স্ট্যালিন কি কিরভকে হত্যা করেছিলেন?

অাশানুর রহমান খোকন

দি স্মোনলি ইনষ্টিটিউট। ১৭৬৪ সালে এই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের অদূরে নারীদের শিক্ষাদানের একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে। কিন্তু রাশিয়ার ইতিহাসে স্মোনলি ইনষ্টিটিউটের গুরুত্ব অন্যখানে। রুশ বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবের নায়ক লেনিন ঐ ভবনটিকে বলশেভিকদের প্রধান কার্য্যালয় হিসাবে ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয় বিপ্লবের পরেও ১৯১৮ সালে মার্চে মস্কোর ক্রেমলিনে সরকার স্থানান্তর হবার অাগ পর্যন্ত ঐ ভবনটিতে লেনিন বাস করতেন এবং সরকারের প্রধান কার্য্যালয় হিসাবে ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে সেন্ট পিটার্সবার্গের নাম হয় লেনিনগ্রাদ।

অারো একটি কারণে স্মোনলি ইনষ্টিটিউট ইতিহাসে বহু মানুষের অাগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়। ১৯৩৪ সালের ১ লা ডিসেম্বর লেনিনগ্রাদ সরকারের প্রধান কার্য্যালয় ঐ স্মোলনি ভবনের ৩য় তলায় সন্ধার কাছাকাছি সময়ে খুন হন কমরেড স্ট্যালিনের শাসনামলে অত্যন্ত জনপ্রিয়, কেন্দ্রীয় ও পলিটব্যুরোর সদস্য, লেনিনগ্রাদ সরকারের প্রধান কমরেড সের্গেই কিরভ। যে হত্যাকান্ডটির রহস্য উন্মোচনের জন্য সোভিয়েত অামলে তিন তিন বার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। খোদ কমরেড স্ট্যালিন নিজে তদন্ত কাজ তদারক করেন ১৯৩৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। ১৯৫৫ সালে নিকিতা ক্রশ্চেভ ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক পি এন পোসপেলভের নেতৃত্বে অারেকটি কমিশন গঠন করেন। সর্বশেষ কমিশনটি গঠন করেন গর্বাচেভ ১৯৮৯ সালে যার নেতৃত্ব দেন এ এন ইয়াকোভেলেভ। ফলে দেশে বিদেশে কমরেড কিরভ হত্যাকান্ড কি পরিমাণ অাগ্রহের কারণ হয়েছে সেটা সহজেই অনুমেয়।

বলা হয়, বিংশ শতাব্দীর সব থেকে রহস্যজনক হত্যাকান্ড ছিল সেটা। সেই হত্যার অভিযোগে এবং হত্যায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে অন্তত: ১১৭ জনকে সরাসরি প্রাণ দিতে হয়। বলশেভিক পার্টির অভ্যন্তরে কিরভকে স্ট্যালিনের ঘনিষ্ঠ হিসাবেই বিবেচনা করা হতো। ১৯২৫ সালের ২৪তম পার্টি কংগ্রেসে লেনিনগ্রাদের পার্টি প্রতিনিধিরা জিনোভিয়েভের পক্ষ নিলে স্ট্যালিন জিনোভিয়েভকে সরিয়ে কমরেড কিরভকে স্ট্যালিনগ্রাদের দায়িত্ব দেন।

বলা বাহুল্য, কিরভ স্ট্যালিনের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও খুশী হননি। সে কথা তিনি তাঁর স্ত্রীকে একবার বলেছিলেনও। তবু দলের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেন। ১৯২৬ সালে তিনি লেনিনগ্রাদের দায়িত্ব নেন। স্ট্যালিনের প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনা তিনিই সর্বপ্রথম সফলভাবে সম্পন্ন করেন। দল ও জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অসম্ভব। তিনি অসম্ভব সুন্দর বক্তৃতা করতেন, ছিলেন ক্যারেশমেটিক। কমরেড লেনিন মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বিখ্যাত উইলে, পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের যে সমালোচনা করেন, বিশেষ করে কমরেড স্ট্যালিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে 'তাঁর থেকে কম রুঢ় ও মানবিক' কাউকে দলের সাধারণ সম্পাদক করার যে পরামর্শ দেন, অনেকে কমরেড কিরভের মধ্যে সেই সব গুনাবলীর সমাবেশ দেখতে পেতেন এবং তাঁকে কমরেড স্ট্যালিনের সম্ভাব্য উত্তরসুরী হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেন।

এহেন কমরেড কিরভ কিনা খুন হলেন ১৯৩৪ সালের পহেলা ডিসেম্বর! অন্যদিকে নিকোলায়েভ জন্মগ্রহণ করে একটি দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলা থেকে অপুষ্টি নিয়ে বড় হতে থাকা পাতলা শরীরের নিকোলায়েভ লম্বায় ছিল পাঁচ ফুট। রুশ বিপ্লব, দরিদ্র নিকোলায়েভের জীবনে স্বপ্ন পূরণের এক বিপুল হাত ছানি নিয়ে অাসে। নিজেকে একজন সত্যিকারের কমিউনিষ্ট হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে । বিয়ে করে পার্টির অারেক সক্রিয় কর্মী মিলদা দ্রুলিকে। মিলদা কাজ করতো স্মোলনি ইনষ্টিটিউটে। একমাত্র ছেলের সে নাম রাখে কার্ল মার্কস। সে লেনিনগ্রাদে পার্টির বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ-কর্ম দেখাশুনা করতো। সর্বশেষ সে কাজ করতো 'ইনষ্টিটিউট অব পার্টি হিষ্ট্রি' অফিসে। কিন্তু সহকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। অধ্বঃস্তনদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে সে চাকুরীচ্যুত হয় ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে এবং সে দলের সদস্যপদও হারায়।

হতাশ নিকোলায়েভ প্রথমে অাত্মহত্যা করার কথা ভাবে, পরে প্রতিশোধ নেবার চিন্তা করে। কথাটা তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে বলেও ফেলে। ১৯৩৪ সালের ১ লা ডিসেম্বর সন্ধার কাছাকাছি সময়ে সে স্মোলনি অফিসের তিন তলায় পৌঁছায়, যেখানে কমরেড কিরভের অফিস কক্ষ ছিল। কিরভের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সংখ্যা পূর্বের থেকে কমানো হয়েছিল। ৪ জন দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও সেদিন মাত্র দু'জন সে সময় উপস্থিত ছিল। যার মধ্যে একজন ছিল কিরভের বডিগার্ড এম ডি বরিস। কিরভ যখন বরিসকে কিছু খাবার অানতে বলে অফিস কক্ষে ঢুকতে যাচ্ছিল, তখন পেছন থেকে ঘাড়ের কাছে গুলি করে তাঁকে হত্যা করে নিকোলায়েভ । কিরভ হত্যাকান্ডের পর নিকোলায়েভ গ্রেফতার হন। ১৯৩৪ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর এক রায়ে সে সহ অারো তের জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং রায় প্রদানের দুই ঘণ্টার মধ্যে সেই রায় কার্যকর করা হয়। উপরে যতটুকু বলা হলো সে পর্যন্ত বেশ সরলই মনে হবে।

তবে কিরভ হত্যাকান্ডটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটা বোঝা যাবে পরবর্তী ঘটনাবলীগুলো মধ্যে। কিরভ যেদিন মারা গেলেন স্ট্যালিন দুটো অাইন জারী করলেন। এক, রাশিয়ার গুপ্ত পুলিশ (NKVD) কোন ধরণের কারণ দর্শানো ছাড়াই যে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং দুই, যে কাউকে যে কোন সময়ের জন্য বিনা বিচারে অাটকে রাখতে পারবে। গত ৮৩ বছরে কিরভ হত্যাকান্ড নিয়ে তিনটি মতামত লক্ষ্য করা যায়। প্রথম মতটি এরকম, যারা মনে করেন এটা নিছক একটি সাদামাটা হত্যাকান্ড। ঘাতক নিকোলায়েভ একজন মানসিক রোগগ্রস্ত ব্যক্তি। চাকুরি হারিয়ে, দলচ্যুত হয়ে সে হতাশায় ভুগছিল। এই পক্ষ অারো বিশ্বাস করেন যে, নিকোলায়েভের স্ত্রী মিলদা যে কিনা কিরভের অফিসেই কাজ করতো, নিকোলায়েভের মনে এরকম একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, তার স্ত্রীর সাথে কিরভের একটি সম্পর্ক ছিল। যদিও এই সম্পর্ক বিষয়ে কোন প্রমাণ তারা দিতে পারেনি।

দ্বিতীয় মতটি, যারা স্ট্যালিনের সমর্থক তাদের। তারা মনে করেন কিরভ হত্যাকান্ডটি একটি বিরাট ষড়যন্ত্রের অংশ। সেই ষড়যন্ত্রের নায়ক জিনোভিয়েভ -কামেনেভ অার পিছনের মদদদাতা লিও ট্রটস্কি। এরা ঘাতক নিকোলায়েভকে পুরোনো বলশেভিক অর্থাৎ জিনোভিয়েভের সমর্থক হিসাবে প্রচার করেন।

সেই হত্যাকান্ডের পর ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান ও 'কথিত' বিচার পরিচালনা করা হয়েছিল। ৮ লক্ষ্য ৫০ হাজার পার্টি সদস্যকে দল থেকে বহিস্কার করা হলো, যা ছিল সেই সময়ে মোট পার্টি সদস্যের ৩৬%। হাজার হাজার মানুষকে শ্রম শিবিরে পাঠানো হলো, শত শত মানুষকে হত্যা করা হলো। এই পক্ষ বলে থাকেন যে এরকম ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান না চালালে ২য় বিশ্বযুদ্ধে কোন ধরণের প্রতিরোধ ছাড়াই রাশিয়াকে অাত্মসমর্পণ করতে হতো এবং রাশিয়া অাবার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ফিরে যেতো। এই পক্ষের সর্বশেষ কলমযোদ্ধা হলেন মার্কিন অধ্যাপক Grover Furr. তিনি ২০১১ সালে একটি বই লিখেছেন এবং বইটির নাম হলো- "The Murder of Sergei Kirov: History, Scholaship and the Anti-Stalin Paradigm".

তৃতীয় ও সর্বশেষ মতটি স্ট্যালিন বিরোধীদের। যার মধ্যে নিকিতা ক্রুশ্চেভও একজন। এছাড়া নিউইয়র্ক টাইমস্, রাশিয়ার গুপ্ত পুলিশের প্রাক্তন কিছু কর্মকর্তারা এই মতকে সমর্থন করে থাকেন। তাদের মতে স্ট্যালিনের নির্দেশে লেনিনগ্রাদের গুপ্ত পুলিশ নিকোলায়েভকে দিয়ে কিরভকে হত্যা করান। স্ট্যালিন এই হত্যাকান্ডকে কাজে লাগিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারেন। প্রথমত, কিরভ ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন রুশ ভাষায় অসম্ভব বাগ্মী, ক্যারেশমেটিক, নমনীয় ও বিনয়ী। ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পার্টির ১৭তম কংগ্রেসে কমরেড স্ট্যালিন যেখানে ২৬৭টি নেগেটিভ ভোট পান, কমরেড কিরভ পেয়েছিলেন ৩ টি। স্ট্যালিন কিরভের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিলেন। তাছাড়া অন্তত দুটো বিষয়ে পলিটব্যুরোতে স্ট্যালিন, কিরভের বিরোধিতার কারণে সিদ্ধান্ত পাশ করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে M N Riutin ২০০ পৃষ্ঠার একটি দলিল প্রকাশ করে বিলি করেন এবং স্ট্যালিনের অপসারণের দাবী জানান। তাকে মৃত্যুদন্ড দেবার প্রস্তাব কিরভ বিরোধিতা করেন এবং পলিটব্যুরোর অন্য সদস্যরা কিরভকে সমর্থন করেন। যদিও তাকে ১০ বছরের জেল দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালের বিরাট শুদ্ধি অভিযানের সময় তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯৩৩ সালে। A P Sminov কে মৃত্যুদন্ড দেবার প্রস্তাব কিরভ ও পলিটব্যুরোর বিরোধিতায় পন্ড হয়ে যায়। যে কারণে একসময় স্ট্যালিনের ঘনিষ্ঠ ও উত্তরসূরী হিসাবে বিবেচিত কমরেড কিরভের সাথে কমরেড স্ট্যালিনের দূরত্ব বাড়তে থাকে। তাছাড়া লেনিনগ্রাদকে স্ট্যালিন শত্রুজ্ঞান করতেন। লেনিনগ্রাদ শহর হিসাবে যেন যতটা না রাশিয়ান তার থেকেও ইউরোপিয়ান। লেনিনগ্রাদ পার্টি জিনোভিয়েভের সমর্থক ছিল। সেখানকার জিনোভিয়েভ এর সমর্থকদের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও কিরভ তাদেরকে দলে ফিরিয়ে নিতে অাগ্রহী ছিলেন। সর্বশেষ ১৯৩৪ সালে লেনিনগ্রাদ গুপ্তপুলিশের প্রধান মেদনেভ যে কিনা কিরভের ব্যক্তিগত বন্ধু ছিল তাকে ঐ পদ থেকে স্ট্যালিন সরাতে চেয়েছিলেন কিন্তু কিরভের বিরোধিতায় সেটা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে বলশেভিক পার্টির ইতিহাস যারা জানেন তারা জানেন যে, লেনিন পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে বলশেভিক পার্টির অভ্যন্তরে স্ট্যালিনকে ডান ও বামপন্থীদের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তিনি ট্রটস্কিকে ঠেকাতে প্রথমে জিনোভিয়েভ ও কামেনভের সাথে জোট গড়েন। লেনিনের স্ত্রী নক্রুপ্সকায়া তখন তাদের সাথেই ছিলেন। ট্রটস্কিকে কোনঠাসা ও দুর্বল করে ফেলার পর, ১৯২৫ সালে এসে জিনোভিয়েভ -কামেনেভের সাথে তিনি বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় জিনোভিয়েভ-কামেনেভ-নক্রপ্সকায়া এক পক্ষে ছিলেন। সে সময় স্ট্যালিন বুখারিন সাথে নিয়ে অন্য পক্ষকে মোকাবেলা করতে থাকেন। সে সময় স্ট্যালিন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কমরেড নক্রুপ্সকায়া বলেন, " অাজ কমরেড লেনিন বেঁচে থাকলে তাঁকেও হয়তো জেলে যেতে হতো'। এই কথাটা উল্লেখ করেন লিও ট্রটস্কি ১৯৩৪ সালে কিরভ হত্যাকান্ডের পর ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে লেখা তাঁর প্রতিক্রিয়ায়। ফলে স্ট্যালিন বিরোধিরা মনে করেন কমরেড কিরভ হত্যাকান্ডের ভিতর দিয়ে স্ট্যালিন তাঁর বিরোধিদের সমূলে নির্মূল করার সুযোগটির পূর্ণ সদ্বব্যবহার করেন। কমরেড স্ট্যালিন নিজে এই হত্যার তদন্তে জড়িয়ে পড়েন। ডিসেম্বরের ২ তারিখে কিরভের বডিগার্ড বরিসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মস্কো নেবার পথে সে দুর্ঘটনায় সে মারা যায়। স্ট্যালিন বিরোধিরা মনে করেন লেনিনগ্রাদের গুপ্ত পুলিশের ট্রাক এই 'দুঘটনাটি' ঘটায়। অর্থাৎ এটাও হত্যা।

এখানে লেনিনগ্রাদের গুপ্ত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। স্ট্যালিন বিরোধীদের মতে স্ট্যালিন তখন NKVD এর কমিশনার গ্রেগরি জোগেদাকে নির্দেশ দেন লেনিনগ্রাদ গুপ্ত পুলিশ প্রধান মেদভেদকে (যে কিনা কিরভের বন্ধু) সরিয়ে তার জায়গায় গ্রেগরি ইয়েমেভিচকে নিয়োগ দিতে। কিরভ সেই নিয়োগের বিরোধিতা করেন। গুপ্ত পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা অালেক্সজান্ডার অরলভের মতে 'গ্রেগরি জোগেদা তখন কিরভ হত্যার দায়িত্বটি মেদনেভের ডেপুটি ভেনিয়া জাপরোজেহটস্ কে দেয়'। সে তখন লেনিনগ্রাদে ফিরে এসে নিকোলায়েভের এক বন্ধুর মাধ্যমে তাকে খুঁজে পায়। উল্লেখ্য যে হতাশ নিকোলায়েভ যখন প্রতিশোধ নেবার কথা ভাবছিল সেই কথাটা সে তার এই বন্ধুটিকে বলেছিল। তার সেই বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করে খবরটি লেনিনগ্রাদ গুপ্ত পুলিশকে জানিয়ে রেখেছিল। ফলে বিগত কয়েকমাস ধরেই নিকোলায়েভ পুলিশের নজর বন্দী ছিল। জাপরোজেহটস্ তখন সেই বন্ধুটিকে কাজে লাগিয়ে তার হাতে টাকা এবং ৭.৬২ এমএম এর Nagant M1895 রিভলভার প্রদান করে। ১৯৩৪ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি তার প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়ে যায়। একটি ব্রিফকেসে রিভলভার ভরে সে প্রধান ফটক দিয়ে স্মোলনি ভবনে প্রবেশ করতে সক্ষম হলেও একজন নিরাপত্তারক্ষী তাকে চ্যালেঞ্জ করে। সে ধরা পড়লেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে রিভলভারসহ ছেড়ে দেয়া হয়, শুধু তাই নয় তাকে রিভলভার রাখার অনুমতিও দেয়া হয়। এটা কোন স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কাজটি ছিল সম্পূর্ণ বেঅাইনি।

ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় অাসার পর যে তদন্ত কমিশন গঠন করে, সেই কমিশন এই প্রশ্ন তুলেছিল অার ক্রুশ্চেভ ২০ তম কংগ্রেসে বিষয়টি বক্তব্য অাকারে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ' কিরভ হত্যার অনেক বিষয় অব্যাখ্যাত এবং রহস্যজনক'। সেই রিপোর্টে কিরভের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিসের সংখ্যা কমানো হয়েছিল স্ট্যালিনের নির্দেশে সেটাও উল্লেখ করা হয়।

সেই রিপোর্ট অনুযায়ী স্ট্যালিন যখন নিকোলায়েভকে জিজ্ঞাসা করেন কেন সে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে? উত্তরে নিকোলায়েভ বলেছিল, 'NKVD এর অফিসারের নির্দেশে সে এই কাজ করেছিল'। সেই সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা অলিক্সি এই ঘটনা উক্ত তদন্ত কমিটিকে বর্ণনা করেন। কিরভ হত্যা সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘটনাবলীর উপর পরবর্তী ৪/৫ বছর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। অাগেই বলা হয়েছে নিকোলায়েভসহ ১৩ জনকে ২৯ ডিসেম্বর মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। যে বন্ধুটিকে দিয়ে গুপ্ত পুলিশ নিকোলায়েভকে রিক্রুট করে তাকেও খুন করা হয়। তিন মাস পর নিকোলায়েভের স্ত্রী মিলদাকেও মৃত্যদন্ড দেয়া হয়। নিকোলায়েভের ৮৫ বছরের বৃদ্ধা মা, ভাই, বোন ও কাজিনদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাউকে হত্যা করা হয়, কাউকে কাউকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাবরণ করতে হয়। নিকোলায়েভের শিশুসন্তান কার্ল মার্কসকে শিশুসদনে পাঠানো হয়। মানসিক বিকারগ্রস্তভাবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সে বেঁচে ছিল। দায়িত্বে অবহেলার কারণে লেনিনগ্রাদ গুপ্ত পুলিশের সদস্যদেরকে তখন স্বল্প মেয়াদি জেল দেয়া হলেও ১৯৩৭ সালে তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়। কিরভ হত্যার পর বলশেভিক পার্টি, রেড অার্মি, কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্য যে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান চলে বিশেষত ১৯৩৬-৩৮ সালে তাতে অনুমান করা হয় কমপক্ষে ৬ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। স্ট্যালিন বিরোধীরা অবশ্য সংখ্যাটি ৩০ লক্ষ বলে থাকেন।

ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৮,৫০,০০০ পার্টি সদস্যকে বহিস্কার করা হয়। মার্কসীয় তাত্ত্বিক বরিস নিকোলাভয়েম্কির মতে, " কিরভের মৃত্যুতে একটি মাত্র ব্যক্তি লাভবান হয়েছিল, তিনি স্ট্যালিন "। Alexander Barmine এর ১৯৪৫ সালে লেখা "One Who Survived'; Alexander Orlov এর ১৯৫৩ সালে লেখা "The Secrect History of Stalin's Crime; Boris Nikolaevsky এর ১৯৪১ সালে লেখা "The Kirov Assassination"; Amy Knight এর ১৯৯৭ সালে লেখা "Who Killed Kirov?" এবং David Priesland এর লেখা "The Red Flag" বইগুলোতে কিরভ হত্যার জন্য কম-বেশী স্ট্যালিন কে দায়ী করা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি মার্কসবাদী কিন্তু স্ট্যালিনের সমালোচনাকারী বহু বামপন্থী দল উপরোক্ত মতামতে কম-বেশী অাস্থা রাখে। অবশেষে ১৯৮৯ সালে গর্বাচেভ এ এন ইয়াবোভেলেভের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করে সেই রিপোর্টে বলা হয় 'কিরভ হত্যায় স্ট্যালিন বা NKVD এর জড়িত থাকার বাস্তব কোন ভিত্তি নেই'। গত ৮৩ বছরেও কিরভ হত্যার বিতর্কের কোন মীমাংসা হয়নি। কোনদিন হবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। গত ১০০ বছরেও বামপন্থী দলের মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বী অার শ্রেণীশত্রুর মধ্যকার পার্থক্যটুকু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অামরা অাজো সুস্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছি। গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে অামরা শত্রু-মিত্র নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়েছি বলেই, যতনা শত্রু মেরেছি তার থেকে বেশী হত্যা করেছি নিজেদের কর্মীদেরকে। রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে অামরা কী একটু নিজেদের দিকে ফিরে তাকাবো?

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা