন। এরা চিন্তাভাবনার দিক থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ।ভারত এবং চীনে পাহাড়ে-জঙ্গলে সন্ন্যাস সাধনার যে প্রাচীন ঐতিহ্য ছিলো;মধ্যপ্রাচ্যেও তা অনুশীলিত হয় হানিফদের মাধ্যমে। মক্কার মত ফাঁপা ব্যবসা নগরীতে এই মিস্টিক ঘরানাকে সহ্য করতে পারতো না অশিক্ষিত লোকেরা যারা কাবার মূর্তিপূজার ব্যবসার অংশীদার ছিল। আজকের ধর্ম-ব্যবসায়ী কাঠমোল্লারা যেমন বাউলদের নিগৃহীত করে; তেমন ঘটনা সেইকালে মক্কায়ও ঘটেছে। হানিফেরা নিগৃহীত হয়েছে।কিশোর মুহাম্মদ এসব নিজের চোখে দেখেছেন। হানিফদের জীবন ধারাকে তার কাছে অনুপ্রেরণার অংশমনে হয়েছে। পরে বড় হয়ে ব্যবসার কাজে দামেস্কে গিয়ে যে প্রগতিশীল দর্শন চর্চারধারাটি খুঁজে পান তিনি; সেখানেও হানিফদের কথা শোনেন তিনি। তাই অদৃশ্য একসৃষ্টিকর্তার দর্শন আত্মস্থ করতে একসময় তিনি হানিফদের জীবনচর্যাটি অনুশীলন করতে শুরু করেন। হেরা গুহায় গিয়ে ধ্যানমগ্ন হওয়ার ধারণাটি তিনি হানিফ ঘরানা থেকেই লাভ করেন।

শ্বাস-প্রশাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের আধ্যাত্মিক সাধকদের চিন্তা ও শারীরিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাকে নিয়ন্ত্রণের যে অনুশীলন প্রচলিত রয়েছে; হানিফদের সেই একই অনুশীলন ছিল; মুহাম্মদ শরীর-মনের সেই শক্তির সাযুজ্য আনতে মাঝে মধ্যেই ধ্যানমগ্ন হতে যেতেন হেরা গুহায়। কারণ মক্কানগরীর মানুষের পার্থিবমোহ, নির্বোধ অন্ধকার কলহপ্রিয়তায় তিনি মানসিকভাবে বিপন্ন বোধ করতেন। তিনি চাইতেন এদের আলোকিত করতে; কিন্তু কীভাবে করবেন তার কূলকিনারা করতে পারতেন না। তাই সুযোগ পেলেই হেরা গুহায় যেতেন; সেখানে ওঠা নামার যে চড়াই-উতরাই সেটাও ছিল ‘হানিফ’ ঘরানার কষ্ট সহিষ্ণুতার মাঝ দিয়ে অসীমকে আরাধনার অংশ। হেরা থেকে এসে মক্কা নগরীতে ঢুকেই মুহাম্মদ প্রথমেই কাবা গৃহটি প্রদক্ষিণ করতেন। তিনি পৌত্তলিকতার গৃহ কাবা আর তার অসীমতার সাধনার হেরা গুহার ভাবনার পার্থক্যগুলো খুঁজতে থাকেন মনে মনে।

একবার ভয়ংকর প্লাবন এসে কাবা গৃহকে গুঁড়িয়ে দেয়।মুহাম্মদ (সঃ) তখন হেরা গুহায়। কুরাইশেরা তড়িঘড়ি করে এবার খানিকটা উঁচু ভিত্তির উপর কাবা গৃহ পুনঃনির্মাণ করে। কারণ এদের কাবাকে ঘিরে বিরাট ব্যবসা; পাছে লোকজন একে কোন অশনি সংকেত বলে ধরে নেয়; তাই কালক্ষেপন করে না কাবার কুরাইশ ঠিকাদারেরা।কিন্তু কাবার ভেতরে যে হজর-এ-আসওয়াদ বা কালো পাথরটি রয়েছে তা কোন গোত্রের লোকেরা স্থাপন করবে তা নিয়ে বহুদলীয় কোন্দল শুরু হয়। কেউ কেউ জন্তু জানোয়ার বলি দিয়ে সেই রক্ত নিয়ে চলে আসে; দেখিয়ে শাসায়, তাদের গোত্রকে কালো-পাথর স্থাপনের সুযোগ না দিলে রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে। তখন ঠিক করা হয়, সবাই যেহেতু উত্তেজিত তাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ কারো পরামর্শ নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরী। ঠিক হলো অতি প্রত্যুষে যে ব্যক্তি প্রথম কাবার কাছে  আসবে, তার পরামর্শ নেয়া হবে। হেরা গুহা থেকে ফিরে মুহাম্মদ (সঃ) প্রথমেই কাবা প্রদক্ষিণ করতে আসেন নিয়ম অনুযায়ী। সুতরাং তিনিই হয়ে পড়েন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তদানকারী। মুহাম্মদ (সঃ) অত্যন্ত গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক সমাধান দেন। এই কালো পাথরটি ফুটবল আকৃতির; একজন ব্যক্তির পক্ষেই এটি স্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু তিনি একটি কাপড় আনিয়ে তার ওপরে কালোপাথর রেখে বিবাদমান গ্রুপগুলোর একজন করে প্রতিনিধিকে সে কাপড়ের নানাপ্রান্ত ধরে তা বহনের সিদ্ধান্ত দেন। মূল স্থানে স্থাপনের কাজটি তিনি নিজেই করেন। ইব্রাহিম (আঃ) এই কালোপাথরটি কাবায় স্থাপন করেছিলেন। এটি দূর থেকে কালো দেখালেও এতে রয়েছে লাল-সবুজ নানা বর্ণের আঁকিবুকি।

৪০ সংখ্যাটি সে সময়ের মধ্যপ্রাচ্যে খুবই সুচিহ্নিত ছিল।নুহ নবীর নৌকাটি ৪০ দিনের প্লাবনের সঙ্গে লড়ে টিকে ছিল, মুসা নবী সিনাই পর্বতে ছিলেন ৪০ দিন, ঈসা নবী (যীশু) ভীতিপ্রদ বিবমিষার ৪০ দিন কাটিয়েছিলেন। ফলে মুহাম্মদ(সঃ)-এর ৪০ বছরে আলোক চক্ষুর উন্মীলন বা অসীমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ঘটনাটি সেই সোনালী সংখ্যার ধারাবাহিকতা বলেই মনে হয়।

 হেরা পর্বতে জিব্রাইল ফেরেশতা এসে মুহাম্মদ (সঃ)কে যে সৃষ্টিকর্তার বার্তা দিয়ে গেলেন; এটি একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয়; যাকে ফিজিক্যালি খোঁজ খবরের চেষ্টা করি আমরা। মুহাম্মদের নিজের কাছেই তো প্রথমে বিষয়টিকে ভ্রান্ত-অধ্যাস বলে মনে হয়। উনার মনে হতে থাকে উনার শারীরিক সামর্থ্যের ওপর ঝড় বয়ে গেছে; কেউ যেন হৃদয় চিরে, পড়ো তোমার সৃষ্টিকর্তার নামে লিখে গেছে। মুহাম্মাদের প্রাথমিকভাবে মনে হয় বিষয়টি মক্কার কেউ শুনলে নির্ঘাত তাকে কবি বা পাগল ভাববে। উনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু হেরার গিরিখাঁজে দাঁড়িয়ে তিনি যখন আত্মহত্যার মুখে; তখন যেদিকে তাকান মনে হয় জিব্রাইল ফেরেশতা তাকে বলতে থাকেন; তুমি সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক। এই পুরো ঘটনাটির মধ্যে মিস্টিসিজম আছে, প্রতীক আছে।অন্তর্চক্ষুর উন্মীলন বা আধ্যাত্মিক শক্তির উদ্ভাস কিংবা জিব্রাইলের আগমন ও ওহী নাজেল যেভাবেই বিষয়টিকে দেখা হোকনা কেন তাতে মুহাম্মদের সুকৃতির কোন ক্ষতিবৃদ্ধি ঘটেনা; পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্ম-দর্শন সুপ্রতিষ্ঠিত করার মধ্যে দিয়ে শ্রেষ্ঠ নবী বা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবশ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে উনার সক্ষমতার সুচিহ্ন রেখেছেন উনি।

হেরা পর্বতের গিরিখাঁজ থেকে কোনমতে বাড়ী ফেরেন মুহাম্মদ।ঘটনাটি বিবি খাদিজাকে বলেন তিনি। মুহাম্মদ (সঃ) যেভাবে আল্লাহর প্রেরিত বাণীটি খাদিজা (রাঃ)-র সামনে উচ্চারণ করেন, খাদিজা বিস্মিত হন। কারণ যে মুহাম্মদকে চেনেন তিনি, তিনি মেধাবী-আস্থাভাজন; কিন্তু এতো পরিশীলিত উচ্চারণে কথা বলার ক্ষমতা উনার আগে ছিলোনা। এখানে লৌকিক ও অলৌকিক উপাদানের মিশেলে মিস্টিসিজম আছে। যেটিকে স্কিজোফ্রেনিয়া-বাইপোলার ডিস-অর্ডার বা ব্রেণের কেমিক্যাল ইমব্যালান্স হিসেবে নাকচ করে দেয়া খুবই ক্লিশে চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে তো জীবনের গভীরের জীবনের কোন অনুসন্ধান পৃথিবীতে ঘটতো না। ‘বোধ’ বিষয়টিকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে যেভাবে উপলব্ধি করা যায়; বিজ্ঞানের কোন সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করবো তাকে!

ঐরাতে মুহাম্মদ ঘুমিয়ে গেলে বিবি খাদিজা তার আত্মীয় ওয়ারাকার বাসায় যান। তাকে ঘটনাটা বলেন। ওয়ারাকার কাছেও এটাকে কোন সাধারণ ঘটনা বলে মনে হয়না। মুহাম্মদ (সঃ) বিবি খাদিজাকে বলেছিলেন, ঐ অশরীরি আত্মা বা ফেরেশতা যেই ভর করুক না কেন; মনে হয় যেন হৃদপিন্ড ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওয়ারাকা বলেছিলেন,মুহাম্মদকে তার হৃদপিন্ডটিকে শক্ত করতে হবে। এরপর দুবছর মুহাম্মদ (সঃ) নীরবতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সেই হানিফ ঘরানার চিন্তকদের মতো জনশূণ্য পাহাড়ের ঢালে ঘুরতে থাকেন। অপেক্ষা করতে থাকেন নতুন কোন বার্তার। এদুবছর ছিল উনার জীবনে বিরাট পরীক্ষার বছর। ব্যবসা বানিজ্যে মনোনিবেশ করতে পারেন না। হয়তো এ ছিল প্রস্তুতিকাল সৃষ্টিকর্তার বার্তাবাহক হিসেবে বড় কর্তব্য পালনের। বিবি খাদিজা বুঝতে পারেন;তাদের এতদিনের যাপিত জীবনে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে; হয়তো ভালোর জন্যেই। পরিবার বা ব্যক্তিজীবনের বাইরে মানবসভ্যতার জন্য সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারলে সেটা তো জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্য পূরণ।

এখন আজকের দিনের ধর্ম ব্যবসায়ী ও কাঠ মোল্লারা যেরকম ধর্মে পূর্ণ আস্থা স্থাপন করে এর ভাবমূর্তির ঠিকাদারি নিয়ে বসে আছে; তারা জানে না যে পবিত্র কুরান শরীফেই সংশয়বাদকে উতসাহিত করা হয়েছে। কারণ কোন বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বসে থাকা এক অর্থে জ্ঞানার্জনের পথে থেমে যাওয়া। ধর্মের রুহ বা প্রশাসবায়ু হচ্ছে সংশয়। আল্লাহ নিজেই চান মানুষ নিরন্তর প্রশ্নের মাঝ দিয়ে নিজের জ্ঞানের উঠোনটিকে আলোকিত করবে। এই সংশয়টুকু না থাকলে মানুষ নিজে থেকে কোন কিছু করার চেষ্টাই করবে না। সবকিছুতেই ইনশাল্লাহ বলে হাত গুঁটিয়ে বসে থাকবে। আর ইসলাম ধর্ম-দর্শনে বাহাজ বা বিতর্ককে উতসাহিত করা হয়েছে। কারণ সংলাপই সভ্যতার ভিত্তি। নিজের ধারণার পক্ষে উপসং হার টেনে সৃষ্টিকর্তা আছেন বা নাই বলে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াই বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যু।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা