ও আলোর পথযাত্রী... এখানে থেমো না

ইসরাত জাহান

ফেসবুকে ওর শেষ স্ট্যাটাসটা আবার নতুন করে দেখলাম: Color goes away!!!

স্ট্যাটাসের তারিখটা ছিল ১১ জুলাই। তারপর আর কোনো স্ট্যাটাস নেই। তারপর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের মতই আমি ওকে ফোন করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ও আর ফোন ধরেনি। বরং নরওয়ে থেকে আমাদের আরেক বন্ধুর ফোন আসে। জানায়, সে ভালো নেই। আমি তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকলে সে অবাক হয়ে আমাকে প্রশ্ন করে, Don't you know, our Bashobi left away?

ওইদিনই সকালে আমার প্রাণের বন্ধু রোজলিন বাসবী হালদার (১৫ অক্টোবর, ১৯৭১- ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭), যাকে আমি ভালোবেসে বাসু বলে ডাকতাম, সে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে।

এক গাদা প্রশ্ন এ মৃত্যুকে ঘিরে। কারণ, ওর স্বভাব, ওর সামাজিক, ব্যক্তিগত, পেশাগত জীবন। ও সারাক্ষণ হাসি-হুল্লোড়ে ভরিয়ে রাখতো চারপাশ। ও ছিল ওয়ার্ল্ড ভিশনের বড় কর্মকর্তা। ওর ছিল প্রেমময় স্বামী, আদরের দুই ছেলে: একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্যজন নটরডেম কলেজে পড়ছে, নিজের ফ্লাট। সুখী সংসার বলতে যা বুঝায়, তাই।

এর বাইরেও বাসুর ছিল আরও এক বড় গুণ। বাসু ছিল ভীষণ ভালো বক্তা। এতো ভালো যে প্রায়ই বিভিন্ন দেশ থেকে ওর ডাক আসত প্রেরণাময় বক্তৃতা দেওয়ার। যে মেয়েটির বক্তৃতায় অন্যরা প্রেরণা পেত, সেই মেয়েটিই একদিন নিজেই অনুপ্রেরণাহীন হয়ে পড়ল। অথচ ও নিয়মিত গীর্জায় যেতো। কোনো রোববার পাইনি যেবার ও গীর্জায় যায়নি।

যে বাসু এ রকম, গত ছয় মাসে সে যেন আমূল বদলে যেতে থাকে। হতাশার কথা বলতে থাকে। এমনকি দেখতে অসুন্দর হয়ে যাচ্ছে, এমন সব বোকাটে চিন্তাতেও ভেঙে পড়ছিল ও। আমার কানে ভাসে ওর একাধিকবারের আক্ষেপ...আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। মরলে বোধ হয় শান্তি পেতাম...।

পড়তে শুরু করি মানুষের আত্মহত্যা নিয়ে...দেখি, একজন মানুষের মধ্যে যে সব লক্ষণ দেখা দিলে তাঁর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, তার সব না মিললেও বেশিরভাগই মিলে যাচ্ছে বাসুর গত কয়েক মাসের আচরণগত পরিবর্তন, কথা-বার্তায়।

আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ডিপ্রেশন। আমাদের সমাজে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে কথাবার্তা হয়। নারীর কিছু শারীরিক সমস্যা নিয়ে রাখঢাক করে হলেও কথা হয়। কিন্তু মানসিক সমস্যা নিয়ে কী যে এক অজানা নিষেধাজ্ঞা আমাদের ওপর চেপে রয়েছে বুঝি না। আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলি না। কিংবা কেউ যদি মানসিক সমস্যায় আছে বলে শুনি, তো প্রথম যে অনুভূতিটা আমাদের মধ্যে কাজ করে তা হলো, তাহলে ও কী পাগল?! অথচ আমরা বুঝি না, শারীরিক সমস্যার মতো মানসিক সমস্যাও রোগ ছাড়া কিছু না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর উন্নত চিকিৎসাও রয়েছে।

আমরা ডিপ্রেশন আর দুঃখবোধের (Dipression and sadness) পার্থক্যও বুঝি না। আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস (World Mental Health Day, 2017)। প্রতি বছর ১০ অক্টোবর সারা বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে সারাবিশ্বে পালিত হয় দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, কর্ম ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য।

আমরা কর্ম ক্ষেত্রে প্রবেশের জীবনের বড় একটি সময় পার করি এখানে। এখানে মানসিক স্বাস্থ্য নানাভাবে প্রভাবিত হয়। এবার বিশ্ব মানসিক স্বস্থ্য দিবসের কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ার কারণ ডিপ্রেশন ও উদ্বেগ আমাদের কর্মক্ষমতাকে  সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। মানসিক সমস্যায় একজন কর্মীর কর্মক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থা হু’র হিসেব মতে, সারাবিশ্বে বর্তমানে ৩০ কোটি মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছে।

এই ৩০ কোটি মানুষ ডিপ্রেশনের এমন স্তরে রয়েছে যা তাদের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দিয়েছে। এর বাইরে ডিপ্রেশনে থেকেও স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যা কত হতে পারে তা অনুমেয়। ২৬ কোটিরও বেশি মানুষ ভুগছে উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যায়। হু’র মতে, আগামী সময়ে মানুষের সবেচেয়ে বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে যাচ্ছে এই depression and anxiety জনিত মানসিক সমস্যা।

ডিপ্রেশন কী কী কারণে হতে পারে? বরং বলুন কী কারণে এবং কার না ডিপ্রেশন হতে পারে! পারিবারিক সূত্রে অর্থাৎ আপনার বাবার বা দাদার বা কোনো রক্তের সর্ম্পকের আত্মীয়ের ডিপ্রেশনের ইতিহাস আছে। আপিনি যে জিনগত সূত্রে তা পাবেন না বলা যায় না। আপনার সামাজিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা, চারপাশকে দেখার সক্ষমতা, কোন পরিবেশে আপনি থাকছেন, পারিবারিক বন্ধন, মাদক, আবহাওয়া, বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, প্রিয়জনের মৃত্যু, প্রেমের ব্যর্থর্তা.. কোনটা বাদ দেবেন, আপনার ডিপ্রেশনে না ভোগার তালিকা থেকে? মেয়েদের ডিপ্রেশনে ভোগার হার আবার ছেলেদের চেয়ে দ্বিগুণ। ছেলে আর মেয়েদের ডিপ্রেশনে ভোগার কারণের মধ্যেও পার্থক্য আছে। এ ক্ষেত্রে একটা মেয়ের জন্য বিয়ের পর নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সৃষ্ট মানসিক চাপ, বিভিন্ন রকম যৌন হয়রানি, গর্ভকালীন ও প্রসব পরবর্তী শরীরে হরমনজনিত অসামঞ্জস্যতা, মনোপজের আগে বা পরে সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ইত্যাদি বড় ধরনের নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আত্মহত্যা করা ১০০ নারীর মধ্যে ৫৬ জনই ৪২-৪৭ বছর বয়সী।

কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যায় বাধ্য করে ‘ব্লু ওয়েল’ নামের এমন এক কমিউটার গেম নাকি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। এক অনামা পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখলাম, ঢাকার হলিক্রস স্কুলের ক্লাস এইটের এক মেধাবী মেয়ে নাকি এই গেম খেলে আত্মহত্যাও করেছে! তো, এই রহস্যময় গেমের কিন্তু কোনো খোঁজ আমি বা আমার চারপাশের কেউ পেয়েছে বলে শুনিনি। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নামে ফেসবুক, হোয়াটস এ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম মানুষকে যেভাবে সমাজ, পরিবার, আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, তা কিন্তু মানুষকে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলতে যথেষ্ট।

কিন্তু যত যাই হোক, সত্য হলো, প্রতিটি মানুষ জন্ম নেয় আলোর পথের যাত্রী হয়ে। তাই এখানেই থেমে গেলে চলে না। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। অর্থাৎ যতক্ষণ তুমি বেঁচে আছো, আশা ছেড়ো না। বিশ্বাস রেখো, জীবন তার বরণ ডালা নিয়ে তোমারই অপেক্ষায়।

এখন এমন কিছু সেলিব্রেটির কথা বলবো যারা ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করে দিব্বি টিকে আছেন। শুধু টিকে আছেন এমন না। পৃথিবীর সেরা মানুষগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এদের মধ্যে প্রথমেই আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত নায়িকা দীপিকা পাড়কুনের নাম বলতে হয়। তিনি দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনের মধ্যে থেকে, চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সুস্থ্-স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। শুধু তাই না, তিনি ডিপ্রেশন নিয়ে সমাজে বিরাজ করা স্টিগমা ভাঙতে নিজের জীবনের কথা বলে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করছেন।

সেলিব্রেটিদের মধ্যে আরও আছেন সংগীত শিল্পী লেডি গাগা, ‘দি রক’ খ্যাত রেসলার ও নায়ক জনসন, ম্যাড ম্যান সিরিয়ালের সেই সুদর্শন নায়ক জন হ্যাম, আছেন আরেক সুদর্শন নায়ক ও্য়ন উইলসন, স্ক্যান্ডাল সিরিয়ালের নায়িকা কেরি ওয়াশিংটন, হ্যারী পটারের লেখিকা জে. কে. রা্ওলিং...বললে আরও বাড়তেই থাকবে এ তালিকা। এই সফল মানুষগুলো প্রত্যেকে জীবনের বড় একটি সময় ডিপ্রেশনের মতো মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছেন। কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছেন। তবে কী আপনি বলবেন এরা পাগল?! বরং ঠিক উল্টো। এরা আমাদের বিশ্বের সম্পদ।

শেষ করতে চাচ্ছি দীপিকা পাড়কুনের অভিজ্ঞতা দিয়ে। তিনি সম্প্রতি HINDUSTHAN TIMES কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘২০১৪ সালের কথা। যখন আমি আমার কাজের জন্য প্রসংশিত হচ্ছিলাম, সেই সময়টায় এক সকালে অদ্ভুত শুন্যতা নিয়ে আমার ঘুম ভাঙলো। প্রথমে ভেবেছিলাম এটা কাজের চাপ। কিন্তু অবস্থাটা চলতেই লাগলো। এক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে আমি সকালে বিছানা থেকেই উঠতে পারতাম না। কোনো কাজে মনো সংযোগ করতে পারতাম না। কাঁদতাম...’ এরকম সময়ে তাঁর পরিবার পাশে এসে দাঁড়ায়। চিকিৎসকের কাছে যান। দীর্ঘ দ্বিধা-দ্বন্দ্বর পর ওষুধ খেতে শুরু করেন। তারপর তো আপনারা সবাই জানেন এই সুন্দরীর আজকের সাফল্যের কথা। 

Israt Jahan

ইসরাত জাহান

লেখক ও সাংবাদিক। পড়াশোনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা