দেবী থেমিস বিতর্ক: প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ফরহাদ মজহার

 

দেবী থেমিসের মূর্তি সম্পর্কে শেখ হাসিনা তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছেন ঠিকই, এমনকি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ বিষয়ে কথাও বলেছেন, কিন্তু মূর্তি প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে সরানো হয় নি। প্রধান বিচারপতি স্বয়ং নিজ সিদ্ধান্তে এই মূর্তি সরিয়েছেন। যে যুক্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার জন্য আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাই।

বাংলাদেশে কোন বিষয় নিয়েই সুস্থ সামাজিক তর্ক বিতর্ক করা যায় না। এই ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সুস্থ গণপরিসর নির্মাণ না করে দলবাজি, হিংসা, উসকানি আর অপপ্রচারে অধিকাংশ সময় নিয়োজিত থাকে। যা জাতীয় খবর নয় তাকে জবদস্তি খবর বানানোর কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খবর যথাযোগ্য মর্যাদা পায় না। প্রধান বিচারপতি যে যুক্তিতে দেবি থেমিস অপসারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা বিচার বিভাগকে বিতর্কের উর্ধে রাখা এবং বিচার বিভাগের নৈতিক বৈধতা সুরক্ষা। এটা পত্রিকা থেকেই জেনেছি, কিন্তু এই জরুরী খবরটি একদমই গুরুত্ব পায় নি।

আজ দেখছি দেবি থমিস অপসারণের বিরুদ্ধে কিছু তরুণের বিক্ষোভকে জাতীয় খবর বানানো হয়েছে, যার দায় চাপানো হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর। প্রচার শুরু হয়েছে মৌলবাদীদের বিজয় ঘটেছে, হার হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয় অসম্ভব, কিভাবে হোল আমি বুঝতে চাই। যারা হাহাকার করছে সেই সকল চেতনাধারী কারা? চরম বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক জর্মন গণমাধ্যম ডয়েছে ভেলে শিরোনাম করেছে, “অন্ধকারের’ কাছে পরাজয়’। ভাবুন এবার!

এখানে উল্লেখ করা দরকার আওয়ামী লীগ বারবার দাবি করছে থেমিস সরানো বা না সরানো একান্তই সুপ্রিম কোর্ট – অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ভাস্কর্য অপসারণের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারে নাই। এটি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত। দৈনিক প্রথম আলোর খবরেই দেখেছি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশে নয়, প্রধান বিচারপতি নিজে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্যটি সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মওদুদ আহমদ জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ভাস্কর্য সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ২৫ মে তারিখ বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতের জৈষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে সভা করেন। সেখানে আইনজীবীরা তাঁকে এটি সরানোর জন্যই পরামর্শ দেন। কেন চান না তার পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “কারণ এই ভাস্কর্য নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকুক বা প্রধান বিচারপতিকে বিতর্কিত করা হোক এটা আইনজীবীরা চান না”।

স্পষ্টতই উচ্চ আদালতের কোন বিচারক বা আইনজীবী চাননা দেবী থেমিস নিয়ে সমাজের বিতর্ক বিচার বিভাগ কিম্বা প্রধান বিচারপতিকেও বিতর্কিত করুক। এটা কোন আইনী মামলার বিষয় নয়। আইন ও বিচার ব্যবস্থার পরিমন্ডলের বাইরে বিতর্কে জড়ালে বিচার ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি এবং মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবার বিপদ রয়েছে। আমি মনে করি এটা সঠিক উপলব্ধি।

সে কারণে প্রধান বিচারপতি ও বিচারকদের অভন্দন জানানোর পাশা পাশি পাশা পাশি আমি উচ্চ আদালতের জৈষ্ঠ আইনজীবীদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিচার ব্যবস্থা এবং বিচার প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করতে আমরা অনেকে কোন দিনও দ্বিধা করি নি। এখন যে যুক্তিতে আদালত সামাজিক বিতর্কের উর্ধে নিজেকে রাখতে চাইছে সেটা প্রশংসনীয়। এই ভূমিকার জন্য প্রাণখোলা অভিনন্দন জানানো আমি আমার কর্তব্য মনে করি।

নৈতিক ও আইনী বৈধতা টিকিয়ে রাখতে হলে বাজে, নিস্ফল ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে ধোঁয়াশা করে সেই প্রকার তর্ক থেকে অবশ্যই বিচার বিভাগকে প্রতিষ্ঠান হিসাবে উর্ধে রাখতে হবে। দেবি থেমিসের পক্ষে বিপক্ষে কে সঠিক কি কে বেঠিক সেটা বিচারবিভাগ বিচার করতে বসে নি। একে কেন্দ্র করে সমাজে চিন্তার ও অবস্থানের যে ভেদ ও বিভাজন সেটা সমাজের ডাইনামিজম বা গতিশীলতার লক্ষণ, কিন্তু এতে জড়ানো বিচারবিভাগের কাজ না। এর বাইরে বিচার বিভাগকে নিয়ে আসাই সঠিক।

বিচার বিভাগের কেন দেবি থেমিস অপসারণের সিদ্ধান্ত নিল, তা না বুঝে কিম্বা বোঝার কোন প্রকার চেষ্টা না করে ভাস্কর মৃণাল হক একটি টিভি স্টেশানের উস্কানিমূলক প্ররোচনায় যে সকল মন্তব্য করেছেন আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই। এই স্টেশানটি সব সময়ই সমাজে বিভাজন ও সহিংসতা উসকে দেয়।

পাশাপাশি যে সকল তরুণ দেবি থেমিসকে সরানোর জন্য প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ জানিয়েছে তাদের সমাবেশ ও মত প্রকাশের অধিকার আমি নিঃশর্তে ও সর্বান্তকরণে সমর্থন করি। ঠিক যে কারণে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ বিক্ষোভ ও মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে আমি লড়ি। ঠিক একই ভাবে এই তরুণদের অধিকার রক্ষার জন্যও আমি দৃঢ়। তাদের ওপর কাঁদুনে গ্যাস ও জলকামানের পানি নিক্ষেপ করার আমি তীব্র নিন্দা জানাই।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1194186/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%85%E0%A6%AA%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3-%E0%A6%AE%E0%A6%93%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%A6

farhadmazhar

ফরহাদ মজহার

কবি ও দার্শনিক। ১৯৪৭ সালে জন্ম, মেঘনা নদীতে ভেঙ্গে যাওয়া পুরানা শহর নোয়াখালীতে।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা