আশা করব বদরুদ্দিন উমর আমার কথা বুঝবেন

ফরহাদ মজহার

বদরুদ্দিন উমর বলেছেন, “এমনকি আল কায়দার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনও মূর্তি এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করার কোনো আওয়াজ তোলেনি। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ইসলামিক স্টেট মার্কা তালেবানদের দ্বারা আফগানিস্তানে বুদ্ধের এক বিশাল মূর্তি ধ্বংস করা। কাজেই ইসলামিক স্টেটের নব্য অনুসারী হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত ওলামা লীগ এবং আওয়ামী লীগ দল ও তাদের সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে ইসলামের কোন্ অনুশাসনের বলে তারা ভাস্কর্য ও মূর্তি সরানো ও ভাঙার আন্দোলন করছেন এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, তাকে সমর্থন করছেন”। (দেখুন, দৈনিক যুগান্তর ২৮ মে ২০১৭ )।

হরেদরে সব ইসলামি দলকেই উমর ‘ইসলামিক স্টেটের নব্য অনুসারী’ বানিয়েছেন। যেখানে আলকায়েদা আর ইসলামিক স্টেইটও এক নয়; আলকায়েদা আর তালেবানও না। তাছাড়া উমর রাজনৈতিক দল আর সামাজিক বা ধর্মীয় সংগঠনের মধ্যে কোন ফারাক রাখেন নি। হেফাজতে ইসলাম রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু ইসলামি আন্দোলন ও খেলাফতে ইসলাম রাজনৈতিক দল; ওলামা লীগ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন, ইত্যাদি। উমর যেহেতু রাজনৈতিক দল করেন অতএব তাঁর দলের লোকদের এই সব পার্থক্য জানা উচিত এবং তাদের মতের পার্থক্যও বোঝা জরুরী। তারা ভিন্ন বলেই ভিন্ন ভিন্ন সংগঠন করে।

হেফাজতে ইসলাম যখন দাবি করে তারা রাজনৈতিক দল নয়, ‘ইমান-আকিদা’ রক্ষাই তাদের কর্তব্য – তখন তারা মূলত বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সীমার মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করবারই দাবি তোলে। শাহবাগের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের ‘ইমান-আকিদা’ নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে সমাজে অন্তর্ভুক্ত থাকাটাই বিপজ্জনক হয়ে গিয়েছিল।

যে কোন ইসলামপন্থা মানেই ইসলামিক স্টেইট মনে করার লোক সমাজে প্রচুর আছে। এধরণের লোক মোটা দাগে তিন ধরণের হয়। এক. পুরাপুরি ইসলাম সম্পর্কে চরম অজ্ঞ যারা এবং যারা এই অজ্ঞতায় অপরিসীম আধুনিকতার আয়েস বোধ করে। দুই. যারা চরম ইসলামি বিদ্বেষ থেকে এই ধরণের ট্যাগ মেরে ইসলাম সম্পর্কে আতংক ছড়ায়। তিন। সব জেনে শুনে বোঝার পরও যারা – যেমন, লড়াইয়ের কৌশল হিসাবে -- সবাইকে 'জামাত' বলে চিনাতে চায়। তেমন এখন 'ইসলামিক স্টেইট' বললেও সুবিধা। যাতে ৭১ সালের ভূমিকা দিয়ে জামাত মানে সব ধরণের ইসলামি রাজনীতিকে বুঝালে সবাইকে নৈতিক সমস্যায় ফেলে দেওয়া যায়। গ্লবালি ইসলামিক স্টেইট ভালই সার্টিফিকেট লাভ করেছে।

আমি উদ্বিগ্ন যে উমর এই তিনের যেকোন একটাকে বেছে নিয়েছেন কিনা! কারণ এই তিন ধরণের লোকই সমাজ ও রাজনীতির জন্য ভীতিকর। এবং স্বভাবতই এরা মধ্যবিত্তের মধ্যে যে অহেতুক আতঙ্ক ছড়িয়ে থাকেন উমর তাদের দলের একজন হয়ে পড়ছেন কিনা ! আমি আশা করব তিনি তা হবেন না। নিরন্তর সমাজের নেতৃস্থানীয় মানুষ যদি ইসলামি আতংকে ভোগে তো সাধারণ মানুষ যাবে কই? তারা হেফাজতে ইসলামের কাছেই আশ্রয় খোঁজে। তারা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলকেও আর বিশ্বাস করে না। এমনকি ইসলামি দলকেও না।

বদরুদ্দিন উমরের মন্তব্য থেকে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা ভেবে দেখুন। হেফাজতে ইসলাম আবির্ভাবের পেছনে চিন্তাশীলতার প্রকট অভাব একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রে’ ধর্ম আর রাজনীতি – কিম্বা প্রাইভেট আর পাবলিক পরিসরের পার্থক্য বজায় রাখতে হলে আমাদের নিজ নিজ কর্তব্য সম্পর্কে নিজেদের হুঁশিয়ার হতে হবে। অথচ আমরা নিজেরাই হুঁশিয়ার না। কারণ ফ্যাসিবাদের বীজ আমরা নিজেরাই নানান ভাবে বহন করি।

নিজেদের ‘অরাজনৈতিক’ বলার মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলাম ‘বুর্জোয়া’ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্ম প্রাইভেট ব্যাপার এই নিয়মের ভেতরেই আদতে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবার কথা বলে – এটা আমাদের নজর এড়ানো ঠিক না । তবে সেটা তারা বলে বলে তাদের ইমান-আকিদার ভাষা দিয়ে। বোঝার দায়িত্ব আমাদের, যারা নিজেদের বোদ্ধা জ্ঞান করি।

যখন ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা জারি থাকে এবং জনগণের ধর্ম চর্চার স্বাধীনতাসহ চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ইত্যাদি নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে নেওয়া হয় কেবল তখনই জনগণের মধ্য থেকে হেফাজতে ইসলামের মতো দলের আবির্ভাব ঘটে। ঘটতে বাধ্য। অনিবার্য। দেওবন্দিরা কওমি মাদ্রাসা নিয়েই ব্যস্ত থাকত যদি মার্কস লেনিনের অনুসারীরা বাংলাদেশে নিজেরাই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সহযোগী না হোত, অথবা তাদের মতাদর্শিক অজ্ঞানতা ও অন্ধত্ব এতো প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী না হোত।

উমরের এমন মন্তব্য করা ভুল। কারণ এমন মন্তব্য উচিত না যা জনগণ থেকে তাদের বহু দূরে সরিয়ে দেয়, বিশেষত যারা আন্তরিক ভাবেই জনগণকে নিয়ে বৈপ্লবিক রূপান্তরের আশা করে। সমাজে কথা বলার কোন পরিসর গড়ে না তুলে এই প্রকার মন্তব্য চিরস্থায়ী বিভাজনের দিকে নিয়ে যায়।

আমি নিশ্চিত হেফাজতে ইসলামের এই আবির্ভাব আমরা দেখতাম না যদি বদরুদ্দিন উমরের মতো শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশে শক্তিশালী ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতাম। তখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কালে এই টুপিকোর্তা পরা মানুষগুলো আমাদের ওপর কিছুটা ভরসা করতে পারত। অথচ আমরা মুখে ‘জনগণ’ বলি, কিন্তু ‘জনগণ’ চিনি না। বিমূর্ত আওয়াজ ছাড়া ‘জনগণ’ কথাটা হাওয়াই বেলুনের মতো ওড়ে, আর একটু টোকাতেই ফুটে যায়, এর কোন অর্থ পয়দা হয় না। তাই সত্যিকারের বাস্তব জনগণ যখন তাদের ইমান-আকিদার ভাষায় কথা বলে, মার্কস লেনিনের ভাষায় কথা বলে না, এবং বলার কথাও না – তখন তাদের আর আমরা কিছুতেই চিনতে পারি না। এদের ইসলামিক স্টেট এর সৈনিক বানানো অন্তত আমাদের কাজ না। কাজ ছিল এদের নিয়ে দিল্লীর গড়ে তোলা বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট রাষ্ট গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের জনগণের বিপ্লবী ভূমিকার নজির স্থাপন করে ভারতের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ – অর্থাৎ জাতিধর্ম নির্বিশেষে শূদ্র, দলিত ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির আশা হয়ে ওঠা। দিল্লী যে উপমহাদেশে মজলুমের দুষমন এই হুঁশটুকু তাদের আছে।

আমাদের অনেকে বুদ্ধিজীবী এখনও ধরতেই পারেন নি যে দেবি থেমিস মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের দ্বন্দ্ব। এটা আদতে কোন ধর্মতাত্ত্বিক তর্ক নয়। হেফাজতে ইসলামের কাছেও ধর্মের যুক্তিটা গৌণ, তারা জানে তারা কাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিকভাবে লড়ছে। দেবি থেমিস কোন প্রত্নতাত্ত্বিক কিম্বা ঐতিহাসিক মূর্তি নয়, মূর্তি সরাবার কৃতিত্ব হেফাজতে ইসলাম নিতে পারে বটে, সেই ক্ষেত্রে তাদের কৌশলগত বুদ্ধির তারিফই বরং করা দরকার, কিন্তু আদতে বিষয়টা রাষ্ট্র ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রশ্ন। সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের নিরসন হয় নি বলেই তা আবার আদালত প্রাঙ্গণে পুনর্স্থাপিত হয়েছে। দেখা যাক এখন হেফাজতে ইসলাম কী করে। আমাদের কাজ ক্ষমতার এই বিকারগুলো ব্যাখ্যা করে জনগণকে বোঝানো, ইসলামি আতংকে ভোগা নয়।

দেবি থেমিসের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম যে সকল যুক্তি দিয়েছে, আমাদের উচিত তা মনোযোগের সঙ্গে পড়া ও তাদের সমালোচনা পর্যালোচনা করা। প্রয়োজনে কঠোর ভাবে বিরোধিতা করা। কিন্তু হেফাজতে ইসলামও ‘ইসলামিক স্টেট’-- এই পাতলা চিন্তা ও ঠুনকো কথা আমাদের মানায় না। বদরুদ্দিন উমরকে তো একদমই না।

আমি আশা করব বদরুদ্দিন উমর আমার কথা বুঝবেন।

farhadmazhar

ফরহাদ মজহার

কবি ও দার্শনিক। ১৯৪৭ সালে জন্ম, মেঘনা নদীতে ভেঙ্গে যাওয়া পুরানা শহর নোয়াখালীতে।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা