প্রকাশকদের অতি মুনাফা-চিন্তা সাহিত্য চর্চাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে

মুনির আহমদ

 

 প্রকাশকের গলাকাটা মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে নবীন লেখকরা যেমন একটা সময়ে নিরুৎসাহিত হয়ে লেখালেখির জগত থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি মাত্রাহীন উচ্চমূল্যের কারণে অসংখ্য পাঠককে খালি হাতে বা দুয়েকটা বই হাতে অতৃপ্তি নিয়েই মেলা থেকে ফিরতে হচ্ছে। আর মুনাফার চিন্তা থেকে বাছবিচারহীন যে সে বই রঙচঙে প্রচ্ছদে মুড়িয়ে প্রকাশ করার কারণে ক্রেতারা যেমন সঠিক বই বাছাই করতে পারছেন না, তেমনি মানহীন বই পড়তে মূল্যবান সময় ব্যয় করে তারা প্রতারিতও হচ্ছেন।

প্রকাশকের গলাকাটা মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে নবীন লেখকরা যেমন একটা সময়ে নিরুৎসাহিত হয়ে লেখালেখির জগত থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন, তেমনি মাত্রাহীন উচ্চমূল্যের কারণে অসংখ্য পাঠককে খালি হাতে বা দুয়েকটা বই হাতে অতৃপ্তি নিয়েই মেলা থেকে ফিরতে হচ্ছে। আর মুনাফার চিন্তা থেকে বাছবিচারহীন যে সে বই নজরকাড়া প্রচ্ছদে মুড়িয়ে প্রকাশ করার কারণে বই ক্রেতারা যেমন সঠিক বই বাছাই করতে পারছেন না, তেমনি মানহীন বই পড়তে মূল্যবান সময় ব্যয় করে তারাও প্রতারিত হচ্ছেন।

মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার বেলায় অধিকাংশ প্রকাশক একটু মানবিকতা দেখাতেও রাজি নন। বইয়ের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে একদিকে যেমন বইপ্রেমিদের পকেট খালি করছেন, অন্যদিকে নবীন উৎসাহী লেখকদের আবেগকে পূঁজি করে বোকা বানিয়ে তাদের কাছ থেকেও অনৈতিক উপায়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিতে দ্বিধা করছেন না। উপরি পাওনা হিসেবে লেখক-পাঠকদের শ্রদ্ধা-ভালবাসাও কুড়াচ্ছেন সমানতালে।

একজন লেখক লেখা শেষ করার পর সেটা ছাপা হয়ে বই আকারে প্রকাশ হওয়ার মাঝে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সম্পাদনা করা, ডিজাইন, কাগজ ক্রয়, প্লেইট তৈরি, ছাপা, লেমিনেশন, বাঁধাই মিলে বইপ্রস্তুতি বিষয়ক প্রায় এক ডজন ঘাট অতিক্রম করে আসতে হয়। যাদের অভিজ্ঞতা নেই, তাদের জন্য এতসব ঘাট অতিক্রম করে আসা বিশাল জটিল ব্যাপার। আবার যে কোন একটি জায়গায় সামান্য ভুল থেকেই সম্পূর্ণ বই বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে যারা ছাপার লাইনের খুঁটিনাটি কলাকৌশল আয়ত্ব করতে পেরেছেন, তাদের জন্য এই ১২ ঘাট অতিক্রম করতে বাসায় বসে ১২টি ফোন কলই যথেষ্ট। আর যারা সম্পূর্ণ আয়ত্ব করতে পারেন না, দেখা গেছে এমন বহু মূদ্রণ ও পুস্তক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা কয়েক বছরে পুঁজি হারিয়ে শূন্য হাতে এই লাইন থেকে হারিয়ে গেছেন। ছাপা সংক্রান্ত এই জটিলতার সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে বিশাল ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন প্রতিষ্ঠিত অনেক সাধারণ পুস্তক ব্যবসায়ী।

আমি একটা উদাহরণ দিলে আরো সহজে বুঝে আসবে। ছাপার লাইনে আমার পদচারণা সেই ১৯৯৪ সাল থেকে। গত হওয়া এই ২২ বছরে প্রায় সবকিছুর বাজার মূল্য তিন গুণ থেকে কোন কোনটা দশগুণও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন- তখনকার ১ টাকার চা, ১ টাকার পরোটা এখন ১০-১৫ টাকা দিয়ে ক্রয় করতে হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ২২ বছরে মূদ্রণ ও বই তৈরির খরচ এক টাকাও বাড়েনি, বরং বহু ক্ষেত্রে বড় আকারে আরো কমেছে। এমন অনেক খাত আছে, দেখা যাবে, ২২ বছর আগে যেটা করতে ১০০০ টাকা লাগত, সেটা এখন ৫০০ টাকাতেই করা যাচ্ছে।

সে যাক, এত খুঁটিনাটি রহস্য ফাঁস করে দিতে থাকলে পুস্তক ও মূদ্রণ ব্যবসায়ীদের কারো নজরে এলে তাঁরা আমার উপর বেজায় রুষ্ট হবেন নিশ্চিত। গত বছর ফেসবুকে এই রকম একটা পোস্ট দেওয়ায় নামকরা দুই জন প্রকাশক আমাকে ব্লক করেছিলেন। আমার এই লেখায় ব্যবসায়ের রহস্য ফাঁস করা উদ্দেশ্য নয়, তবে শিক্ষার মতো নৈতিকতার ব্যবসায়ের অনৈতিকতা এত বেড়ে গেছে যে, নিজের বিবেকের দায়বদ্ধতার কারণে দু’কলম না লিখে পারছি না।

তবে আশার কথা হচ্ছে ইসলামী বই প্রকাশকদের মধ্যে গলাকাটা ব্যবসায়ের এই প্রবণতা একদম নেই। দেখা যায়, ২০০ পাতার যে গল্প বা উপন্যাস বইটা মেলা থেকে আপনাকে ক্রয় করতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে, সেই একই পরিধির একই কাগজের একটা ইসলামী বই ক্রয় করা যায় ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যেই। কেউ যাচাই করতে চাইলে বাংলা বাজারের ইসলামী টাওয়ার বা বায়তুল মোকাররমের ইসলামী বই বিপণীতে গিয়ে দেখতে পারবেন। এই দিক দিয়ে ইসলামী পুস্তক ব্যবসায়ী বা প্রকাশকরা খুবই প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু কথিত প্রগতিশীল প্রকাশকরা সাহিত্য সেবাকে ধান্ধাবাজির বড় একটা মাধ্যম বা সুযোগে পরিণত করেছেন। কথিত এই প্রগতিশলীলতাকে আমি ভোগবাদিতা হিসেবেই দেখি। প্রগতিশীল প্রকাশকরা তাদের ভোগবাদি মানসিকতাকে নিজেদের ব্যবসায় পরিপূর্ণ ব্যবহার করছেন।

ফেসবুক টাইম লাইনে নবীন লেখক বন্ধুদের প্রকাশকদের প্রতি শ্রদ্ধাবিগলিত সচিত্র পোস্ট দেখলে, প্রকাশক মহোদয়ের চেহারায় এক রক্তচোষা ড্রাকুলার প্রতিচ্ছবিই যেন আমি দেখতে পাই। কারো বিশ্বাস হবে কিনা জানি না, ৬৪ পৃষ্ঠা মানে ৪ (চার) ফর্মা পরিধির বইয়ের ২ জন নবীন লেখকের জবানবন্দি নিয়ে যা জানলাম, রীতিমতো আঁৎকে ওঠার মতো অবস্থা।

“নামিদামি প্রকাশনীর খ্যাতিমান (!) প্রকাশক মহোদয় নবীন লেখকদ্বয়কে বললেন- “৫০০ কপি বই ছাপাব। সেখান থেকে প্রতি কপি ১০০ টাকা দরে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ২০০ কপি বই আপনাকে অগ্রীম ক্রয় করতে হবে”।

অথচ ৬৪ পৃষ্ঠা সমমানের ৫০০ কপি বই ছাপাতে একজন প্রকাশকের (ছাপার কাজে ১০-১৫% লাভ ধরে) সর্বোচ্চ খরচ পড়ার কথা ২০ হাজার টাকারও কম। মানে সংশ্লিষ্ট প্রকাশক নবীন লেখকদ্বয়ের আবেগকে পুঁজি করে ছাপা সংক্রান্ত কাজে ২-৪ হাজার টাকা লাভ করে অতিরিক্ত আরো ৩৫০ কপি বই পেয়ে গেলেন এবং বই প্রকাশের স্বপ্নে বিভোর নবীন লেখকের আবেগ-ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধও দেবদূতের মতো পাচ্ছেন।

আর বোনাস হিসেবে এসব প্রকাশকরা নবীন লেখকদেরকে মাসব্যাপী মেলায় এই ৩৫০ কপি বই বিক্রির প্রচারণা চালানোর কাজেও ফ্রি ফ্রি পেয়ে যাচ্ছেন। অটোগ্রাফ ও বই বিক্রির মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার আশা এবং সর্বোপরি নিজের বই বিক্রির আনন্দ থেকে মাসব্যাপী মেলায় নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত গাড়িভাড়া পরিশোধ এবং নিজের ও বন্ধুদের নাস্তা-পানির খরচ নির্বাহ করে নবীন লেখকরা শো-রুমে রাত-দিন উপস্থিত থেকে প্রকাশের বইগুলো বিক্রির জন্য ফেসবুক পোস্ট ও পরিচিত নানাজনকে ফোনকলসহ সাধ্যমতো সকল প্রচারণার চালিয়ে থাকেন। কিন্তু ২০ হাজার টাকা দিয়ে প্রকাশকের কাছ থেকে যে ২০০ কপি বই কিনেছিলেন, তার সবগুলোই চলে যায় পরিচিত ও কাছের মানুষদেরকে উপহার দিতে দিতে। মেলার মাঝামাঝি দেখা যায়, এই ৩৫০ কপি বইয়ের কিছু অংশ অবিক্রিত থেকে গেলে তখন প্রকাশক মহোদয় নবীন লেখককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা শুরু করেন, “আরে মিয়া ভাই, আপনার বই চলে না। অন্য লেখকদের বই কীভাবে টানছে দেখেন...”।

তখন নবীন লেখদের একটাই সাধানা, যেভাবে হোক প্রকাশক মহোদয়ের বইগুলো অন্তত যেকোনভাবে হোক বিক্রি করে দিতে হবে। ফেসবুক, মোবাইলে তারা আবার তালিকা খোঁজেন, কোন কোন আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিতজন মেলা থেকে তার বই কিনল না...।

এভাবেই প্রগতিশীলতা ও চেতনার যাঁতায় একজন নবীন লেখকের তেরোটা বাজার দশা।

 

[ দুই ]

আরেকটা দিক ভাবার আছে, যেখানে একটা বইয়ে খরচ পড়ছে ২০ টাকা বা তারও কম, সেখানে প্রকাশকের শো-রুম/দোকান-কর্মচারী’র বেতন, বিজ্ঞাপন ও আনুষাঙ্গিক খরচ মিলে বই প্রতি আরো ৫ টাকা যোগ করলে প্রতি বইয়ে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে ২৫ টাকা। সুতরাং বই প্রতি সর্বোচ্চ ১০-১৫ টাকা মুনাফা নিয়ে একটা বই নির্দ্বিধায় প্রকাশক ৩৫-৪০ টাকা পাইকারী-খুচরা বিক্রি করতে পারেন। অথচ ২৫ টাকা খরচার একটা গল্প-উপন্যাসের বই মেলা থেকে একজন পাঠককে কিনতে হচ্ছে- ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্য দিয়ে!!!! ভাবা যায়.....!!!!! কিন্তু সম সাইজের ও সমমানের একটা ইসলামী বই ঠিকই ৩৫-৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকাশকদের এই রক্তচোষা মুনাফাখোরী নীতির কারণে যেভাবে উদীয়মান লেখকরা নিজেদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারছে না, তেমনি লক্ষ লক্ষ মধ্য ও নিম্ন বিত্তের পাঠক উচ্চমূল্যের কারণে অধিক সংখ্যক বই ক্রয় এবং জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন।

সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে মুদি-তরকারী বাজার থেকে শুরু করে চিকিৎসা আর শিক্ষাখাতের মতো অতি মানবিক সেবাখাতও আজ দুবৃর্ত্তপনা মুক্ত নয়।

 

[ তিন ]

মূল্যবান সময় ব্যয় করে আকর্ষণীয় প্রচ্ছদে মোড়ানো বৈচিত্র্যময় নামের এসব বই যারা পড়ছেন, তারাও প্রতারণা থেকে মুক্ত নন।

বইমেলায় স্টলে বই তোলার জন্যে বইয়ের ন্যূনতম মান নির্ধারণে কোন নিয়ম-নীতি না থাকার কারণে বেশির ভাগ প্রকাশক শুধুমাত্র ব্যবসায়িক চিন্তা থেকেই বই প্রকাশ করার কারণে মেলাতে মানসম্পন্ন বইয়ের বদলে নিম্নমানের বইয়ের ছড়াছড়িই দেখা যায় বেশী। বেশিরভাগ নবীন লেখকদের বইয়ে মানসম্পন্ন গল্প ও সাহিত্যমান বলে কিছু নেই। এর জন্যে প্রকাশকরাই দায়ী। বানানে প্রচুর ভুল তো আছেই। মোটামুটি ধাঁচের সম্পাদনার নজিরও খুঁজে পাওয়া যায় না নতুন লেখকদের কোন বইয়ে।

কিন্তু উচ্চমূল্য দিয়ে মানহীন গল্প, কাহিনী, কবিতা ও ইতিহাস বর্ণনার ভুলে ভরা বানানযুক্ত এসব বই কিনে পাঠকরা না পাচ্ছেন ভাল গল্প পড়ার স্বাদ, না বাড়ছে তাদের জ্ঞানের পরিধি, না হচ্ছে তাদের বিশুদ্ধ সাহিত্যপাঠের আত্মতৃপ্তি।

ফলাফল হিসেবে বইয়ের ক্রেতা বাড়লেও জাতীয় পর্যায়ে সাহিত্য চর্চার অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

আমার এই লেখা প্রকাশকদের প্রতি বিদ্বেষ থেকে নয়। তাদেরকে অবশ্যই লাভ করতে হবে। তবে সেটা যেন যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে, সেটা নিশ্চিত করা দরকার। আর বই প্রকাশের সময় মান যাচাই করাটা অবশ্যই জরুরি। মানসম্পন্ন লেখকদেরকে যেমন এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে, তেমনি যাদের লেখায় প্রচুর দুর্বলতা, তাদেরকে ভুলগুলো দেখিয়ে দিয়ে আরো ভাল করতে উৎসাহ যোগাতে হবে। এভাবে যার যার অবস্থানে সকলে দায়িত্ববান হতে পারলে একদিকে যেমন মানসম্পন্ন লেখক তৈরি হবে, তদ্রুপ প্রচুর মানুষের বই ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, প্রচার পাঠক তৈরি হবে।

আর এভাবেই বাংলা সাহিত্যচর্চা আরো এগিয়ে যাবে।

আশা করছি, শিক্ষামন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমী এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন। 

 

লেখক: প্রকাশক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

munirmmi09@gmail.com

 

সম্পাদক: আবু মুস্তাফিজ

৩/১৯, ব্লক-বি, হুমায়ুন রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা