মক্কায় মুহাম্মদ (সা.) এর নবজাগরণের ডাক

মাসকাওয়াথ আহসান

মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ)উনার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিকে নিজেই ভ্রান্ত অধ্যাস বলে মনে করতেন।তাই হেরা গুহায় ঘটে যাওয়া অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্তত দুটোবছর তিনি নিজেই সংশয়ে কাটিয়েছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, এসব কথা অনেকেই পথে ঘাটে বলে; লোকজন হয় তাকে নিয়ে হাসে অথবা দয়া করে পয়সা দেয়। নিজেকে ঐ জায়গায় কখনোই দেখতে চাননি। উনার স্ত্রী খাদিজা বিদূষী নারী ছিলেন। হেরা গুহা থেকে ফিরে মুহাম্মদ (সাঃ) যেরকম উচ্চারণে যে শব্দচয়নে কথা বলেছেন তা উনার চেনা মুহাম্মদের (সাঃ) থেকে অনেক আলাদা। সুতরাং তিনি চেষ্টা করেন মুহাম্মদের (সাঃ) নৈরাশ্যের দিনগুলোতে তাঁকে সাহস দিতে। বিউটিফুল মাইন্ড চলচ্চিত্রে একজন বিজ্ঞানীকে চিকিতসা শাস্ত্রের চোখে স্কিজোফ্রেনিয়ার বিষণ্ণ দিনগুলোতে যেভাবে তাঁর স্ত্রী সাহস যোগান; যার ফলে বিজ্ঞানী তাঁর মেধার নতুন উৎকর্ষের অভিজ্ঞান হিসেবে জিতে নেন নোবেল পুরস্কার। 

মুহাম্মদ(সাঃ) ভাবতে শুরু করেন ঐ হেরা গুহার ঘটনাটি উনার মনোবিভ্রম। এইসময় ব্যবসা বাণিজ্যে মনোনিবেশের মত সক্ষমতা ছিলো না। উনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন জীবনে। কারণ মক্কার সমাজে তিনি সবসময়ই যেন একজন আগন্তুক। এখানে শুধু লোক ঠকিয়ে ব্যবসা, বড়লোকী ঠাট দেখানো; কাবার পূজা মন্ডপ ঘিরে কালো উপার্জনের ফন্দি ফিকির। অধিকার বঞ্চিত মানুষের দিকে তাকানোর কেউ নেই। তারা পরিত্যক্ত নিয়তির হাতে। সমাজের এই শ্রেণী বৈষম্য পীড়িত করেছে মুহাম্মদকে(সাঃ)। অনাথ শৈশব বারবার যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছে, এভাবে আর কতকাল। ধনী-গরীবের ব্যবধান কমিয়ে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাটা বুঝি আর পূরণ হলোনা এমন এক অক্ষমতার কষ্ট মনে নিয়ে মুহাম্মদ (সাঃ) পর্বত উপত্যকায় ইতস্তত ঘুরতেন। ধর্ম-দর্শন ছাড়া হয়তো সমাজ চলতে পারে; কিন্তু চলতে পারে না ন্যায়বিচার ছাড়া। ইহুদী-খ্রীস্টান-ইসলাম ধর্মের ইতিহাসে এই সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে একই পরিস্থিতিতে। ইহুদী জীবন দর্শন থেকে সরে গিয়ে মোহরমুখী পুঁজিঘন সমাজ তাদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। খ্রীস্টিয় জীবন দর্শনেও একদল মানুষ যীশুর শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভাজিত হয় রাজনীতি ব্যবসার প্রলোভনে। মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে দেখেছেন, জীবন দর্শন না থাকলে সমাজে অনাচার বাড়ে। কাবায় কতগুলো পুতুল সাজিয়ে রেখে দরিদ্রের সম্পদ লুন্ঠন করছে মক্কার পথভ্রষ্ট নিওএলিটেরা। আর এরা এত অশিক্ষিত যে তাদের এই স্থূল জীবনচর্যার ভুল ধরিয়ে দিলেও বোঝার মুরোদ নেই। মুহাম্মদ (সাঃ) পর্বত উপত্যকায় নিসর্গের মাঝে পথ খুঁজতে থাকেন। সেরকম একটি সময় সকাল নিয়ে একটি অলৌকিক কবিতা তিনি পান সেই বহু প্রতীক্ষিত অতীন্দ্রিয় উৎস থেকে। প্রকৃতির মাঝে সৃষ্টির রহস্য এক অভাবনীয় সংগীতের সুরে প্রকাশিত যেন।মুহাম্মদ (সাঃ) এই ভোরের অলৌকিক কবিতাটি যখন খাদিজার সামনে পুনরাবৃত্তি করেন, তখন তা উনাকে চমকিত করে। এমন পরিবেশ বান্ধব সারকথা খুব কম প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায়। পরিবেশবাদীরা  কুরানের এই সকালের আয়াত পাঠ করে নিশ্চয়ই এর সমসাময়িকতায় মুগ্ধ হবেন।

এরপর বেশ কিছু অতীন্দ্রিয় কবিতার ছত্র মুহাম্মদের মাঝ দিয়ে সৃষ্টিকর্তা উপহার দেন। যে কবিতার মাঝে প্রতীক আছে; রূপক আছে; চিত্রকল্প আছে; আছে জীবনের মৌল পথ মানচিত্র।

মুহাম্মদ (সাঃ) তার দাদা মুতাল্লিব গোত্রের ৪০ জন আত্মীয়কে উনার বাড়ীতে দাওয়াত করেন এই শ্রুতিনন্দন আয়াত  শোনানোর জন্য। অতিথিদের জন্য ময়দা-গোশত-দুধ দিয়ে রান্না করা হয় উপাদেয় খাদ্য।সেসময়ের মক্কা যেখানে সূফী হানিফদের কথা শুনতেই রাজি নয় অসহিষ্ণু পুরবাসী; সেখানে মুহাম্মদের (সাঃ) এই নতুন বার্তা কাব্য পাঠের ফলাফল কী হয় তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল মুহাম্মদের (সাঃ) মনে। খাদিজা সাহস দিয়েছেন। যে কথার মাঝে বোধের গভীরতা আছে সে কথা মানুষতো শুনবেই। নৈশভোজের পর মুহাম্মদ (সাঃ) তার আয়াত পাঠ শুরু করেন। অনেকেই চমতকৃত হয় মুহাম্মদের (সাঃ) উপস্থাপন শৈলীতে। তার কণ্ঠে এক নতুন কণ্ঠের উদ্ভাস যেন ছিলো সুস্পষ্ট।কিন্তু হঠাৎ ক্ষেপে ওঠেন মুহাম্মাদের (সাঃ) সৎ চাচা আবু লাহাব। মক্কার রাগী এক লোক।আজকের দিনের মেজাজ গরম ভিআইপিদের মতো। লাহাব বেরিয়ে যান রাগে গজগজ করতে করতে।মুহাম্মদ (সাঃ) পরদিন আবার সবাইকে নিমন্ত্রণ করেন নৈশভোজে। পরদিন উপস্থিত তারুণ্যের মাঝে মুগ্ধতা তৈরী হয়। অনেকদিন পর তারা জীবনের উদ্দেশ্যহীনতায় আর হালকাপনায় একটি আলোকসুড়ঙ্গের দেখা পায় যেন। মুহাম্মাদের (সাঃ) চাচার ছেলে আলী (রা.) যিনি মুহাম্মদের বাড়ীতেই বড় হচ্ছিলেন;তিনি বেশ কিছু আয়াত পুনরাবৃত্তি করেন সুন্দরভাবে। আয়াতের ভাষিক সৌন্দর্য ও অন্তর্নিহিত দর্শন বৃদ্ধদের মাঝেও ভাললাগার অনুরণন তৈরী করে। চাচা আবু তালেবের এই বিষয়গুলোতে খানিকটা খটকা ছিলো। তার ছেলে আলী (রা.) পুরোপুরি মুহাম্মদের (সাঃ) ভাবশিষ্যে পরিণত হয়েছে; সামান্য একটু বেদনাবোধ তাঁকে আক্রান্ত করে যেন।

মুহাম্মদের (সাঃ) অনুসারী তরুণেরা মক্কার পথে নামে নবজাগরণের বার্তা নিয়ে। সাম্যবাদী সমাজের ডাক নিয়ে তারা পথে পথে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। এসময় হানিফ নামের সূফি ভাবনার লোকেরাও মক্কায় সক্রিয় ছিলো তাদের শান্তির বাণী নিয়ে। কাবাগৃহের পূজা উৎসবের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকেরা অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তারুণ্যের নবজাগরণকে হুট করে আটকে দেয়া কঠিন। আর মুহাম্মদ (সাঃ) এসময় পাবলিক ফোরামে কথা বলতে শুরু করেন। মানুষ তার বাগ্মীতায় মুগ্ধ হয়; শ্রেণীহীন মানুষের জন্য উনার আন্তরিকতা টের পায় দারিদ্র্যে লীন জনসমাজ।

মুহাম্মদ (সাঃ) এসময় তরুণদের নিয়ে পর্বত উপত্যকায় একটু জনচক্ষুর আড়ালে বৈঠক ও প্রার্থনার চর্চা করতে শুরু করেন।প্রার্থনা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় তা নিভৃতে পালনের মাঝে স্নিগ্ধতা আছে।মুহাম্মদ (সাঃ) তরুণদের বোঝাতে সক্ষম হন, মক্কায় যা চলছে তা কতিপয়তন্ত্র। অল্প কিছু মানুষ কালো পথে টাকা উপার্জন করে অপব্যয়ী জীবন যাপন করছে। মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও মক্কার এই পরিবারতন্ত্রের অংশ ছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই তিনি আত্মপরিচয় উদঘাটন করেছেন দারিদ্র্যে বিলীন কোণঠাসা মানুষের মাঝে। মক্কায় যেটা চলছিল তা লুন্ঠনতন্ত্র;পুজো-অর্চনার আড়ালে। কারণ যাদেরই নতুন টাকা পয়সা হচ্ছিলো তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছিলো; নিজেকেই এক একজন ডেমিগড ভাবছিলো তারা। এদের এই পার্থিব স্থূল বৃত্তির সবখানে 'আমি 'কেন্দ্রিকতা। মুহাম্মদ (সাঃ) এই নিও মক্কা এলিটদের গজদন্তের মিনারটি ভেঙ্গে দিয়ে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’র দর্শনে আলোকিত করেন মক্কার তারুণ্যকে। ব্যক্তির আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য নিজেকে তুচ্ছ ভাবা খুবই জরুরী। সেটি তার পার্থিব মোহমুক্তি ঘটাতে কাজে আসে। আর সেই খানেই এক বিশালতার কাছে, এক ঔদার্য্যের কাছে, এক নিরাকার মহাশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ মানুষকে জীবনের গভীরের জীবনটিকে বুঝতে সাহায্য করে। কারণ এই যে বিলাসী জীবন তার পরিসমাপ্তি তো ধূলায়।

মুহাম্মদের (সাঃ) চাচা তালেব একদিন অনুসরণ করে এসে পৌঁছে যান পর্বতের আড়ালের প্রার্থনা ও নবজাগরণের প্রস্তুতির বিদ্যালয়টিতে। তিনি অবাক হন; যুদ্ধে হেরে গেলে বিজিত যেভাবে বিজয়ীর পায়ের কাছে ঝুঁকে আত্মসমর্পণ করে; ঠিক তেমনি আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সবাই অদৃশ্য কোন বিজয়ীর কাছে। তালেব অবাক হন,মুহাম্মদকে (সাঃ) জিজ্ঞেস করেন এর কারণ। মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর চাচাকে অনুরোধ করেন কাবা গৃহ থেকে কিছু মূর্তি সরিয়ে ফেলতে। এসব ব্যবসা বন্ধের চাপ দিতে ঠগ সমাজকে। কারণ নিরাকার একক সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া ন্যায় বিচারের আর কোন পথ খোলা নেই। ঐ বাস্তবতায় মূর্তিগুলো সরানো তালেবের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু মুহাম্মদের (সাঃ) এই অসীমতার কাছে আত্মসমর্পণের মাঝ দিয়ে পার্থিব অর্জনের দর্পচূর্ণের দর্শনটি তাঁর ভালো লাগে। কারণ ঐ এলাকার অনেক সভ্যতাই ধসে গিয়েছিলো ফাঁপা অহংকারে আর নৈতিকতার কোন পরোয়া না করায়।

ন্যায় বিচার ও সম্পদের সুষম বন্টনের মত সময়োপোযোগী বার্তা নিয়ে মুহাম্মদের (সাঃ) অনুসারী তারুণ্য মক্কায় নবজাগরণের অভিঘাত নিয়ে আসে। সমাজ ও রাজনীতি মেরামতের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াই চলতে থাকে ভেতরে ভেতরে।

মুহাম্মদ (সাঃ) তারুণ্যকে উৎসাহিত করেছেন যৌক্তিক বিতর্কে অংশ নিতে; সংশয়বাদে উনার কোন আপত্তি ছিলো না;মুহাম্মদ (সাঃ) মনে করতেন, খুব নিশ্চিত হয়ে যাওয়া মানেই জ্ঞানার্জনের পথগুলোকে রুদ্ধ করে ফেলা। অজানা বা অদেখা মানেই অসম্ভব কিছু নয়; মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরের কোন বিষয় চট করে খারিজ করে দেয়াও অযৌক্তিক। এতো পরমতসহিষ্ণুতা ও সাম্যভাবনার আলোকবর্তিকা নিয়ে যে মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কার তারুণ্যের মনের আলোকসরণিতে হেঁটেছিলেন; তাঁর হাত ধরে একটি নবজাগরণের আগমন ছিলো সময়ের ব্যাপার।

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা