মায়ানমার মন্ত্রীর বাংলাদেশে আগমন: যা করতে হবে বাংলাদেশকে

পিনাকী ভট্টাচার্য

মায়ানমারের মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে সোমবার সকালে বাংলাদেশে আসছেন। সরকার জানিয়েছে এটা কূটনৈতিক সফর। বাংলাদেশ অবশ্যই কূটনৈতিক আলাপ আলোচনার দরজা খোলা রাখবে এবং তাতে অংশগ্রহণের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকবে। কিন্তু, প্রশ্ন হল কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার জন্য অতি প্রাথমিক যে পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, মায়ানমার সেটা করেছে কিনা?

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়নে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস শুরু হওয়ার পর, আঞ্চলিক মোড়ল ইন্ডিয়া এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর শাসানি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে অভাবনীয় গণঐক্য জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই শক্তিতে ভর করেই সরকারকে এ বিষয়ে পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থান ঠিক করতে হবে।

বিশ্ব জনমত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশের অনুকুলে। এতে কারা বিচলিত ও ভীত বোধ করছে সেটা আমরা অনুমান করতে পারি। আমরা আশঙ্কা করি তড়িঘড়ি করে অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে, বাংলাদেশকে দুর্বল নেগোসিয়েশনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে চাইছে কেউ কেউ। জনগণকে সবসময় সঙ্গে রাখা ও প্রকাশ্য আলোচনাই সেই চাপ মোকাবেলার সঠিক পন্থা।

যথাযথ কূটনীতি অনুসরন না করার কারণে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি আজ মায়ানমারের যুদ্ধের হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বার্মার গনহত্যাকারী সামরিক সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকার যে আলোচনা করবে তা দিনশেষে প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়ে দেশবাসীকে জানাতে হবে। একচুলও গোপন করা যাবে না।

এদেশের মানুষের একাত্তরের অভিজ্ঞতা খুবই ভয়ংকর। সেদিনের নেতৃত্ব অনেক কিছু গোপন করায় দেশবাসীকে অপ্রস্তুত অবস্থায় আকস্মিক গনহত্যার বিভিষীকার শিকার হতে হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে যে পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছেন তার প্রথমটিই ছিল এক্ষুনি রাখাইন রাজ্যে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের নামে সাধারন মানুষের উপরে চলমান জেনোসাইড বন্ধ করতে হবে এবং ওই অঞ্চলে চিরকালিন শান্তি বজায় রাখতে হবে। মায়ানমার সরকার সেখানে সামরিক অভিযান বন্ধ করেনি এবং বন্ধ করার কোনো ঘোষণা দেয়নি। এখনো প্রতিদিন রোহিঙ্গারা আসছে। বরং উল্টো হিন্দু গণকবর উদ্ধারের নামে নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক প্রচারণায় লিপ্ত হয়েছে। যেখানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রস্তাবিত প্রদক্ষেপের প্রথম শর্তটিই গ্রহণ করার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা, সেখানে বাংলাদেশ কীসের ভিত্তিতে মায়ানমার স্টেইট কাউন্সিলরকে বাংলাদেশে আসার অনুমোদন দিয়েছে এবং কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনায় বসতে যাচ্ছে সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

বহুবার বাংলাদেশের সীমান্ত লঙ্ঘন, প্রতিবাদ সত্বেও উস্কানি অব্যাহত রাখা, সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ ল্যান্ডমাইন পাতার মতো জঘন্য অপরাধের স্বীকারোক্তি কিংবা কোন রকম দুঃখ প্রকাশ না করে, জাতিগত নির্মূল অভিযান ও গণহত্যা অব্যাহত রেখে আলোচনার টেবিলে আসা একটি প্রহসন। এই প্রহসনে বাংলাদেশের জনগণ কোন ভাবে সায় দিতে পারে না। বাংলাদেশ আলোচনায় বসতে পারে একমাত্র তখনই যখন

১/ বার্মা রাখাইনে চালানো সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেবে, আর একজন রোহিঙ্গা মুসলমানও যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য না হয় সেটা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করবে।

২/ জাতিগত নির্মূল অভিযান ও গণহত্যা বন্ধ করার আন্তর্জাতিক আহ্বানে সাড়া দেবার সদিচ্ছা প্রমাণ করবে। জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও অনুসন্ধানকারী দলকে নির্বিঘ্নে সেখানে পরিদর্শন করার সুযোগ করে দেবে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সংঘটিত মানবতাবিরোধী সকল অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনে সম্মত হবে ও তার জন্য অবিলম্বে একটি তারিখ ঘোষণা করবে।

এই দুটি শর্ত পূরণ হলেই কেবল আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে পারে, বাংলাদেশ আলোচনায় বসতে পারে। ভুক্তভোগীদের ইনসাফ পাওয়ার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে, গণহত্যাকারীদেরকে ছাড় দেওয়ার কূটনীতি কোনোভাবেই বাংলাদেশের অবস্থান হতে পারে না। যতদিন এই গণহত্যার বিচার না হবে বাংলাদেশকে এই দাবি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিনিয়ত উত্থাপন করে যেতে হবে। মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি হবে এটা।

আলোচনার প্রথম এবং প্রধান বিষয়বস্তু হতে হবে, রাখাইন রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সকল রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নিরাপদে, মর্যাদার সহিত মানবিক জীবন যাপনের উপযুক্ত পরিবেশে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে সুযোগ করে দেওয়া। একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা সহ পুরো প্রক্রিয়াটি যথাসাধ্য দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য রোডম্যাপ তৈরি করে তা বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি গঠন করা। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত, মায়ানমারের নাগরিকদের পেছনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে ব্যয় তার সমুদয় মায়ানমারকে পরিশোধ করতে হবে। এই প্রক্রিয়া একমাত্র তখনই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। যদি মায়ানমার আন্তরিকভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজের নাগরিক বলে স্বীকার করে নেয়। রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহারে তাদের অনীহা পরিত্যাগ করতে হবে। এই জনগোষ্ঠীর নিজের পরিচয় ব্যবহারের স্বাধীনতা কোন রকমের শর্ত বা বিধিনিষেধ মুক্ত ভাবে পালন করার অধিকার থাকতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা তৈরি ও প্রচারে উৎসাহ দান, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, ঐতিহাসিক মিথ্যাচার করা বা করার কোন চেষ্টাকে, আইন করে বন্ধ করতে হবে।

১৯৮২ সনের আইন যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরকে রাষ্ট্রহীন করে ফেলা হয়েছে, ২০০৮ সালের সংবিধান যার মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ হরণ করা হয়েছে এটা বাতিল ও সংশোধন করতে হবে। এছাড়াও অপরাপর আইনের মাধ্যমে তাদের নির্বিঘ্নে চলাচল, সামাজিক মেলামেশা, বিবাহ, শিক্ষা স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করতে হবে।

স্বতন্ত্র স্থানীয় গোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের পরিচয়গত স্বীকৃতির ভিত্তিতে সমমর্যাদার নাগরিক হিসেবে সকল সাংবিধানিক, আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করতে কাজ করার জন্য আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে আনান কমিশন কোনো আন্তর্জাতিক কমিশন নয়। এটা 'রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশন' নামে তৈরি করা মায়ানমারের একটি কমিশন। এই কমিশনের ম্যান্ডেটের মধ্যে, রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার হরণের কার্যকারণ, চলাচল থেকে শুরু করে জীবন যাপনের মৌলিক শর্তগুলো পূরণে বাধা আরোপের মাধ্যমে পদ্ধতিগতভাবে তাদের জন্য যে বর্ণবাদী সিস্টেম চালু রাখা হয়েছে, সেই বিষয়ে অনুসন্ধান কিংবা সুপারিশ করার কোন সুযোগ এই কমিশনের ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে মায়ানমার কাঠামোগত ভাবেই, মানবাধিকার পরিপন্থী তিন স্তর বিশিষ্ট নাগরিকতার বর্গ সৃষ্টি করে রেখেছে। আমাদের সতর্কতার সাথে মনে রাখতে হবে যে, আনান কমিশন প্রস্তাবিত আইডেন্টি ভেরিফিকেশন কিংবা পরিচয় সনদ প্রদানের মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কোনরকমে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে নিলে মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সেটা আমরা কোন ভাবে চাইতেও পারি না।

রাখাইন রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ অনিবার্য অংশীদার। বাংলাদেশ না চাইলেও মায়ানমার নিজেই বাংলাদেশকে তার অংশীদার বানিয়েছে। সেখানে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বারবার তারা বাংলাদেশে ছুটে আসছে। তাই শুধু প্রত্যাবাসন নয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরেও, শান্তি এবং স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, পরিপূর্ণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা সহ স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হবার ব্যবস্থা রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা বাংলাদেশের থাকতে হবে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং মেলবন্ধনের বাইরেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমান্তে একটা বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা সার্বক্ষণিক ভাবেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ, উদ্বেগ ও ঐতিহাসিক দায় বোধের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এসব বিবেচনা ছাড়া মায়ানমারের মন্ত্রীর কূটনৈতিক সফর অর্থহীন।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা