রোহিঙ্গা, সু কি ও একজন হিরোডেটাস!

অাশানুর রহমান খোকন

তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৮৭ সালের শুরুতে। তাও পরিচয় হয়েছিল তাঁর নামের সাথে। স্কুলে বরাবরই আমার রোল নম্বর ছিল তিন। প্রথম বা দ্বিতীয় হবার কোন ইচ্ছে আমার কখনো হয়নি। কিন্তু তিন নম্বর পজিশনটি ধরে রাখতে কোন কোন সময় অনেক টেনশন নিতে হয়েছে। ঐ তিন নম্বর পজিশনের কারণে আবার আমার প্রবল ভাল লাগাকেও ছাড়তে হয়েছিল। আমার যেমন শখ ছিল আর্টসে পড়বো। স্কুলের অলিখিত নিয়ম ছিল এক থেকে পাঁচ রোল নম্বর পর্যন্ত সবাইকে সায়েন্স নিতে হবে। প্রথম প্রথম কিছুদিন কোনভাবেই বিজ্ঞান ক্লাসে মন বসেনি। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তাই আর্টসের ক্লাসে গিয়ে বসতাম। আর্টসের ক্লাস মানে ইতিহাসের ক্লাস। স্কুলে তখন ইতিহাসের কোন শিক্ষক ছিল না। আমার মেজো ভাই তখন ইতিহাসে অনার্স পড়েন। তিনি ছুটিতে বাড়ীতে এলে ইতিহাসের ক্লাস নিতেন। তাঁর ইতিহাসের বইপত্র আমিও পড়তাম। মেজো ভাই আমার আগ্রহের দিকটি জানতেন। হয়তো তিনি মনে মনে চাইতেন যে আমি আর্টস পড়ি। বড় ভাই বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। বাবার পরে, বাড়ীতে তাঁর কথায় শেষ কথা। সেই আমি একদিন বিজ্ঞান ক্লাস বাদ দিয়ে ইতিহাস ক্লাসে গিয়ে বসেছি। স্যার নেই, স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র আমার মেজো ভাই আসলেন ক্লাস নিতে। তাঁর কলেজ তখন বন্ধ ছিল। তিনি ক্লাসে ঢুকেই জানতে চাইলেন,

-ইতিহাসের জনক কে?

সবার মুখ বন্ধ। কেউ কোন কথা বলে না। আমার উত্তরটি জানা ছিল। কিন্তু লজ্জা পাচ্ছিলাম উত্তর দিতে। পাছে আমার বন্ধুরা মনে কষ্ট পায়। আমার ভাইটি তাঁর নিজের ভাইকে নিয়ে গর্ব করা ইচ্ছে থেকেই সম্ভবত: আমার কাছে উত্তরটি জানতে চাইলেন। আমি লজ্জাবনত ভঙ্গিতে উত্তর দিলাম,

-হিরোডিটাস।

আমার ভাই খুব খুশী হলেন। আমার বন্ধুদের কাউকে কাউকে ঈর্ষান্বিত মনে হলো। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম, কারণ ভাই নিজেই আমার প্রশংসা করছিলেন। আমার নিজের তখন গর্বে বুক ফুলে ফুলে উঠছিল। বান্ধবীদের কারো কারো চোখে প্রশংসার ছটা দেখে আমার মন তখন অজানা আনন্দে পুলোকিত হচ্ছিল।

সেদিন রাতে কেন জানি ঘুম আসছিল না। কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানি না। কিন্তু সেই রাতে হিরোডেটাসকে স্বপ্নে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম তিনি হাতে মাথাটি ঠেকিয়ে এক অপরুপ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘুমটি ভেঙে গিয়েছিল। সেই থেকে মাঝে মাঝে আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখি।

গতকাল রাতেও যেমন তাঁকে দেখলাম। বরাবরের মতোই তিনি হাসছিলেন। আমি জানতে চাইলাম,

-হাসছেন কেন?

তিনি কৌতুক মিশ্রিত স্বরে উত্তর দিলেন,

-তেমার কি এখনও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ আছে?
-আগ্রহ না থাকার কী কারণ থাকতে পারে?
-তুমি এখনো বিশ্বাস করো, আমরা ইতিহাসের নামে যা লিখি তা সব সত্যি?
-সব হয়তো সত্য নয়। অনেক যাচাই-বাছাই করে নিতে হয়। সত্য জানতে ওগুলোও জানা দরকার বৈকি।

আমার কথা শুনে তিনি যেন অট্টহাসিতে যেন ফেটে পড়লেন। হাসি থামিয়ে জানতে চাইলেন,

-ধরো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যদি জিততেন, তোমরা ইতিহাস পড়ে কী জানতে? আবার স্ট্যালিন সম্পর্কেই বা কী মুল্যায়ন দাঁড় করাতে? যুদ্ধের ফলাফল একজনকে নায়ক, আরেকজনকে খলনায়ক বানিয়েছে। তোমরা যূ্দ্ধের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নির্মিত কাহিনীগুলোকে ইতিহাস ধরে নিয়ে সত্যাসত্য যাচাই করতে চাও। যে হিটলার এত ইহুদি নিধন করলো আজ সেই ইহুদিরাই যখন প্যালেষ্টাইনদের নির্বিচারে হত্যা করছে, তোমরা অনেকেই তখন হিটলারের ভূমিকার সমর্থক হয়ে ওঠো না? তোমরা অনেকেই আওরঙ্গজেবের তুমুল সমালোচক, কেননা সে মসনদের জন্য ইসলামের নামে কাউকে রেহাই দেয়নি। স্ট্যালিন তাঁর ক্ষমতা নিরুঙ্কুশ করতে সমাজতন্ত্র রক্ষার নামে একই কাজ করেনি?

আমি তাঁর কথার কোন প্রত্যুত্তর না করে শুনে যাচ্ছিলাম। তিনি বলে চললেন,

-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলে স্ট্যালিন ইতিহাসে খুনি হিসাবে চিহ্নিত হতেন। বিশ্বযুদ্ধ তাঁকে সেখান থেকে মুক্তি দিয়ছে। আজ যদি রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন না চলতো, এমন হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা না ঘটতো, অং সাং সু কি'র নোবেল প্রাইজ প্রত্যাহারের দাবী তুলতে? সময়ের পরীক্ষায় সবাই পাশ করে না। সুকি একবার ফেল করেছে মাত্র। সে নোবেল জিতে মানবতাবাদী কর্মী নয়, রাজনীতিবিদ হতে চেয়েছিল। আমরা যারা ইতিহাস লিখি তারা সুকিকে নিয়ে লিখবো। কেউ তাকে নায়ক বানাবো, কেউবা খলনায়ক। আর তোমার মতো নাদানেরা সেই কাহিনী খুঁজে খুঁজে তোমাদের পূর্বধারণা মতো Null Hypothesis ঠিক করে নিয়ে কেউ কেউ সেই Hypothesis গ্রহণ করবে, আর কেউ কেউ বর্জন করবে। এই গ্রহণ বা বর্জন চলবে তোমাদের প্রয়োজন মতো। আমাদেরকে তোমরা ব্যবহার করবে টিস্যুর মতো।

তিনি স্বগতোক্তি করতে থাকলেন,

-আজ সু কি তাঁর মুখোশটি খুলে ফেলেছে। সেই একই মুখোশ পরতে আরেকজন হয়তো উন্মুখ হয়ে আছে। আমরা ইতিহাসবিদরা কখনো একে, কখনো তাকে একবার উপরে উঠাবো, আরেকবার নীচে নামাবো। যে মা অাট সন্তানের মধ্যে সাত সন্তানকে হারিয়ে আহত একটি সন্তানকে নিয়ে শরনার্থী হিসাবে বাংলাদেশে পৌঁছেছে, আমরা ঐতিহাসিকরা তাদের কথা লিখি না।

তিনি আরো বলে চললেন,

-ত্রিশ বছর আগে যে প্রশ্নের উত্তরে তুমি আমার নাম বলেছিলে, আজ আরো ত্রিশ বা তিনশো বছর পর কেউ যদি জানতে চায়, 'মিথ্যার জনক কে?', তখন তোমার মতো করেই কেউ হয়তো বলবে 'হিরোডেটাস'।

তারপরই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আর সেই শব্দে আমার ঘুমটিও ভেঙে গেলো!

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা