এভাবে শিক্ষক হতে পারবেন না

একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ওখানে দুই শ্রেণীর শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক আছে: যারা আবাসিক (মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে), আর যারা অনাবাসিক (মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে না)।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে শিক্ষকরা প্রায় সবাই অনাবাসিক ছিলেন। ঢাকা থেকে সাভার গিয়ে ক্লাস নিয়ে আবার ফেরত চলে আসতেন। ধীরে ধীরে অবস্থা পরিবর্তিত হলো; শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮০% ই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে শুরু করলেন। একই ক্যাম্পাসে একইসাথে থাকার কিছু আবেগজনিত বিষয় থাকে; কিছু বন্ধন তৈরী হয়, কিছু মায়া সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জড়-জ্যান্ত সবার মধ্যে বন্ধন, একে অপরের প্রতি এবং ক্যাম্পাসের জন্য মায়া।

আমরা আবাসিক ছাত্ররা সেই সময়ের আবাসিক শিক্ষকদের অনেক যন্ত্রণা দিয়েছি। কিন্তু তারপরও সব সময় মনে হয়েছে ঐ স্যাররা সম্ভবত আমাদের এই যন্ত্রণাটা উপভোগই করতেন। শবেবরাতের রাতে স্যারদের বাড়ী বাড়ী খাবার ভিক্ষা করতে যেতাম। স্যাররা নিশ্চই প্রস্তত থাকতেন। তা না হলে এত খাবার পেতাম কিভাবে?

অনাবাসিক শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বন্ধন-মায়া লক্ষনীয়ভাবে কম ছিল। কোন আন্দোলনের কারণে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আটকা পরে গেলে চরমভাবে বিরক্ত হতেন। বিশ্ববিদ্যালয় বা এর কোন প্রপঞ্চের সাথে এই যাতায়াতী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তেমন কোন বন্ধন বা মায়া ছিল না। সেই কারণে এই যাতায়াতী শিক্ষকদের মধ্যে থেকে যিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন, তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু না কিছু ক্ষতি করেছেন।

বর্তমান ভিসিও তেমনি একজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থী গতকাল সকালে ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে গাড়ীচাপায় আহত হয়েছিলেন। ঐ অবস্থায় তারা রাস্তার পাশে দেড়ঘণ্টা পড়ে ছিলেন। খবর দেবার পরও প্রক্টর আসেনি, এম্বুলেন্স আসেনি, ভিসি কোন ব্যবস্থা নেননি। ততক্ষণে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যজনকে এনাম হাসপাতালে নেবার পর কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া গেলে হয়তো অন্তত একটি জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।

জাহাঙ্গীরনগরের ভিসি এই ঘটনায় ছাত্র অসন্তোষ এড়ানোর জন্য ঐ দুই শিক্ষার্থীর মৃতদেহ পুলিশ দিয়ে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন, মৃতদেহ যেন ক্যাম্পাসে না নেয়া হয়, সেই ব্যবস্থা করেছেন, এমনকি ক্যাম্পাসে যেন তাদের নামাজে জানাজা না করা হয় সেই জন্য ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন। শুধু এইটুকু করেই যদি উনি থামতেন, তাহলেও কথা ছিল। উনি বলেছেন, ক্যাম্পাসে যদি আজ মুসলমান ছেলের নামাজে জানাজা করতে দেই তাহলে কাল তো হিন্দু ছাত্রদের দাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কী ভয়াবহ কথাবার্তা!

এই ভিসি সম্ভবত জানেন না যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইজন শিক্ষার্থীর কবরও আছে; বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঐ শিক্ষার্থীদের নিজেদের ক্যাম্পাসে দাফন করতে আগ্রহী হওয়ায় তাদের পিতা-মাতা সন্তানের কবর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিতে কোন আপত্তি করেন নাই। আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন ঐ দুইটি বাঁধানো কবর চোখে পরতো। জানিনা এখনো সেই কবর দু'টি আছে কিনা।

সহপাঠীদের মৃত্যুতে এমন অবহেলা এবং প্রশাসন ও পুলিশি হয়রানীর কারণে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ভাংচুর করেছে। প্রতিক্রিয়াজনিত এই ভাংচুর আমি সর্থন করি না, কিন্তু বাংলাদেশটা তো এমনই। এখানে আন্দোলন তো এভাবেই হয়। এভাবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে আন্দোলন করিয়েই তো আপনারা এক শিক্ষক আরেক শিক্ষককে নাজেহাল করেন, এক গ্রুপের শিক্ষক অন্য গ্রুপের ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তাহলে এখন এই আন্দোলন কেন আপনাদের সহ্য হয় না? আপনাদের শিখিয়ে দেয়া পদ্ধতিতেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বার্থে আন্দোলন করছে বলে?

ক্ষমতাধর ভিসি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পুলিশ এবং ছাত্রলীগ দিয়ে আচ্ছামত পিটিয়েছেন, তারপর সেহেরীর সময় তাদের এরেস্ট করিয়ে জেলে পাঠিয়েছেন। বেডি একখান!

ভিসি ফারজানা, আপনাকে বলছি। পুলিশ-ছাত্রলীগের ক্ষমতা ব্যবহার করে আপনি মস্তান হতে পারেন, শিক্ষক কখনোই হতে পারেন নাই। মনে রাখবেন, শিক্ষার্থী আছে বলেই আপনি শিক্ষক পরিচয় দিতে পারেন। শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে, জেলে পাঠিয়ে, ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করে আপনি শূন্য ক্যাম্পাসের দখলদার হতে পারবেন কিন্তু শিক্ষক হতে পারবেন না।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা