সৈয়দ মুজতবা অালী'র জন্মদিনে!

অাশানুর রহমান খোকন

১৯৮৩ সালে যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম, প্রথম দিনেই আমাদের প্রধান শিক্ষক জনাব শামসুল হুদা আমাদের একটি গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছিলেন। স্যারের সেদিনের কথাটা আমাদের বন্ধুদের অনেকেই হয়তো ভাল বোঝে নাই অথবা গুরুত্ব দেয়নি। আমি দিয়েছিলাম। তিনি সেদিন বলেছিলেন যে স্কুলের একটি লাইব্রেরী আছে কিন্ত অব্যবহারে সেটা ঊঁইপোঁকার খাবার হচ্ছে। অনেক ঝামেলা স্বীকার করে একদিন আমি সেই গুপ্তধনের কাছে পৌঁছেছিলাম। আমি শুরু করিছিলাম শরৎচন্দ্র দিয়ে। আমার গোগ্রাসে বই পড়া দেখতে পেয়ে তিনি একদিন আমাকে সৈয়দ মুজতবা আলীর 'চাচা কাহিনী' দিয়ে বললেন, 'এটা পড়, তোর ভাল লাগবে'। তিনি ছিলেন আমার স্যারের প্রিয়য় একজন লেখক। সেই থেকে তাঁর লেখার সাথে পরিচয়। আগামীকাল তাঁর জন্মদিন।

সৈয়দ মুজতবা অালী ১৯২১ সালে সিলেট থেকে শান্তি নিকেতনে পড়তে গিয়েছিলেন। বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগ সে বছরই চালু হয়েছিল। যে জনাদশেক ছাত্র-ছাত্রী কলেজ শাখায় ভর্তি হয়েছিল তারা সবাই শান্তিনিকেতন স্কুল থেকেই এসেছিল। বিশ্বভারতীর কলেজ বিভাগে তিনিই ছিলেন প্রথম বাইরের ছাত্র।

অসম্ভব পন্ডিত এই মানুষটি রবীন্দ্রনাথ কে সত্যিকারেই গুরু মানতেন এবং তিনি 'গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন' নামে একটি বই লিখেছিলেন ১৯৬২ সালে।

১৯২২ সালে এসে শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীরা টলস্টয়ের ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে তাদের জীবন যাপনকে বুর্জোয়া বা বিলাসী জীবন যাপন ভেবে সহজ সরল জীবনে ফিরে যাবার জন্য রীতিমতো বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে তখন কবি তাদের ডেকে পাঠান। অনেক তর্ক শেষে কবি বলেছিলেন, ' অামি জানি একতারা থেকে যে সুর বেরোয় তাতে সরলতা অাছে কিন্ত সে সরলতা একঘেঁয়েমির সরলতা। বীণা বাজানো ঢের শক্ত। বীণাযন্ত্রের তার অনেক বেশী, তাতে জটিলতাও অনেক বেশী। বাজাতে না জানলে বীণা থেকে বিকট শব্দ বেরোয় কিন্ত যদি বীণাটিকে অায়ত্ত করতে পার তবে বহুর মধ্যে যে ঐক্য সৃষ্টি হয় তা একতারার একঘেঁয়েমির সরলতার চেয়ে ঢের বেশী উপভোগ্য। অামাদের সভ্যতা বীণার মত, কিন্ত অামরা এখনও ঠিকমত বাজাতে শিখিনি। তাই বলে সে কি বীণার দোষ, অার বলতে হবে যে একতারাটাই সবচেয়ে ভাল বাদ্য যন্ত্র।' (সৈয়দ মুজতবা অালী'র গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন বই থেকে)।

সেই গুরুদেবের সাথে তার শেষ দেখা শান্তিনিকেতনে ১৯৩১ সালে। জনাব অালী তখন বরোদার কলেজে ধর্মশাস্ত্র পড়ান। কবি দুঃখ করে জানালেন যে বিশ্বভারতীর জন্য তার প্রাক্তন ছাত্রদের দরকার কিন্ত তাদের এখানে অানার সামর্থ্য কবির নেই। জনাব অালী জবাবে বলেছিলেন, '........ বিশ্বভারতীর সেবার জন্য যদি অামাকে প্রয়োজন হয় তবে ডাকলেই অাসব। যা দেবেন হাত পেতে নেব।'

কবির এমন শিষ্যের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা!

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা