রোহিঙ্গা ইস্যু, সরকারের দোদুল্যমান অবস্থান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কূটনৈতিক সফর!

আয়মান রাহাত

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল আজ বার্মা সফরে যাচ্ছেন। প্রায় তিন মাস আগে এই সফরের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। তাঁর এই সফরে সীমান্তপথে অনুপ্রবেশ, মানব পাচার, ও মাদক পাচার রোধে সীমান্ত লিয়াজোঁ অফিস স্থাপন এবং নিরাপত্তা সংলাপ বিষয়ে দুইটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব, একজন যুগ্ম-সচিব, একজন উপ সচিব, বিজিবি, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধি। এছাড়াও, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে আলোচনাও স্থান পাবে। সফরের শেষদিন বার্মার স্টেট কাউন্সেলর দ অং সাং সু চি’র সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ২ অক্টোবর সু চি’র দপ্তরের একজন মন্ত্রী কিও তিন সোয়ে বাংলাদেশ সফর করে যাওয়ার পরে প্রায় এক মাস অতিক্রম হওয়ার পরেও এখনও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বার্মার কোন উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় রাখাইন বৌদ্ধদের সঙ্গবদ্ধ হামলার পর প্রায় দীর্ঘ এক মাস চুপ থাকার পরে সু চি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাতে তিনি দাবি করেন একটি যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার পরে রোহিঙ্গারা বার্মায় ফিরতে পারবে। তবে বার্মার পক্ষ থেকে বারবার ১৯৯২ সালের চুক্তি ধরেই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে। কিও তিন সোয়ে বাংলাদেশ সফরে নিজে সাংবাদিকদের সামনাসামনি কোন কথা না বললেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর বরাতে আমরা জানতে পারি বার্মা রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে দুই দেশের মধ্যে একটি “জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ” গঠন করার কথা ছিল। তবে এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোন মধ্যস্থতা থাকবে না বলেও জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মূলত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছিল যার একটি খসড়াও বার্মার প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়। ওই সময়েই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন এ বিষয়ে আরও আলোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শীঘ্রই বার্মা সফরে যাবেন।

এদিকে ২২শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২ তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে  (১) অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা, (২) অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা, (৩)  জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা, (৪) রাখাইন রাজ্য থেকে  জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, এবং (৫) কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রীর এই ৫ দফা দাবি তখন পুরো বিশ্বেই ইতিবাচক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এই ৫ দফা দাবি জাতিসংঘে পুরো বিশ্বের সামনে বলে আসলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই ৫ দফা দাবি প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর কোন ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। বরং, এই ৫ দফা দাবিকে পাশ কাটিয়ে বার্মার সাথে দায়সারাভাবে কার্যক্রমগ্রহণেরউদ্যোগদেখা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন সামগ্রিক পরিকল্পনা জনগণ দেখতে পায়নি। জনগণের চাপে সরকার রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত খুলে দিলেও এখন পর্যন্ত মানবিক সহায়তা ছাড়া কূটনীতির মাঠে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্মা সফর নিয়ে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিজ ভূমীতে স্বাভাবিক ও নিরাপদ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত নিম্নের পয়েন্টগুলি নিশ্চিত করা।কিন্তু

এক, স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জড়িত না করেই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্মা সফর তাই প্রমাণ করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দাবিই ছিল অনতিবিলম্বে ও চিরতরে সহিংসতা ও জাতিগত নিধন বন্ধ করা। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সহিংসতার মুখে পালিয়ে রোহিঙ্গারা এখনও বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দাবিই পূরণ হয়নি সেখানে বাংলাদেশের কোন মন্ত্রী কোন প্রেক্ষাপটে বার্মা সফরে যেতে পারেন? প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় দাবি ছিল জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল বার্মাতে পাঠানো। এই দাবির বিষয়েও আমরা বার্মার পক্ষ থেকে কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করি নাই। জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব কোন অনুসন্ধানী দল বার্মাতে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশের কোন মন্ত্রী বার্মাতে কোন প্রেক্ষাপটে যাবেন? মোটাদাগে, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মত একটা জায়গায় এই প্রয়োজনীয় ৫ দফা দাবি পেশ করলেও, এই ৫ দফা দাবির প্রতি বাংলাদেশ অনড় নয় কেন?

দুই, বার্মাতে যা ঘটেছে তা বাংলাদেশের একার পক্ষে বার্মার সাথে বসে সমাধান করে ফেলা সম্ভব নয়। যে ধরণের গণহত্যা আরাকান প্রদেশে হয়েছে তা বিচারের দাবি রাখে। এবং অতি শিঘ্রই এর জন্য দরকার জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধানী দল গঠন করা ও গণহত্যা সংগঠিত স্থানে অনুসন্ধান চালানো। বাংলাদেশ সরকারের উচিত জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এই আহ্বান আরও জোরালোভাবে জানানো এবং বার্মাকে তা মানতে বাধ্য করতে প্রচেষ্টা চালানো।

তিন, বার্মাতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন করা হলেও তাদের জীবন সেখানে নিরাপদ নয়। সামরিক বাহিনী, পুলিশের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য হুমকি স্থানীয় রাখাইন বৌদ্ধরাও। তাই কোন রকমে প্রত্যাবর্তন করা গেলেই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এর জন্য দরকার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পুরো আরাকান জুড়ে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। আর এই শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশকে থাকতে হবে অগ্রবর্তী ভূমিকায়। বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতে হবে রাখাইনে বার্মার সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই একই সাথে বাংলাদেশের দাবি জানানো উচিত আরাকানকে অসামরিকীকৃত করা।

চার, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে কোন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি গ্রহণ করা হবে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরণের ক্ষতিকর বিষয়। এর আগেও ১৯৭৮ সালে ও ১৯৯২ সালে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির (যদিও তা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে) মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন করা হয়ে থাকলেও দেখা গেছে সেই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন ছিল ধীর গতির অন্যদিকে সেই প্রত্যাবর্তন স্থায়ী হয়নি। রোহিঙ্গারা আবার সহিংসতার মুখে নিজেদের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এরকম ঘটনা বারেবারে ঘটিয়ে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বার্মা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই বার্মার রাষ্ট্রীয় নীতি। তাই দ্বিপক্ষীয় কোন চুক্তি গ্রহণ করে রোহিঙ্গাদের দায়সারা প্রত্যাবর্তন করা গেলেও তারা সহিংসতার মুখে আবার পালিয়ে আসতে বাধ্য হবে। তাই বাংলাদেশ সরকারের দরকার এবারের প্রত্যাবর্তন স্থায়ী করা। কোন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাথে নিয়েই একটি বহুপক্ষীয় চুক্তি গ্রহণ করেই বাংলাদেশকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ে সামনে আগাতে হবে। দ্রুত সমধানের আশায় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি গ্রহণ করে দায়সারা প্রত্যাবর্তন করলে তা আখেরে বাংলাদেশের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে।

পাঁচ, বার্মাতে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের সব থেকে ভয়ঙ্কর দিকটি হচ্ছে জনগোষ্ঠীটিকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা। যার ফলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত। পুরো জনগোষ্ঠীটিই অতি দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজেদের জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার না করার পেছনেও রয়েছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব না থাকা। দায়সারা প্রত্যাবর্তন করলেও তারা বড়জোর আগের সেই জীবনে ফিরে যেতে পারবে যেখানে আবারও তাদের লড়াই করতে হবে দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও পুষ্টিহীনতাকে। আবার নাগরিকত্ব না থাকায় তাদেরকে আবারও বার্মা থেকে বের করে দেওয়ার সুযোগ বার্মার হাতে রয়েই যাবে। যার তাৎক্ষণিক প্রভাব বাংলাদেশের উপরেই পড়বে। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয় নিশ্চিত করেই সম্মানের সাথে প্রত্যাবর্তন শুরু করা।

ছয়, বার্মার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নাই। সু চি’র বক্তব্যেও তিনি এই জনগোষ্ঠীটিকে রোহিঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করেন নাই। উপরন্তু, তাদেরকে কখনও মুসলমান আবার কখনও বাঙালী হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটা একটা জাতিগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয়কে মুছে দেওয়ার চেষ্টার শামিল। ১৯৭৮ সালের চুক্তিতে এই জনগোষ্ঠীটিকে রোহিঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকলেও, ১৯৯২ সালের চুক্তিতে তাদের রোহিঙ্গা পরিচয় বাদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের এই বাদ দেওয়াতে সম্মত হওয়া এই জনগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয়ের জন্য ছিল অত্যন্ত অবমাননাকর ও ক্ষতিকর। তাই বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই এই জাতিগোষ্ঠীটির জাতিগত পরিচয়ের উপর পূর্ণ সম্মান রেখে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী হিসেবেই অভিহিত করতে হবে।

সাত, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই বার্মার বাইরেই বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। প্রায় ১০ লাখের উপরে রোহিঙ্গা বর্তমানে বার্মার বাইরে বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে। সেসব দেশের মধ্যে রয়েছে প্রধানত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও সৌদিআরব। মাত্র চার লাখের কিছু বেশি রোহিঙ্গা এখনও বার্মাতে রয়েছে যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশই অন্তর্বর্তী বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাস করছে। বার্মার পক্ষ থেকে বার্মায় থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের শিবিরে বন্দী করার প্রচেষ্টাও চালু রয়েছে। তাই বাংলাদেশে বর্তমানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন করা হলে তাদেরকে বার্মা যেন পুনরায় কোন শিবিরেই বন্দী করে রাখতে না পরে সে ব্যাপারে বাংলাদেশকে সজাগ থাকতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিতেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

আট, রোহিঙ্গারা বার্মার জনগোষ্ঠী। বার্মাতেই তাদের বসবসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এবং তা হতে হবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া এবং বার্মার অন্যান্য সকল নাগরিকের মত সম অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই। পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় রেখে আরাকানেই তাদের নিজেদের ভূমিতেই তাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। তাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরে তারা সকল নাগরিক অধিকার পাচ্ছে কিনা, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকতে হবে।

নয়, রোহিঙ্গা সংকট বার্মার সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশ এই সংকট থেকে নিজেকে মোটেও মুক্ত রাখতে পারবে না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, সমান নাগরিক অধিকার প্রদান করা এবং পূর্ণ নিরাপত্তাসহকারে নিজেদের ভূমিতেই স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই কেবল এর সমাধান রয়েছে। এটার কোন দ্রুত সমাধান নেই। এটা কোন দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও নয়। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যতটা পারা যায় এই প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। ইতিমধ্যেই, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত একটি বিলে রাশিয়া ও চীন ভেটো প্রদান করেছে। ভারতও বার্মার পক্ষে স্পষ্টত অবস্থান নিয়েছে। স্থায়ী সমাধানের পথে আপাতত এই রাষ্ট্র তিনটি বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেখাতে পারেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বার্মার এই বর্বরতার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন সহিংসতার জন্য বার্মার সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছেন। যুক্তরাজ্য বার্মার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচী স্থগিত করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বার্মার সামরিক বাহিনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থেই রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় কে বন্ধু হবে তা ঠিক করতে হবে। চীন, ভারত কিংবা রাশিয়ার অবস্থান এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে না তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত।

শেষত, রোহিঙ্গা সংকট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচার ইস্যুর পাশাপাশি এটা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। এই সংকট মোকাবেলায় দরকার সফল কূটনীতি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটাকে একটা আইন শৃঙ্খলা জনিত ইস্যু হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর তাই প্রমাণ করে। এটা মোটেও কোন আইন শৃঙ্খলা জনিত ইস্যু নয়। এটাকে আইন শৃঙ্খলা ইস্যু হিসেবে দেখা আখেরে বাংলাদেশের জন্য ভাল ফল বয়ে আনবে না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্যও মঙ্গলজনক হবে না। কূটনৈতিক সফলতার মধ্য দিয়েই এই সংকট সমাধান করতে হবে।

ayman Rahat

আয়মান রাহাত

পড়াশুনা করছি অর্থনীতিতে। মানবাধিকার কর্মী হিসেবেই নিজেকে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করি। অনলাইনে লেখালেখি করি। জানার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে বিশেষ করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয়াবলী, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শন। অবসরে সিনেমা দেখি। ধর্ম, জাতি, শ্রেণী ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করাই রাজনৈতিক আকাংখা যেখানে প্রতিটি নাগরিক বাংলাদেশকে তার নিজস্ব রাষ্ট্র হিসেবে সম্পূর্ণরূপে মনে করবে এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ থাকবে।

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা