দুর্ভিক্ষের চাল: না কাড়া না আকাড়া

আবু মুস্তাফিজ

দিন কয়েক আগে বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী কামরুল সাহেব প্রতিবেশী মিয়ানমারে চাউল ক্রয়ের জন্য গেছিলেন। তিনি তা ক্রয় করতে পেরেছেন কি পারেননি, আলোচনা সেদিকে না গড়াই। কিন্তু কত ঠেকায় পড়ে উনি মিয়ানমারে দৌড়েছেন, সেটাই বুঝার বিষয়।

যে সময় উনি মিয়ানমার যাচ্ছেন, সেই সময়টায় মিয়ানমারে রীতিমতো আগুন জ্বলছে। মিয়ানমার সরকার নিজ দেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মেরে ধরে তাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদেরই দেশে।যখন রোহিঙ্গা ইসুটির সুরাহা জরুরি, সুকি সরকারকে এর জন্য জবাবদিহিতে আনা জরুরি, তখন তিনি চাউল আনতে তার দেশে!  

এদিকে প্রিয় প্রতিবেশীও আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাউল দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? এটাই দাঁড়াল যে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই কেজি প্রতি চাউলের দাম ৪-৫ টাকা করে বেড়েছে। দোকানিরা বলছেন, এটাই শেষ নয়। এটা বাড়তেই থাকে। এর মানে কী দাঁড়ায়? যদি সরকার বাহাদুর চাউল যোগাড় করতে না পারে, তবে তো নিম্ন আয়ের লোকেরা চাল কিনতে না পেরে দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারে।

অবস্থা দেখে বুঝা যাচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক আমলের অভিজ্ঞতা আমলে নেয় নাই সরকার।তখনও ভারত চাল দেয়া নিয়ে ঘুরিয়েছিল। প্রতিশ্রুত সেই চাল বিক্রি ভারত আজও করে নাই।সেটা ছিল ২০০৭ সালে আইলা জলোচ্ছ্বাসের পরে। তখন দুর্ভিক্ষ না হলেও চালের হাহাকার পড়েছিল। চালের দাম সেই প্রথম পঞ্চাশ টাকার উপরে গেছিল।ভারত চাল রপ্তানী নিষিদ্ধ করেছিল, কায়দা করে যে ১০০ ডলারের নিচে চালের এলসি হলে সেটা কাস্টমস পার হতে পারবে না।

সে যাই হোক, বাংলাদেশের মানুষ অবশ্য সর্বশেষ দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করেছিল সেই ’৭৪ সালে। সারাদেশেই অনাহারী মানুষের ঢল নেমেছিল।ভাত কাপড়ের অভাবে বাসন্তীরা জাল পরতে বাধ্য হয়েছিল। ডাস্টবিনের খাবার নিয়ে কুকুরে মানুষে কাড়াকাড়ি খুবই পরিচিত দৃশ্য ছিল তখন-প্রত্যক্ষদর্শীরা এমনই বলে থাকেন।দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে বা অন্য যে কারণেই হোক, একই সময়  তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। আর খোলেন হাজার হাজার লঙ্গরখানা।

এরপরও ক্ষুধাকাতর অসংখ্য মানুষের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়নি। শেখ সাহেব নিজের মুখেই স্বীকার করেন ২৭ হাজার মানুষ না খেয়ে মারা গেছে।সূত্র http://: https://www.youtube.com/watch?v=enRmWqqFcxk. তবে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের ধারণা মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কেউ বলেন ১০ লাখ কেউ ৩০ লাখ।

এর বহু বছর আগে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খিস্ট্রাব্দে) ইংরাজ শোষকের অসহনীয় শোষণের ফলে সুবে বাংলার সাড়ে তিন কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটিই নাই হয়ে যায়। না খেতে পেয়ে। মানুষ মানুষের গোস্ত খেয়েও বাঁচার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারে নাই।

ইংরাজের সেই শুরুর দুঃশাসনের স্মৃতি ফের ফিরে আসে তার বিদায় বেলায়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পঞ্চাশের মন্বন্তরে (ইংরেজি ১৯৪২)। এবার মারা যায় ৪০ লাখ।কলিকাতার রাস্তায় হাড়সর্বস্ব মানুষ, কঙ্কালসার লাশের সারি, খাবার নিয়ে কাক কুকুর আর মানুষের কাড়াকাড়ি। সেসব ছবি এঁকে জয়নুল অমর হলেন, অমরতা দিলেন পঞ্চাশের মন্বন্তরকেও। 

এই তিনটে বড় দুর্ভিক্ষই মানবসৃষ্ট। ক্ষমতাবান মানুষের সীমাহীন লোভই অসংখ্য মানুষকে নির্মম মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই দুঃখময় অভিজ্ঞতা আমরা ভুলে গিয়েছি। ভুলে গিয়ে ভালো হল না খারাপ হলো সে নিয়ে বিতর্ক আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু অমন আরেকটি দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা যে দরোজায় কড়া নাড়ছে-তার কিছু উপসর্গ টের করা যাচ্ছে।  

এই যেমন ধরুন, চালের দাম এখন উন্নয়নের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে সবচেয়ে বেশী দামে বিক্রি হচ্ছে, হোক তা চিকন বা মোটা। সরকারি গোডাউন ফাঁকা, দেশজুড়ে বানভাসি মানুষ, তাদের ত্রাণের জন্য চাল দরকার।

সরকার চাল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। দেশের মিল মালিকরা(সংখ্যায় ১৫০০০) অঙ্গীকার করেও চাল দিচ্ছে না। উপায় না দেখে সরকার চাল আমদানির চেষ্টায় ভারত ও ভিয়েতনামে দৌড়ঝাপ শেষে এখন মিয়ানমারে গেছে। কিছু চাল অবশ্য ভিয়েতনাম থেকে আসতে আরম্ভ করেছে। এরই মাঝে সরকারী (খাদ্য মন্ত্রণালয়ের) চাল পাচারের ২টা চালান ধরা পড়েছে। সূত্র: Whose rice is it anyway?

http://www.thedailystar.net/frontpage/whose-rice-anyway-1435852

সরকারি গুদামের চাল পাচার

http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/07/19/521062

শেষোক্ত খবরটিই বড় উপসর্গ। এমন তো নিকট অতীতে হয় নি। সরকারি গোডাউন থেকে চাল পাচার বলি চুরি বলি কিংবা ডাকাতি যাই বলি না কেন, রাতের আধারে সরিয়ে নেবার ব্যাপারটি কিন্তু যথেষ্টই শঙ্কার। এরকম দুটো ঘটনা ধরা পড়েছে, যখন সরকারি গোডাউন খালি। তার মানে এরকম কত দুটি ঘটনা ঘটিয়ে গোডাউন খালি করা হয়েছে, কে জানে।

তবে সে কেউ না জানলেও এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে গোডাউন ফাঁক করে দেবার মতো মুরোদওয়ালা লোক কারা। যে সে লোক যে গোডাউনে ঢুকে ট্রাকের পর ট্রাক চালের বস্তা ভরে সেগুলো হাপিস করে দিতে পারবে না, এ কানার ভাই অন্ধও বুঝে। তবে এগুলো কে করে?

একটু খোঁজ খবর করলেই পালের গোঁদা ধরা যাবে, কিন্তু ওই খোঁজ খবরটিই কেউ করবে না। করবে না এজন্যই যে কার গ্রীবায় কয়টা মাথা? দশানন নয় যে একটা ফেলে বা কেটে নিয়ে গেলে সকালে আরেকটি মাথা গজিয়ে যাবে। বরং দেখা যাবে ধরটি খুঁজে পেলেও মাথাটি দুর্ভিক্ষের কুকুরে খেয়ে ফেলেছে।

তাছাড়া এসব খোঁজ খবর করার লোক এদেশ থেকে গতায়ু হয়েছে। এখন সব দেখে শুনে চুপ করে থাকার কাল।তবে যাদের চুপ করে থাকার অভ্যেস নেই তারা নিজেরাও ট্রাকে বস্তা ওঠাতে লেগে পড়ে। দুর্নীতির মচ্ছবে ঘরে বসে থেকে সময় নষ্ট করার মতো বোকামি অনেকেই করতে রাজি নন।

এমন একটি করুণ পরিস্থিতিই দুর্ভিক্ষের মতো মানব-অপমান ডেকে আনে।এর শুরুটা হয় চোরকে সালাম ঠুকে আর গেরস্তের মাথায় লাঠি মেরে।

এমন পরিস্থিতিতে রা কাড়া আর না কাড়া একই কথা। তারপরও ভিক্ষার চালে যেমন কাড়া আর আকাড়া নাই, তেমনই দুর্ভিক্ষে চালই নাই...তো কাড়া আর আকাড়া! তারপরও কিছু কথা বলা প্রয়োজন বলে বলছি। কিন্তু কাকে বলছি, কেন বলছি, কে জানে? তবে এ কথা কে না জানে, না খেয়ে মরার মতো কষ্টকর মৃত্যু আর নাই।   

নিচের চাল সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট এর লিঙ্ক দেওয়া হলো। আগ্রহীজনরা চোখ বুলাতে পারেন।

20 July 2017

Whose rice is it anyway?

http://www.thedailystar.net/frontpage/whose-rice-anyway-1435852

সরকারি গুদামের চাল পাচার

http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/07/19/521062

18 July 2017

ভারতে পর্যাপ্ত চাল পাচ্ছেন না বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা

https://goo.gl/re6YYv

17 July 2017

ধানের উচ্চমূল্যে বন্ধ প্রায় অর্ধেক চালকল

https://goo.gl/64czPL

ভিয়েতনামের চালের দ্বিতীয় চালান চট্টগ্রাম বন্দরে

https://goo.gl/w2fmhz

14 July 2017

সরকারকে চাল দেননি ১৫ হাজার মিলার

https://goo.gl/Mxg83r

পাঁচ দেশ থেকে ১২ লাখ টন চাল আমদানি হচ্ছে

https://goo.gl/b1DrB7

09 July 2017

ভারতে মূল্য বাড়ায় শুল্ক হ্রাসের সুবিধা মিলছে না

https://goo.gl/ePypDN

08 July 2017

দুই হাজার কোটি টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে

https://goo.gl/dA66ga

24 Jun 2017

১% ধানও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য মন্ত্রণালয়

https://goo.gl/znAcSX

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা